সঞ্জয় দে
‘আই হার্ড, ইন্ডিয়ান গাইজ আর হাংরি ফর উইমেন?’—সেফিট পিন খুলে একটা মিলিটারি গ্রেড গ্রেনেড যদি কেউ আমার দিকে ছুড়ে দিত, তবুও হয়তো এতটা চমকে উঠতাম না, যতটা চমকে উঠলাম দিলনাজের কথায়। দিলনাজ সমরকন্দ শহরে আমার গাইড। দুপুরের আহার সারতে আমরা এসে ঢুকেছি দিলনাজের পরিচিত এক রেস্তোরাঁয়। সেখানে প্রবল হাংরি অবস্থায় খাবারের অপেক্ষায় প্রহর গোনার মুহূর্তে দিলনাজের এই বেমক্কা প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওর ছুড়ে দেওয়া ওই হাংরি শব্দের গূঢ়ার্থটি কী? ভুলভাল কোনো শব্দ ছুড়ে দিল না তো? দিলনাজ যে ইংরেজিতে খুব ফ্লুয়েন্ট তেমনটি বলা যাবে না, যদিও ও নাকি স্নাতক পড়েছে ইংরেজি সাহিত্যেই। এইতো বিবি খানুমের মসজিদ ঘুরে দেখার সময়ে ওর জীবন নিয়ে কিছু কথা হচ্ছিল। স্নাতক পাসের পরই বিয়ে হয় সেনাবাহিনীর এক করপোরালের সঙ্গে। ছেলেটি ছিল ওর দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই। সামরিক বাহিনীর চাকরির কারণে স্বামীকে বছরের বড়ো এক-একটা সময় থাকতে হতো নানা গ্যারিসনে। আর এদিকে দিলনাজকে নয় বছরের মেয়েকে নিয়ে থাকতে হতো শাশুড়ির সঙ্গে। সেই শাশুড়ি বড্ড ঝগড়াটে। স্বামী বাড়ি এলেই মা তার কাছে নানান কানকথা লাগাত। তোর অবর্তমানে বউ বখে গেছে, আমাকে মান্যগণ্যই করে না, বাড়িতে বেপর্দা হয়ে বসে থাকে—এমন নানা কথা। স্বামী মায়ের কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে দুম দুম করে কিল বসিয়ে দিত বউয়ের পিঠে। একপর্যায়ে দিলনাজ সিদ্ধান্ত নেয়, আর নয়, এবার নিজের পায়ে দাঁড়াবে। সেই প্রতিজ্ঞাতেই মাস আটেক আগে থেকে এই গাইডের ব্যবসায় নেমেছে। এখন ও ভালোই কামায়, মেয়েকে নিয়ে সেই দজ্জাল শাশুড়ির বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে মায়ের বাড়িতে এসে উঠেছে।
গাইড হিসেবে দিলনাজের স্বল্প অভিজ্ঞতা আর ইংরেজিতে দুর্বল দখলের ব্যাপারটি মাথায় রেখেই আমি কিঞ্চিত্ শীতল কণ্ঠে দিলনাজকে বলি—‘প্রথমত কথা হলো, আমি ভারতীয় নই। ভারতের পাশের এক ক্ষুদ্র দেশ বাংলাদেশের লোক। দ্বিতীয়ত কথা হলো, হাংরি বলতে কি তুমি ধর্ষকাম বোঝাতে চাইছ? নাকি বোঝাতে চাইছ—সুন্দরী নারীর দর্শনলাভের জন্যে আকুলতা? যদি, দ্বিতীয়টি বোঝাতে চেয়ে থাক, তাহলে বলতে হয়—সেটি কোন দেশের পুরুষের ক্ষেত্রেই বা প্রযোজ্য নয়? ওটি না থাকলে তো সৃষ্টির আদি সূত্রটিই গুবলেট হয়ে যেত।’
আমার কথা দিলনাজ ঠিক কতটুকু বুঝল কে জানে! ওর আঙুলের নখগুলো ভারি সুন্দর, টকটকে লাল নেইল পলিশ দিয়ে রাঙানো। তবে মধ্যমার রংটি কিন্তু লাল নয়, ওটি সিলভার। সেই বিশেষ নখটিকে চোখের সামনে নিয়ে নিবিষ্ট মনে দেখার ভঙ্গি করে দিলনাজ বলে, ‘আমাদের এখানে আরেকটা গাইড মেয়ে আছে, ওর নামও দিল। সেই দিল কিছুদিন আগে আমাকে বলছিল, ভারতীয় ছেলেরা নাকি ভালো নয়, ও কাগজে পড়েছে। দিল্লি না কোথায় যেন বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মেয়েরা আক্রান্ত হয়েছে ছেলেদের হাতে।’ এবারে আমি ঘটনা কিছুটা আঁচ করতে পারি। দিল নিশ্চয়ই দিল্লির সেই নির্ভয়া নামক মেয়েটিকে খুনের কথা বলছে, যে ঘটনার পর ফুঁসে উঠেছিল গোটা ভারত। বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে সেই ঘটনাটি বেশ ফলাও করে প্রচার করা হয়। আর মন্দ খবরগুলোই তো প্রচার পায় সবার আগে, তা-ই না?
এর মাঝেই ফিরে এসেছে রেস্তোরাঁর পরিবেশনকারী মেয়েটি। তিন-চারটি প্লেট টেবিলে সাজিয়ে রেখে বিদায় নেবার পর দিলনাজ ওর প্রস্থানপথের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বলো তো, এই মেয়েটি উজবেক না তাজিক?’ এমন তো নয় যে আমি উজবেকিস্তানে আছি বেশ কিছুদিন ধরে, আর তাই নারীর মুখায়ব দেখেই তার জাতিসত্তা নিমিষেই নির্ণয় করে ফেলব। দিলনাজের প্রশ্নে তাই আবারও কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে থাকি। ‘ও তাজিক, আমার মতোই’—দিলনাজ বলে, ‘আমরা একসময় একই স্কুলে পড়তাম। বেচারির কিছুদিন আগে ডিভোর্স হয়ে গেছে। স্বামীটা ছিল পাষণ্ড, ওকে পেটাত। এখন ভালোই আছে, নিজের মতো আছে। পেছনে আমার মতো শেকল নেই।’ দিলনাজের কণ্ঠে একধরনের অস্ফুট আক্ষেপ। আমি সেটি আঁচ করে বলি, ‘ওর অবস্থানকে যদি তোমার কাছে শ্রেয়তর মনে হয়, তবে তুমিও তোমার বান্ধবীর পথ বেছে নিয়ে নিজেকে শেকলমুক্ত করছ না কেন?’ আমার ইঙ্গিতটা বুঝে নিয়ে দিলনাজ যেন ফিরে যায় বাস্তবতায়—‘সেটি সম্ভব না। আমাদের সমাজ এখনো অনেক রক্ষণশীল। নামের শেষে স্বামীর পরিচয় যুক্ত থাকায় সমাজের নানা কটুকাব্য থেকে এখনো আমাকে আর মেয়েটাকে আড়াল করে রাখতে পারছি। বিয়েবিচ্ছেদ হলে সেটুকুও পারব না। এখনকার অবস্থাতেই বরং ভালো আছি।’ প্লেটে রাখা পিলাফের স্তূপের মাঝখানে পড়ে থাকা কোয়েলের সেদ্ধ ডিমটিকে কাঁটা চামচের মাথায় বিদ্ধ করে দিলনাজ যোগ করে, ‘রেস্তোরাঁর এই মেয়েটি সাহসী, সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পেরেছে, কিন্তু আমি ততটা সাহসী নই।’ দিলনাজের চোখে আমি যা দেখতে পাই, সেটি আসলে কী? বৈরী সম্পর্ককে বিদায় জানিয়ে দেওয়া রেস্তোরাঁর মেয়েটির জন্যে খানিক ঈর্ষা? নাকি মিথ্যে প্রবোধের মাঝে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার অব্যক্ত যন্ত্রণা? জানি না আমি।
দিলনাজের সাথে আগেই কথা ছিল আহারপর্ব শেষ হলে আমরা যাব ইমাম বুখারির মাজারে। সেটি অবশ্য মূল শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে। ট্যাক্সিতে করে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। সেই ট্যাক্সির খোঁজে এবারে আমাদের গলদঘর্ম হবার পালা। অপরাহ্ন হয়ে এলেও রোদের তেজ কিন্তু কমেনি এতটুকু। দিলনাজ হাত নেড়ে কয়েকটি ট্যাক্সিকে থামানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সেগুলো যাত্রী নিয়ে চলেছে ভিন্নপথে।
কী মনে করে একটি ট্যাক্সি হঠাত্ ব্রেক কষে থেমে যায়। তারপর কিছুক্ষণ চলে দিলনাজের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দর কষাকষি। তাতে জিতে গিয়ে পেছনের দরজাটি খুলে দিলনাজ বলে—‘নাও, জলদি উঠে বসো। আলো থাকতে থাকতেই মাজারে ঘুরে ফিরতে চাই।’
ভেতরে উঠে দেখি, ট্যাক্সি ড্রাইভার বেশ তাগড়াই চেহারার যুবক। পেশল বাহু, তাতে নানা প্রকারের উল্কি আঁকা। মাথা কামানো। রিয়ার ভিউ মিররে আমাকে ভালোভাবে নিরিখ করে যুবক বেশ উল্লসিত কণ্ঠে বলে, হ্যালো বাবুজি। অর্থাত্ ইনিও ধরে নিয়েছেন আমি ভারতীয়। পাশ দিয়ে বেশ কয়টি ট্রাক ছুটে যাওয়ায় ধূলিঝড়ের ঝাপটা এগিয়ে আসে আমাদের গাড়ির দিকে। গাড়িটি পুরনো মডেলের। হাতল ঘুরিয়ে কাচ ওঠাতে হয়। আমার পাশের কাচটি উঠিয়ে যুবককেও ইশারা করি তার দিকের কাচটি উঠিয়ে দিতে। তো সে সেদিকে খুব একটা ভ্রুক্ষেপ না করে দু’ দিকে দুলে গেয়ে ওঠে—আই এম অ্যা ডিস্কো ডেন্সার। মিঠুন, মিঠুন। ইউ নো মিঠুন চাক্রাবরতি? প্রশ্নের ধরনখানা এমন, যেন আপনি কি মিঠুনের পাশের বাড়িতে বাস করেন? আমি দিলনাজের মাধ্যমে যুবককে বলি—মিঠুন আর আমি এক শহরে না থাকলেও আমরা দুজনই এক জাতিভুক্ত। সেটি শুনে তো যুবক আরো উত্তেজিত, উল্লসিত। দিলনাজের মাধ্যমে জানায়, আমার সম্পর্কে সে জানতে আগ্রহী। তো নতুন কাউকে জানতে গেলে আমি তাকে যে যে প্রশ্ন করি, সেসবের সঙ্গে যুবকের পদ্ধতির যে বিস্তর ফারাক, সেটি বুঝতে পারলাম তার প্রথম প্রশ্ন শুনেই। ‘তোমার কয়খানা বিবি?’—প্রশ্নটি করেই যুবক সামনের পথ থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকায়। আমি যখন বলি, একজনকে নিয়েই সুখে আছি, তখন স্পষ্টতই সে কিছুটা হতোদ্যম হয়। বুঝতে পারি, তার প্রশ্নে আমি যেমন অপ্রস্তুত, তেমনি আমার উত্তরেও ও অপ্রস্তুত। পেছনে ভেড়ার পালভরতি একটি ট্রাককে দ্রুত ওভারটেক করে এগিয়ে গিয়ে সে ম্যানুয়াল গিয়ারটি চেঞ্জ করে। তারপর বলে, ‘মাত্র একজন? অবশ্য আমারও এই মুহূর্তে এক বিবি। আরো দু-একটা বিয়ে করার পরিকল্পনা আছে। তবে একটা ব্যাপার কী জানো, বিবি পালতে পয়সা লাগে।’ আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, দিলনাজ ওর চার্জ নিঃশেষিত ফোনটি নিয়ে গুঁতোগুঁতি করছে, সেটিতে প্রাণ ফেরাবার জন্যে। ওর নাকি বাড়িতে জরুরি কিছু জানানো প্রয়োজন। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ট্যাক্সিওয়ালা ওর তামাটে হাতে লেপটে থাকা বিশ্রী উল্কিগুলোকে দিনের শেষ বেলার আলোয় উগলে দিয়ে বলে, ‘তো সেই পয়সা কামানোর ধান্দাতেই মস্কো গিয়েছিলাম কয়েক বছর আগে। ওখানে গিয়ে কিছু দু’ নম্বরি ব্যাপার-স্যাপারে একটু জড়িয়ে পড়েছিলাম। সেজন্যে জেলে যেতে হলো ছয় মাসের জন্যে। পরে হাজার কয়েক রুবল ঘুষ দিয়ে জেল থেকে ছাড়া পেলাম। তারপর আর মস্কোয় থাকিনি। ফিরে এসেছি এখানে। কিন্তু ওই জেল আর ঘুষের ব্যাপারটা না থাকলে এতদিনে আমার দ্বিতীয় বিয়ের কাবিন হয়ে যেত।’
হারতাং গ্রামের মেঠোপথ ধরে যখন আমাদের গাড়িটি ইমাম বুখারির মাজারের প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছায়, তখন সূর্যের আলো কিছুটা নিস্তেজ হয়ে এসেছে। আশপাশে বেশকিছু তীর্থযাত্রীবাহী বাস। তাদের হুড়োহুড়িতে মাজারের তোরণদ্বারের কাছটায় তৈরি হয়েছে কৃত্রিম যানজট। সেইসঙ্গে মেটাল ডিটেক্টর দ্বারা সবাইকে নিরীক্ষণের ব্যাপার থাকায় সেখানেও তৈরি হয় জনজট। আশপাশে আবার মেলার মতো বসেছে। বিক্রি হচ্ছে তসবি, কোরান শরিফ, আরবি ক্যালিগ্রাফি আঁকা দেয়ালচিত্র, ছোটখাটো খেলনা—জনসমাগমের স্থানগুলোতে যেমন হয় আরকি। তবে ঢোকার মুখটায় অপেক্ষমাণ জনতার সারির সঙ্গে এমন বেচাকেনার হৈচৈ থাকায় কেমন যেন একটা ভজঘট পরিবেশ তৈরি হয়। এখানকার কে যে লাইনে দাঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকতে চায়, আর কে যে পাশের মেলা থেকে সওদা কেনার জন্যে অপেক্ষা করছে, সেটি বোঝা দায়! তবে সঙ্গে সেই মস্কোফেরত ট্যাক্সি ড্রাইভার ছিল বলে রক্ষে। রদ্দি পিস্তল কোমরে নিয়ে গেট পাহারা দেওয়া এক পুলিশ অফিসারকে ম্যানেজ করে কী করে যেন ভিড় বাঁচিয়ে ও আমাদেরকে নিয়ে ভেতরের আঙিনায় ঢোকে।
বুখারা—অর্থাত্ যে শহরে তিনি জন্মেছিলেন, সেই শহরের নামানুসারেই তার নাম বুখারি। জন্মের পরপরই বাবাকে হারান। মা খুব কষ্ট করে তাকে আর বড়ো ভাইকে মানুষ করছিলেন। সেই তেজস্বিনী, তপস্বিনী মায়ের সঙ্গে ছয় বছর বয়সে তাঁরা গেলেন মক্কা, মদিনায়—তীর্থযাত্রায়। কিছুদিনের নামে গিয়ে শেষ অবধি সেখানে থেকে গেলেন প্রায় ছয় বছর। ততদিনে ধর্মের সুধা পানের নেশা পেয়ে বসেছে মা-ছেলেকে। ওদিকে ছেলে যেন অলৌকিক শক্তিধারী শ্রুতিধর। যে হাদিস লোকমুখে একবার শোনে, সেটি আর সে ভোলে না। এই হাদিস সংগ্রহ আর শ্রবণের অমোঘ আকর্ষণে পরে মা ও ছেলে উদ্ভ্রান্তের মতো সফর করে বেড়ালেন আরব আর মধ্যএশিয়ার আরো নানা জনপদে—বাগদাদ, বৈরুত, বসরা, কায়রো, দামেস্ক—এমন নানা শহর তাঁদের পদধূলি পেয়ে ধন্য হলো। এসব শহর-জনপদের নানা পণ্ডিতব্যক্তি কিংবা জনমানুষের সংস্পর্শে এসে ইমাম বুখারির স্মৃতিপটে দ্রুত অমোচনীয় কালি দিয়ে লিখিত হলো প্রায় ছয় লক্ষ হাদিস। এসবের মধ্য থেকেই সেরা সাত হাজার হাদিসকে তিনি পরে সংকলিত করেন বুখারি হাদিসে—মুসলিমদের মাঝে যে গ্রন্থটি কোরান শরিফের পর দ্বিতীয় পবিত্রতম গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। বুখারি হাদিস সংকলনের গুরুদায়িত্ব সমাপনের পর বুখারি ফিরে আসেন নিজ শহর বুখারায়। সেখানে জুটে যায় অসংখ্য ভক্ত, অনুরাগী, আশেকান। ব্যাপারটি শঙ্কিত করে তুলল বুখারার আমিরকে। তিনি বুঝলেন, ইমাম বুখারি তার রাজত্বে থাকলে লোকে ইমামের কথাকেই মাথা পেতে নেবে, আমিরের কথাকে নয়। তাই তিনি বুখারির ওপর চাপ তৈরি করলেন জন্মভূমি ছেড়ে ভিন্ন কোথাও বসত গাড়বার জন্যে। ভগ্ন মনোরথে ইমাম পরে চলে এলেন সমরকন্দের কাছে, এই গ্রামে। এখানেই পরে তিনি দেহ রেখে অমরলোকে যাত্রা করেন।
ভেতরে ঢুকতেই বাঁধানো পথ। দুই ধারে আলমন্ড আর মালবেরি বৃক্ষের সমানুপাতিক সহাবস্থান। মাঝের জায়গাগুলো ঘন সবুজ ঘাসের আবরণে আবৃত। আর একেবারে সমুখে ইমামের মাজার। ওপরে আকাশনীল গম্বুজ। মাজারের তলদেশে রক্ষিত ইমামের কবর। সিঁড়ি দিয়ে সেখানে নামার ব্যবস্থা আছে। তবে আবলুশ কাঠের ভারী দরজায় তালা মেরে রাখায় সর্বসাধারণের পক্ষে সেখানে ঢোকা সম্ভব নয়। মাজারের তিনদিকে শ্বেতমর্মরের স্থাপনা, গায়ে তার নিখুঁত আলপনার কারুকাজ। সেখানকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাজারের দিকে। তাদের চোখে ভক্তির ঘনায়মান বাষ্প। সেই বারান্দায় এখানে-ওখানে কিছু বেঞ্চ পাতা। অনেকে সেখানে বসেও ভক্তি নিবেদন করেন। কালো আলখাল্লা পরিহিত এক যুবা খাদেমকে দেখছি মাজারের দিকে মুখ করে সুর করে দোয়া পড়ছেন। মাথায় কালো টুপি, দুই গাল শ্মশ্রূবিহীন। ওই একই বেঞ্চে বসে আছে আরো চার-পাঁচ তরুণী। তারা খুব মন দিয়ে দোয়া শুনছে। প্রত্যেকেই নিশ্চুপ। এদের কয়েকজনের মাথায় উড়নি আছে, কয়েকজনের মাথায় নেই। এমনকি অনেক নারীকেই দেখছি গলার স্কার্ফটা মাথায় আলতো করে জড়িয়ে নিতে, তাদের নিম্নাঙ্গে হাঁটু অবধি আবৃতকারী স্কার্ট। কিন্তু এসব নিয়ে কিন্তু মাজারের খাদেম বা হুজুরদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা ছুটে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন না—পর্দা করুন। তারা বরং ব্যস্ত আছেন নিজেদের ঐকান্তিক ইবাদত নিয়ে।
খুব ধীরলয়ে হেঁটে চারদিকটা ঘুরে দেখছি। আমাদের সেই ট্যাক্সি ড্রাইভার একটু তফাতে। দূরের এক কল থেকে আঁজলা ভরে জল নিয়ে গিলছে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ায় আমাকে ইশারায় ডাকল। কাছে যেতে বলল, ‘দিস ওয়াটার ভেরি পাওয়ারফুল। ড্রিঙ্ক। ড্রিঙ্ক।’ ওয়াটারের সঙ্গে পাওয়ারের বিশেষ সম্পর্কটা এখানে কী, সেটি ওর কথায় না বোঝাতে এবারে দিলনাজকে ডাকতে হলো। দিলনাজ এসে বলল, লোকে বিশ্বাস করে—মাজারের পবিত্র জল পান করলে সমস্ত বালা মুসিবত দূর হয়। ওদের কথায় আমিও আঁজলা ভরে জল নিই। এরপর শুনি, শুধু জল নয়, অলৌকিক শক্তি আছে এ মাজারেরও। মনে মনে কোনো মানত করে মাজারের চারপাশে তিনবার প্রদক্ষিণ করলেই নাকি পূর্ণ হয় মনোবাঞ্ছা। সেটি শোনার পর খেয়াল করি, সত্যিই কিছু নারী মাজারের চারপাশ প্রদক্ষিণ করছেন—একবার, দুই বার, তিন বার...।
গ্রীষ্মের সন্ধে ঝুপ করে না। বরং বিকেলের শেষলগ্নে গোধূলি বহুদূরে অস্পষ্ট বলয়রেখা নির্মাণ করে দিনাবসানের ইঙ্গিত দেয়। ফেরার পথে গাঁয়ের ফসল তুলে নেওয়া মাঠের উপান্তে আশ্রয় নেওয়া গোধূলি সেভাবেই এক ইঙ্গিত উপস্থাপন করে। তাতে করে দিলনাজের মনে কিঞ্চিত্ শঙ্কা জন্ম নেয়। ওর ফোনটি বহুক্ষণ ধরেই বিকল। ফলে দুপুরের পর থেকে মেয়ের খোঁজ-খবর নিতে পারেনি। ঠিকভাবে স্কুল থেকে ফিরল কি না, খেল কি না, এই নিয়ে ওর মধ্যে সংশয়, শঙ্কা। আমি ওকে খানিকটা প্রবোধ দিয়ে বাঁ দিকের কাচ টেনে নামাই। তাতে করে পুরো গাড়িতে হুড়মুড়িয়ে এসে ঢোকে এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া। ওদিকে সেই ট্যাক্সি ড্রাইভার ওর ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজিয়ে দিয়েছে এক উজবেক পপ গান। ‘ভেরি গুড সং’—বলে ও গানটিকে চালিয়ে দিলেও আমার কাছে কিন্তু আহামরি কিছু মনে হয় না। এরচেয়ে বরং গতরাতে রেস্টুরেন্ট সমরকন্দে শোনা গানগুলো ছিল অনেক হূদয়গ্রাহী। আজ রাতেও সেই রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে হয়তো মন্দ হয় না।
