সুলতানা নাজনীন
‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র (১৯২৩) আবিষ্কারের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের এক গৌরবময় ইতিহাস উদ্ধার করেছেন দীনেশচন্দ্র সেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে পুঁথি সংগ্রহ করে তিনি বাংলার শেকড়ের সন্ধান করেছেন। আমাদের সাহিত্যিক ক্রমবিবর্তনের একটি লুপ্ত অধ্যায় পুনরুদ্ধার করেছেন। কৃত্তিবাস-কাশীদাস-মুকুন্দরামের যুগ ও ভারতচন্দ্রের যুগের মধ্যে যে একটি বৃহত্ ব্যবধান অনুভূত হয়, ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ তা পূরণ করে। বাংলার নিগূঢ় ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির স্বরূপ উন্মোচন করেছেন এর মাধ্যমে। অসামান্য জাদুকরি ক্ষমতা বিস্তারী ও পাঠকমনে প্রভাব সৃষ্টিকারী সংগ্রহ ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনন্য নিদর্শন এ অসামান্য গ্রন্থটির সম্পাদক দীনেশচন্দ্র সেন। অপরিসীম সাহিত্যানুরাগ, জাতীয়তাবোধ ও দেশহিতৈষণায় উজ্জীবিত এবং স্বতন্ত্র জীবনজিজ্ঞাসায় উদ্দীপ্ত দীনেশচন্দ্রের জন্ম ও মৃত্যু একই মাসে। জন্ম ৩ নভেম্বর, ১৮৬৬; মৃত্যু ২০ নভেম্বর, ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ। ১৮৮৪ সালে নবজীবন পত্রিকায় ‘পূজার কুসুম’ নামে কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে নাম লেখান দীনেশচন্দ্র সেন।
১৮৯৫ সাল থেকে তিনি বাংলার বিভিন্ন পল্লিগ্রামে ঘুরে ঘুরে প্রাচীন বাংলার পুঁথি সংগ্রহ শুরু করেন। এ সকল পুঁথি সংগ্রহ, তা পাঠ ও বিশ্লেষণ এবং গ্রন্থ রচনার গুরুদায়িত্ব পালন করেন তিনি। যদিও এ কাজে তিনি চন্দ্রকুমার দে ও কবি জসীমউদ্দীনকে নিয়োগ করেছিলেন। ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ ময়মনসিংহ জেলার পূর্বভাগ বিশেষত নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ মহকুমাতেই প্রচলিত, সদর মহকুমার পূর্বাংশ উত্পত্তি ও এর প্রচারস্থল। দীনেশচন্দ্র সংগৃহীত গীতিকাসমূহ পূর্ববঙ্গ-গীতিকার চারটি খণ্ড (১ম খণ্ড ১৯২৩, ২য় খণ্ড ১৯২৬, ৩য় খণ্ড ১৯৩০, চতুর্থ খণ্ড ১৯৩২) একইসঙ্গে বাংলা ও ইংরেজিতে সংকলন ও সম্পাদনা করে বিশ্বখ্যাত মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই গীতিকাগুলো Eastern Bengal Ballads নামে চার খণ্ডে ইংরেজিতে অনূদিত হয়। এরই প্রথম খণ্ড ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ বাংলা লোকসাহিত্য, লোকঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির এক অসামান্য স্মারকগ্রন্থ।
মানিকগঞ্জে বাল্য-কৈশোরকাল অতিবাহিত হলেও সিলেট ও কুমিল্লায় কেটেছে শিক্ষা ও শিক্ষকতা জীবন। সর্বশেষ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা থেকে স্থানীয় সংগ্রাহকদের সহায়তায় প্রচলিত এ পালাগানগুলো সংগ্রহ ও সম্পাদনা করে সর্বস্তরের মানুষের মন জয় করেন।
মৈমনসিংহ গীতিকায় ১০টি গীতিকা স্থান পেয়েছে, যথা—মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতী, কমলা, দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারামের পালা, রূপবতী, কঙ্ক ও লীলা, কাজলরেখা ও দেওয়ানা মদিনা। ভনিতা থেকে কিছু গীত রচয়িতার নাম জানা যায়, যেমন মহুয়া—দ্বিজ কানাই, চন্দ্রাবতী—নয়ানচাঁদ ঘোষ, কমলা—দ্বিজ ঈশান, দস্যু কেনারামের পালা—চন্দ্রাবতী, দেওয়ানা মদিনা—মনসুর বয়াতি। কঙ্ক ও লীলার রচয়িতা হিসেবে ৪ জনের নাম পাওয়া যায়—দামোদর দাস, রঘুসুত, শ্রীনাথ বিনোদ ও নয়ানচাঁদ ঘোষ। অবশিষ্ট গীতিকার রচয়িতার নাম জানা যায়নি। আখ্যানগুলো লোকসমাজ থেকেই গৃহীত হয়েছে। ধর্ম নয়, পার্থিব জীবনকথা গীতিকার প্রধান বৈশিষ্ট্য। মৈমনসিংহ গীতিকার দস্যু কেনারামের পালা ছাড়া বাকি ৯টি পালার মুখ্য বিষয় নর-নারীর লৌকিক প্রেম। প্রেমের পরিণতি কোনোটির মিলনাত্মক, কোনোটির বিয়োগান্ত। নায়িকার নামানুসারে গীতিকাগুলোর নামকরণ হয়েছে। গীতিকাগুলোতে পুরুষ চরিত্রের তুলনায় নারী চরিত্রের ভূমিকা উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। নারী চরিত্রের মহিমাকীর্তন করে দীনেশচন্দ্র সেন গ্রন্থের ভূমিকায় বলেন, ‘এই গীতিকাগুলির নারী চরিত্রসমূহ প্রেমে দুর্জয় শক্তি, আত্মমর্যাদার অলঙ্ঘ্য পবিত্রতা ও অত্যাচারীর হীন পরাজয় জীবন্তভাবে দেখাইতেছে। নারীপ্রকৃতি মন্ত্র মুখস্থ করিয়া বড় হয় নাই-চিরকাল প্রেমে বড় হইয়াছে।’
ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা ও জাতপাতের বৈষম্যহীন মানবীয় মহিমার আদর্শ ব্যক্ত হয়েছে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র গীতিকাসমূহে। কেউ বলেন, গীতিকাগুলোর রচনাকাল ব্রিটিশ শাসনযুগে; কারো মতে, চতুর্দশ শতাব্দীতে। আবার ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত হয়েছে বলেও কেউ কেউ মত প্রকাশ করে থাকেন। কিন্তু লক্ষযোগ্য বিষয়—এত আগে রচিত হলেও গীতিকাগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা পূর্বের ন্যায় শুধু অব্যাহতই নয়, বরং উত্তরোত্তর এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঙ্গে দীনেশচন্দ্রের প্রতি বেড়েছে বাঙালি পাঠকের ভক্তি ও শ্রদ্ধা। একবিংশ শতকে এসে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র গীতিকা থেকে উল্লেখযোগ্য, বহুল প্রচলিত, প্রচারিত ও জনপ্রিয় লাইনসমূহ নিয়ে লোকসংগীত সৃষ্টি ও সুর করে গেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন অনেক গায়ক-শিল্পী। গানের উল্লেখযোগ্য লাইন—
নয়া বাড়ী লইয়া রে বাইদ্যা লাগাইল বাইঙ্গন।
সেই বাইঙ্গন তুলতে কইন্যা জুড়িল কান্দন
কাইন্দ না কাইন্দ না কইন্যা না কান্দিয়ো আর
সেই বাইঙ্গন বেচ্যা দিয়াম তোমার গলার হার
নয়া বাড়ী লইয়া রে বাইদ্যা লাগাইলো কচু।
সেই কচু বেচ্যা দিয়াম তোমার হাতের বাজু
নয়া বাড়ী লইয়া রে বাইদ্যা লাগাইলো কলা।
সেই কলা বেচ্যা দিয়াম তোমার গলার মালা (মহুয়া পালা)
শুধু আধুনিক পাঠক নয়; সংগীতপ্রেমী মানুষের কাছে সমান গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে উদ্ধৃত গীতিকার লাইনসমূহ। দিনেশচন্দ্র সেনের বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য রচনাসমূহ বিভিন্ন শ্রেণি, বয়স ও পেশার পাঠকের মধ্যে জনপ্রিয়তায় সীমাবদ্ধ থাকলেও ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র কারণে তিনি পৌঁছুতে পেরেছিলেন সকল শ্রেণির বাঙালি পাঠকের কাছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ গীতিকাসমূহের বর্ণনায় সহজতা এবং ভাষার সরলতা। কেননা গীতিকাগুলোর মধ্য দিয়ে কোনো তত্ত্বকথা, জীবনের নিগূঢ় ব্যাখ্যা, ভণিতা ও পাণ্ডিত্য জাহির না হয়ে বাংলার ঐতিহ্য ও সম্পদসমূহকে পাঠকের বোঝার উপযোগী সুর ও ছন্দে তুলে ধরা হয়েছে। যা পঠনকালে বাঙালি পাঠকের হূদয় ঝংকৃত হয়।
সহজভাবে সরল করে এবং সুর সংযোজিত গীতিকাগুলোর কাহিনি নির্মিত হয়েছে, সেসব বাস্তব জীবনেরই আলেখ্য। কোথাও হয়তো অতিরঞ্জন বা অতিসরলীকরণ আছে, কিন্তু তার ভিত্তি বাস্তব জীবনেরই, রোবটের মতো ধাতু ও যন্ত্র দিয়ে তৈরি কিংবা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের পরিবর্তে রক্তমাংসেরই চরিত্র উপস্থিত গীতিসমূহে। কাজেই বলা যায়, গীতিকার চরিত্রগুলো বাস্তবেরই প্রতিফলন, হয়তো সাধারণের মতো নয়; কিন্তু তারা বাস্তব জীবন থেকেই এসেছে; কল্পনাজগত্ থেকে নয়। গীতিকাগুলোর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ড. দিনেশচন্দ্র সেন বলেন, ‘গীতিকাগুলি লুপ্ত হইতে বসিয়াছে, কিন্তু ফুলের মতো তাহাদের বাসি হইবার সম্ভাবনা নাই। রচনার দিন তাহারা যে সুঘ্রাণ দিয়াছে; এখনও তাহাদের সেই সুঘ্রাণ আছে। তাহাদের মলয় সমীরণ সকলই আছে, তাহারা খাঁটি বাংলার জিনিস, এই দেশের শোভা বৃদ্ধি।’
চরিত্রচিত্রণ, ঘটনাবিন্যাস, নারী চরিত্রের প্রাধান্য ও নারীর চিরায়ত বিরহ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ শুধু মধ্যযুগের সাহিত্য নয়; আধুনিকযুগের সাহিত্যধারায় বিশিষ্টতায় উজ্জ্বল। কাজেই ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র সঙ্গে যুক্ত দীনেশচন্দ্রের জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি যে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে তা তার মৃত্যুর ৮০ বছর পরেও স্তিমিত হয়নি। এর কারণ তিনি বাংলার ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতি শুধু সংগ্রহই করেননি, তা সম্পাদনা করে সর্বস্তরে পৌঁছে দিয়েছেন।
