ভালোবাসা

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৯, ১৭:৫৩

লিটন মহন্ত

এমন অসভ্য মহিলা আমি জীবনে দেখিনি। আর তুমিও ঢ্যাং ঢ্যাং করে অত বড়ো মেয়েকে কোলে নিতে গেলে। চোখ মুছতে মুছতে কথাগুলো তৃণা বলল। জাফরের পকেটে একটা একলক্ষ টাকার চেক কচকচ করছে, তবুও জাফরের মন খারাপ নিতুর জন্য, কারণ ঘটনাটার জন্য নিতু খুব কষ্ট পেয়েছে। জাফর নিতুকে খুব ভালোবাসে। জাফর ঠিক করেছে এই টাকা দিয়ে নিতু আর জারিফের জন্য একটা ভালো বাসায় উঠবে—যেখান থেকে আকাশ দেখা যাবে, নক্ষত্র দেখা যাবে, আলো-বাতাসের কোনো কমতি থাকবে না

এখন কথাটা নিতুকে বলা হয়নি, কথাটা বলা দরকার। নিজের স্ত্রীর কাছে সব কথা বলা যায় না, কিন্তু এই কথাটা বলতে হবে। অন্ধকার ঘরে টিম টিম করে ডিম লাইট জ্বলছে, মশারির ভেতর তিন জন মানুষ। দেয়ালের পাশে মিতু তার ছেলেকে ঘুম পাড়াচ্ছে, জারিফের দশ মাস বয়স। ঘুমের ভেতর জারিফ ছটফট করছে, খেতে চায়। নিতু ছেলেকে আরো কাছে নিল, বুকের কাছে। জারিফ সারাদিন বাসায় হামাগুড়ি দেয় আর উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, থপ্ করে পড়ে যায়। হাতের কাছে যা পায় তা-ই মুখে দেয়। ছেলেকে নিয়ে সারাদিন মহাব্যস্ত থাকে নিতু। জারিফের ডায়াপার চেঞ্জ করল, বাথরুম থেকে এসে নিতু স্বামীর পাশে মুখ করে শুয়ে পড়ল। জাফর ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে, না বলা কথা বুকের ভেতর ঘুটঘুট করছে, সেই ঘুটঘুট থেকে পচা-মজা গন্ধ উঠছে, ব্যাপারটা ঝেড়ে ফেলা যাক। কথা শুরু করার আগেই নিতু ঘুমিয়ে গেল, কোনো সাড়াশব্দ নেই। ঘরের ভেতর শুধুই সিলিং ফ্যানের শব্দ, মুখের মধ্যে একদলা থুতু জমা হয়, বেসিনে ফেলা দরকার, ইচ্ছে করছে না। মশারির বাইরে পা রাখল জাফর, মনে হলো রাত মানেই বিছানা, স্ত্রীর শরীরের গন্ধ, বাচ্চার হিসুর গন্ধ, অন্ধকারের তরল নিঃশ্বাস আর কিছু সুখ সুখ ভালোলাগার শরীরী স্পর্শ, খুব সাময়িক সেই সুখ। জলের ভেতর অন্ধকার যেমন থাকে তেমনিভাবে এই নাগরিক জীবনে মানুষ আর মানুষ থাকে না, সবকিছু চুষে খায় মহাজনের জিহ্বা। এই নিম্নমধ্যবিত্ত জীবন বড়োই বিরক্তিকর, পাতের এঁটো চাটতে চাটতে জীবন পার, কিন্তু দু’ চোখভরা স্বপ্ন আর না-পাওয়ার বেদনায় শুধু হাপিত্যেশ করা। রাতের ঘুমে রাতটা আর যেন পরিচিত নেই, অহেতুক ঘুণেধরা ধূসর সময় মনে হয়। বেদনার নীল বিছানা যেন সমস্ত পৃথিবীময় বিছিয়ে দিয়েছে কেউ, তবুও কেউ নেই, থাকলে মানুষে মানুষে এত বৈচিত্র্য থাকত না। একই পৃথিবীতে বৈষম্যের একটা সীমারেখা থাকা দরকার, এখন মনে হয় এটাই স্বাভাবিক, বৈষম্য থাকবে আকাশ আর পাতাল, যারা উড়তে পারবে তারা আকাশে যাবে আর যারা ব্যর্থ তারা পাতালে চলে যাবে, বেঁচে থাকার অধিকার বলে কোনো কথা নেই। জাফর একটা প্রাইভেট কোম্পানির সহকারী এইচআর এক্সিকিউটিভ, যা বেতন পায় সেই টাকা দিয়ে খুব কষ্টে তার ঢাকা শহরে চলতে হয়, কারণ বেতনের কিছু অংশ গ্রামে পাঠাতে হয় বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য। নিতুকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল জাফর, নিতুদের অর্থনৈতিক অবস্থা জাফরদের মতো এত খারাপ নয়। জাফরের একটাই সম্বল, তা হলো সে স্মার্ট আর দেখতে অনেক সুদর্শন। মেয়েরা চিরকাল সুন্দর ছেলেদের পছন্দ করে, মেয়েদের শরীর প্রায়শই ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে সেটা সবসময় ঠিক থাকে না। জারিফ জন্ম নেওয়ার পর থেকেই নিতু কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করছে, ‘এই বাসাটা বদলানো দরকার একটুও আলো বাতাস নেই, দিনের বেলাও ইলেকট্রিক বাতি জ্বালাতে হয়, দেয়ালে নোনা ধরেছে ড্যাম হয়ে গেছে, আমার জন্য না হোক বাবুর জন্য হলেও প্রয়োজন।’ নিতুর কথা শুনে জাফর শুধু হু হু করেছে; কোনো সদুত্তর দেয়নি। ঢাকা শহরে বাসা বদল মানেই অন্তত পঞ্চাশ হাজার টাকা দরকার, অ্যাডভান্স, গাড়ি ভাড়া, লেবার, নতুন বাসায় গ্যাসের লাইন, ইলেকট্রিক লাইন কত কত ঝামেলা, গড়গড় করে টাকা খরচ হয়। ব্যাংকের জমানো টাকায় হাত দেওয়া যাবে না, সেটাই তো বিপদে-আপদে সম্বল, সেখান থেকেই তো প্রায় এক লক্ষ টাকা খরচ হলো বাবু হওয়ার সময় ক্লিনিকের বিল দিতে। বাড়তি কিছু করতে গেলেই বাড়তি টাকার দরকার, বেতনের বাইরে জাফরের তো আর কোনো ইনকাম নেই। বিয়ের পর থেকেই এই বাসায় নিতু চার বছর কাটাল। জাফরের অফিসের এমডি অসম্ভব ভালো মানুষ, শুধু মাঝে মাঝে কিছু উদ্ভট কাণ্ড করে, কিন্তু কারো কোনো ক্ষতি করে না। এমডি সাহেবর স্ত্রী ময়ূরী ম্যাডাম স্বামীর মতো অদ্ভুত সব শখ পূরণ করে, মাঝে মাঝে তার ব্যবহারে অফিস স্টাফ অফিসাররা বেশ বিব্রত হয়। মানুষের কাছে টাকা না থাকলে যেমন ঘোড়ারোগ হয় তেমনি অতিরিক্ত টাকা থাকলেও মানুষ ঘোড়ারোগে পড়ে। ময়ূরী ম্যাডাম যেদিন অফিসে আসেন, সেদিন সবাই বেশ ভয়ে ভয়ে থাকে, কোথায় কখন কোন কাণ্ড ঘটে যায়। জাফর ম্যানেজারের রুমে বসে আছে, একটা দরকারি নিয়োগ ফাইল দেখছে, কিছু ইয়াং সেলসম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে কোম্পানি প্রোডাক্ট বিপণন করার জন্য। ম্যানেজার মইনুল হোসেন অত্যন্ত রাশভারী মানুষ, হঠাত্ এমন একটা হাঁচি দিলেন, হাতের ধাক্কায় ফাইল নিচে পড়ে গেল। জাফর অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিল, তার সামনে হাসলে ব্যাপারটা মাইন্ড করবেন। মইনুল হোসেন মানুষটা ময়ূরী ম্যাডামের সামনে পড়লে একেবারে বেড়াল হয়ে যান, তখন তাকে দেখলে মায়া হয়। বিকালে এমডি একটা জরুরি মিটিং কল করলেন তার রুমে। সবাই উপস্থিত, অনেকগুলো সাপ্লাই চেইন নিয়ে চুক্তির কথা হলো, নতুন প্রোডাক্ট ব্রান্ডিংয়ের জন্য নতুন মডেল খোঁজা হচ্ছে, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলো, নতুন রিক্রুটমেন্ট নিয়ে বেশকিছু নীতিগত পরিবর্তন আনা হলো, ছেলেমেয়েরা মার্কেটিং প্রোফেশনে বেশিদিন থাকতে চায় না। মিটিং শেষ, চা-কফি খাওয়া শেষ হয়ে গেছে, শেষে এমডি সাহেব গলা কেশে বললেন, ‘সামনের দশ তারিখ আমার ছোট ছেলের প্রথম জন্মদিন। আপনাদের সবার দাওয়াত। পরিবার নিয়ে আসবেন, ডিনার করবেন, কোম্পানির হেড অফিসের সবাইকে দাওয়াত করা হবে, এমনকি সিকিউরিটি গার্ডদেরও সেই অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত চাই।’

সবাই সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে, এমডি সাহেব রাশভারী গলায় বললেন, ‘আপনাদের ময়ূরী ম্যাডামের হুকুম।’

মইনুল হোসেন হেঁচকি তুললেন, জাফরের আবার হাসি পেল, কিন্তু হজম করল ভেতরে ভেতরে। পরের দিন একটা জরুরি কাজে ম্যানেজারের রুমে ডাক পড়ল জাফরের, ‘স্যার ডেকেছেন...?’ 

‘জাফর, তোমার সাথে আমার জরুরি কিছু কথা আছে, দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে দাও।’

‘স্যার, আপনি ঘামছেন কেন?’

‘ঘামছি নাকি, আমার ব্যাপার তো তুমি জান না, তোমার ভাবী কোনোভাবে রাজি হবেন না সেই জন্মদিনের ডিনারে অ্যাটেন্ড করতে, তোমার ভাবী ময়ূরী ম্যাডামকে একদম দেখতে পারে না। একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছিল... বলতে নিজেরই লজ্জা লাগে।’

‘বলুন স্যার, ব্যাপারটা আমাদের জানা দরকার।’

‘তুমি কাউকে বোলো না প্লিজ, গত জানুয়ারি মাসে গাজিপুর শালবাগানের ভেতর এমডি স্যার একটা রিসোর্ট তৈরি করেছেন মায়াকানন, সেখানে সব ম্যানেজারদের নিয়ে একটা মিটিং কল করা হলো, ম্যানেজারদের সঙ্গে শুধু তাদের মিসেস যেতে পারবে, বলতে পার কিছুটা পিকনিকের মতো। মিটিং রুমে মিটিং শুরু হলো, ভাবীরা সব বাইরে গল্প করছে মানে আড্ডা দিচ্ছে, মিটিংয়ে এমডি স্যারের সাথে ময়ূরী ম্যাডাম আছেন। মিটিংয়ের শুরুতেই ময়ূরী ম্যাডাম বললেন, কোথা থেকে একটা বিশ্রী গন্ধ আসছে মনে হচ্ছে, পায়ের মোজার গন্ধ, প্লিজ আপনাদের কার মোজা থেকে এই বিদঘুটে গন্ধ আসছে, তাকে অনুরোধ করব বাজারে গিয়ে নতুন মোজা কিনে নিয়ে আসুন। আমি যদি বুঝতে পারি কার পায়ের মোজার গন্ধ, তবে তাকে এই মুহূর্তে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিব। বলো তো কী করি? বুঝতে পারলাম আমার পায়ে এক সপ্তাহের পুরাতন মোজা, সকালে তাড়াহুড়োয় বুঝতে পারিনি, গন্ধওয়ালা মোজাটা পরেই দৌড় দিয়েছি। কী আর করা পাগল মহিলা! আমি উঠে দাঁড়ালাম, স্যরি ম্যাডাম, এক্ষুনি যাচ্ছি। আমি মিটিং রুম থেকে দৌড়ে বের হলাম, কী লজ্জা! কী লজ্জা! তোমার ভাবী আমাকে এ অবস্থায় দেখে বলল কী হয়েছে তোমার? কোনো উত্তর দেইনি, গাড়ি নিয়ে ছুটে গেছি বাজারে।’

স্যার, তারপর কী হলো?

‘ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেল, অন্য ভাবীদের সামনে আমি আর তোমার ভাবী লজ্জায় মরে যাই, তোমার ভাবী তো কিছুই খেল না, শুধু আমাকে তাড়া দিচ্ছিল বাড়ি ফেরার জন্য। আমি তো চাকরি ছেড়েই দিতাম, শুধু বেলাল সাহেব মানে মার্কেটিং জেনারেল ম্যানেজারের অনুরোধে রেজিগনেশন লেটার দেইনি। তোমার ভাবী কোনোভাবেই এই বার্থ ডে পার্টিতে যাবে না।’

‘তাহলে কী হবে স্যার?’

‘তা-ই তো ভাবছি, তুমিও সাবধানে থেকো। এই মহিলার পাল্লায় পড়লে জীবন ছ্যাঁড়াব্যাড়া হয়ে যাবে।’

‘স্যার, সেদিন সকালে এমডি স্যারকে মেবাইল করে বলবেন, আপনার লুজ মোশন হয়েছে কোনোভাবেই কন্ট্রোল হচ্ছে না...।’

‘সর্বনাশ! এই কথা বললে দেখা যাবে ময়ূরী ম্যাডাম শোনামাত্রই ডাব আর স্যালাইন নিয়ে ড্রাইভারসহ বাসায় গিয়ে হাজির হবে।’

‘স্যার, এ তো আরেক কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে...!’

‘দেখা যাক জাফর, কিছু একটা করতে হবে, তোমার ভাবীকে পায়ে ধরে হলেও পার্টিতে নিয়ে আসতে হবে, দুই ম্যাডামের জ্বালায় আমি অস্থির হয়ে আছি।’

এমডি সাহেবের ছেলের জন্মদিনে তার গুলশানের ডুপ্লেক্স বাসায় সবাই উপস্থিত, শুধু মইনুল হোসেন আসতে দেরি করলেন। নিতু আজ একটু হালকা সাজগোজ করেছে, তাতেই তাকে অসাধারণ সুন্দরী লাগছে। জারিফ জাফরের কোলে, সে বাবার কোলেই ছটফট করছে আর বা... বা... বলছে। বিশাল ড্রইংরুমের মাঝখানে একটা টেবিলের ওপর কেক কাটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমডি সাহেবের পাশে তার বড়ো মেয়ে তৃণা হুইল চেয়ারে বসা, বয়স সাত-আট বছর হবে। সবাই মুহূর্তে বুঝতে পারল তৃণা মানসিক প্রতিবন্ধী, তার অসংলগ্ন চাহনি, হাত-মাথার অস্বাভাবিক মুভমেন্ট, ভাঙা ভাঙা উচ্চারণ সবকিছু থেকেই সমস্যাটা বোঝা যাচ্ছে। এই মেয়ের জন্মের পর থেকেই নাকি ময়ূরী ম্যাডাম একটু অন্যরকম হয়ে গেছেন, যেটা ভাবেন, সেটা করতেই হবে। একটা ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি কী হবে সেটা নিয়ে চিন্তা করেন না। তৃণা হাত ইশারা করে জাফরকে ডাকছে, আংকে... আংকে...। জাফর জারিফকে নিতুর কোলে দিয়ে তৃণার কাছে গেল। ময়ূরী ম্যাডাম ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন, তিনি জাফরকে বললেন—তৃণা আপনার কোলে উঠতে চায় জাফর, ওকে তো কেউ কোলে নেয় না। আচ্ছা শুনুন সবাই, এই অনুষ্ঠান চলাকালে যে তৃণাকে কোলে করে রাখবে, তাকে আমি এক লক্ষ টাকা সন্মানী দেবো, সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকাউন্ট পে চেক, দুই দিনের মধ্যেই ক্যাশ পেয়ে যাবেন।

ময়ূরী ম্যাডামের এই ধরনের প্রস্তাব শুনে সবাই সবার মুখের দিকে চাইছে, মইনুল হোসেন স্ত্রীর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কেউ সাহস করে এগিয়ে আসছে না, কারণ কেউ জানে না অনুষ্ঠান কতক্ষণ পর্যন্ত চলবে, আর এই সাত-আট বছরের মেয়েকে কোলে রাখা সহজ কাজ নয়।

তৃণা জাফরের দিকে হাত বাড়াল, জাফর পিছন ফিরে দেখে তার পেছনে কেউ আছে নাকি—যার কোলে তৃণা যেতে চায়। তেমন কেউ নেই, সামনে জাফর। জাফর কোলে নিল। বয়সের তুলনায় তৃণার গ্রোথ ভালো। অনুষ্ঠান এখনো শুরু হচ্ছে না। কিছুক্ষণের মধ্যে জাফর ঘামতে শুরু করল এসি রুমের ভেতর। পিঠ বেয়ে ঘাম প্যান্টের ভেতর চলে যাচ্ছে। তৃণা জাফরের চুল নিয়ে খেলছে। এমডি সাহেবের ছেলে কেক কাটার সময় কান্না শুরু করে দিল। কেক কাটতে দেরি হচ্ছে। জাফর তৃণাকে ডান পাশ থেকে বাম পাশে কোলে নিল, হাতের পেশিতে টান পড়ছে। জন্মদিনের কেক কাটতে কাটতে প্রায় চল্লিশ মিনিট পার হয়ে গেল। জাফর আর পারছে না, বোধহয় সেই তৃণাকে কোলে নিয়ে মেঝেতে পড়ে যাবে। জাফরের কষ্ট নিতু বুঝতে পারছে। তার চোখ ছলছল, সে কারণে নিতুর চোখে জাফর চোখ রাখছে না। ময়ূরী ম্যাডাম হয়তো ভুলেই গেছেন জাফরের কথা। সবাই জন্মদিনের কেক খাচ্ছে, ময়ূরী জাফরকে কেক খাইয়ে দিল। জাফর খেতে পারছে না, তার মুখে ঠোঁটে কেকের ক্রিম লেগে আছে। প্রায় পঞ্চাশ মিনিট পর তৃণা বলল, আংকে... আমি হিসু... দিব... সঙ্গে সঙ্গে পাশেই দাঁড়ানো আয়া তাকে হুইল চেয়ারে নামিয়ে বাথরুমে নিয়ে গেল। জাফর টলতে টলতে থপ করে সোফায় বসে পড়ল।

সারা রাস্তায় বাসায় ফেরার সময় নিতু সিএনজিতে কান্না করছে, জারিফ জাফরের কোলে ঘুমাচ্ছিল।

এমন অসভ্য মহিলা আমি জীবনে দেখিনি। আর তুমিও ঢ্যাং ঢ্যাং করে অত বড়ো মেয়েকে কোলে নিতে গেলে। চোখ মুছতে মুছতে কথাগুলো তৃণা বলল। জাফরের পকেটে একটা একলক্ষ টাকার চেক কচকচ করছে, তবুও জাফরের মন খারাপ নিতুর জন্য, কারণ ঘটনাটার জন্য নিতু খুব কষ্ট পেয়েছে। জাফর নিতুকে খুব ভালোবাসে। জাফর ঠিক করেছে এই টাকা দিয়ে নিতু আর জারিফের জন্য একটা ভালো বাসায় উঠবে—যেখান থেকে আকাশ দেখা যাবে, নক্ষত্র দেখা যাবে, আলো-বাতাসের কোনো কমতি থাকবে না। ব্যালকনিতে টবে গাছ লাগাবে, নিতুর গাছ লাগানোর খুব শখ। এই কথাটা মনে পড়তেই জাফরের মন মুহূর্তে ভালো হয়ে গেল। জাফর এক হাত দিয়ে নিতুর মাথাটা টেনে নিল নিজের কাঁধে—নিতু, আমরা আগামী মাসেই তোমার মনের মতো একটা ভালো বাসায় উঠব। তখন তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। রাস্তা ফাঁকা, সিএনজি দ্রুত ছুটে চলছে। বৃষ্টির পানির জন্য নিতু জাফরের শরীরের সঙ্গে সেঁটে গেল। অদ্ভুত রকমের ভালোলাগায় জাফর আর নিতু নিমজ্জিত হতে থাকে অনেকদিন পর।