কলকাতা উত্তেজিত। উদ্বুদ্ধ। নব কলরবে সজ্জিত, মহাকলরবে মুখরিত মহানগরের নন্দন কাননে, আজ ২২ ভারতের প্রথম দিনরাতের ক্রিকেট ম্যাচের সাক্ষী হয়ে থাকবে দুই বাংলার সম্মিলিত, আবেগ তাড়িত উচ্ছ্বাস।
এ আনন্দের আরেক কারণ, উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানকে সপর্শ করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সপার্ষদ। তার সানন্দ উপস্থিতিতে ভারতীয় ক্রিকেটনেতা সৌরভ গাঙ্গুলির অভিপ্রায় পূর্ণতা পাবে। শেখ হাসিনা আর সৌরভকে অভিনন্দন। অভিবাদন দুই বাংলার প্রায় ত্রিশ কোটি বাঙালিকে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সামাজিক আর রাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। এখানে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত স্বচ্ছতাও নেতৃত্বের ঘোষিত অঙ্গীকারকে অস্বীকার করার উপায় নেই। ব্যক্তিপুজোয় আমাদের আস্থা নেই। কিন্তু ব্যক্তি যখন সমাজের মুখ হয়ে ওঠেন, যখন সুন্দর থেকে সুন্দরতরকে জড়িয়ে স্বপ্ন দেখেন, আরও দশজনকে স্বপ্নময় হয়ে উঠতে উত্সাহ জোগাতে থাকেন, স্বপ্নের সুনির্দিষ্ট অভিমুখ রচনার পথের কাঁটাকেও ক্রমাগত আঘাত করতে বাধ্য হন, তখন তাঁর সুকৌশল, হূদয়ের সংকল্প, সংকল্পের প্রাক ইতিহাস ছুঁয়ে সমসাময়িক মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়ে। সময় আর ইতিহাসের দাবিকে আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। নিকটতম পরিবেশ, প্রতিবেশের অবদানকেও তাত্ক্ষণিকতামুক্ত দৃষ্টি দিয়ে ভেবে দেখতে হয়। নির্মোহ, নিরপেক্ষ ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে অগ্রাধিকার দেবার ডাক আসে।
শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের একমাত্র প্রাধানমন্ত্রী, কলকাতার সঙ্গে যাঁর বংশানুক্রমিক যোগাযোগ অবিচ্ছিন্ন। বঙ্গবন্ধুর ছাত্র রাজনীতির শুরু কলকাতায়। তাঁর নিবিড়তম সহযোগী মানিক মিঁয়া, যাঁকে আমরা বাংলাদেশের অন্যতম, নেপথ্য স্থপতি মনে করি, তাঁরও হয়ে ওঠার, তাঁর সাংবাদিকতার, তাঁর প্রজ্ঞা আর প্রতিভার স্ফূরণের শুরুয়াত এই শহরে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শগত পূর্বগামী সুভাষচন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাস ও সোহরওয়ার্দির কর্মকাণ্ডের উত্তরণের আরম্ভেও কলকাতা। বাংলাদেশের উত্থানের মুহূর্তে এখানকার সাধারণ মানুষ, এখানকার বিবেক আর বুদ্ধির সজল ও ক্ষুদ্ধ উচ্চারণের বৃত্তান্ত বঙ্গবন্ধু ভোলেননি। শেখ হাসিনাও বিস্মৃতির বিভ্রাটকে প্রশয় দেয়নি। তাঁর তিন দফার প্রধান মন্ত্রীত্বের আমলে কলকাতার আমন্ত্রণ পেলেই ছুটে এসেছেন, এবারও আসছেন। তাঁর এই বারবার আসা যাওয়া প্রমাণ করছে, দিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক সৌহার্দ নির্মাণের পাশপাশি, বাঙালির স্মৃতি-সত্তার সাংস্কৃতিক উত্সভূমিকে আলাদা জায়গা, আলাদা মূল্য দিতে তিনি প্রবল আগ্রহী। সম্ভবত এজন্যই তাঁর আমলে কলকাতার সপন্দনে বাংলাদেশের অরাজনৈতিক অবস্থান ক্রমশ উঁচু হচ্ছে। আশা করি এর ঊর্দ্ধমুখী উত্তরণ আরও প্রশস্থ, আরও সৃষ্টিমুখর হয়ে উঠবে। এই যে, নভেম্বরে রবীন্দ্র গায়িকা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাক নামে পরিচিত মোহরকুঞ্জে ১০ দিন জুড়ে সাড়ম্বরে নাচে, গানে, কবিতায় উদযাপিত হল নবম বাংলাদেশ বইমেলা; এই যে, ১ নভেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর বাংলাদেশের খাদ্য উত্সবে মেতে উঠল চিরচঞ্চল আনন্দনগরী; এই যে, দিন-রাতের ক্রিকেট ম্যাচ আর ভারত-বাংলাদেশের টেস্টকে ঘিরে সৌহার্দ বিকিরণের উদ্দীপ্ত শিহরণ দেখা যাচ্ছে; এই যে আলোকিত চোখ, আলোকিত মুখ ম্যাচের টিকিট কিনতে ইডেনের দিকে ছুটছে, তা কি শুধু খেলার প্রতিভাদের ঝড়ো ব্যাটের দাপট দেখতে? না মাঠে বসে তাদেরই নিকটতম আত্মীয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে খেলা দেখার আনন্দেরও শরিক হতে? বলা দরকার, শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি, তাঁর নিষ্ঠা, সন্ত্রাসদমনে তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্য, উন্নয়ন আর মহিলাদের ক্ষমতায়নে তাঁর নিরন্তর চেষ্টা- এই বঙ্গেও তাঁকে জনচিত্তজয়ী করে তুলেছে।
বঙ্গবন্ধু ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোনও দেশনেতা বা সরকার প্রধান কখনও এরকম জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সমর্থ হননি। হাসিনার সৌভাগ্য, তাঁর বাবা ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা। আর তিনি স্বপ্নস্রষ্টা। স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের প্রেম আর পরিণয় যখন অবশ্যম্ভাবী, অপরিহার্য হয়ে ওঠে, তখন ব্যক্তির বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস বাঁধ ও বাধা ভেঙ্গে দেয়। নিজের অজান্তে তিনি ইতিহাসের কাঙ্খিত পুরুষ কিংবা নারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। কেউ কেউ হয়তো বাড়তি পুজো দাবি করেন, কেউ কেউ পুজোর দাবিকে এড়িয়ে গিয়ে প্রকাশ্যে বলে দেন, বাড়াবাড়ি বন্ধ হোক। শুনেছি, শেখ হাসিনা তাঁর দলের কর্মী আর নেতাদের এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। খবরটি যদি সত্যি হয়, তা হলে ঋদ্ধ অভিজ্ঞ প্রাচ্যকন্যাকে আমাদের আরেকটি নমস্কার। তাঁর ত্যাগ, তাঁর প্রতিসপর্ধা, আবহমান বঙ্গ সংস্কৃতির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার বিস্তার দেখে পশ্চিমবঙ্গ মোহিত। কলকাতায় তিনি আবার আসছেন, আমাদের আরও মেলাবেন, একথা ভাবতে আর বলতে ভালো লাগছে। খেলার সিপরিটে প্রাণিত নির্বিশেষ, অভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে গর্বিত এপারের বঙ্গবিশ্বের অভিপ্রায় এই যে, যৌথ প্রচেষ্টা ছড়িয়ে পড়ুক নানা স্তরে, নানা অঙ্গণে। যেমন সুস্থ-সবল অর্থনীতির নির্মাণে, তেমনি লোকায়ত ও নাগরিক সংস্কৃতির শাশ্বত অভিজ্ঞান টিকিয়ে রাখার মিলনা্তক ব্যাপ্তিতে। বইমেলা, গানমেলা, বস্ত্রমেলা এবং খেলার সঙ্গে খেলার স্বাস্থ্যময় অনুভবের মানচিত্রে এপার আর ওপারের সব প্রতিবন্ধকতা যেন যায় টুটে। ইডেনে ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ক্রিকেট ম্যাচের মর্মের সত্য আরও বড়ো, আরও বিস্তৃত হোক। টিকে থাক সুন্দরের হাসির মতো তার স্থিতধী, কাঙ্খিত স্বপ্ন।
n লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক,
সমপাদক আরম্ভ

