স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বৈঠকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হলেও গতকাল সারাদেশে বাস চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ধর্মঘট পালনকারী পরিবহন শ্রমিকদের হাতে হেনস্তার ভয়ে আন্তঃজেলা রুটের বেশির ভাগ বাস ঢাকা ছেড়ে যায়নি। রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে অর্ধেক বাসও ছাড়েনি। সেখানে বাসচালক ও হেলপারদের অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায়ও বাস চলাচল বন্ধ রাখেন শ্রমিকরা। খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, যশোর, রাজবাড়ী, নওগাঁ, শেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা থেকে কোনো বাস ছাড়েনি। তবে রাজধানীতে চলাচল শুরু করেছে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান। কিছু কিছু জেলায় সীমিত আকারে বাস চলাচলও শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ১৭ নভেম্বর নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হওয়ার পর পরই অঘোষিতভাবে দেশের বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল বন্ধ করে দেন পরিবহন শ্রমিকরা। গত চার দিন ধরে দেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে কোথাও আন্তঃজেলা বাস চলাচল করছে না। আন্দোলনরত শ্রমিকদের একাংশ বলছেন, আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। কারণ তাদের অনেকের কাছেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই।
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক রুস্তম আলী খান বলেন, দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসে পণ্য পরিবহন শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি প্রত্যাহারের পর স্বাভাবিক হয়েছে ট্রাক চলাচল। সকাল থেকে সুশৃঙ্খলভাবে বিভিন্ন স্থানে পণ্যবাহী পরিবহন শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন। রাজধানী ঢাকা থেকে বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহন শুরু হয়েছে। কোথাও কোনো বাধা সৃষ্টি করা হয়নি। তবে এই পরিবহন নেতা বলেন, বাসমালিকরা বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল বন্ধ করে রেখেছেন। যে কারণে যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছে বলে খবর পেয়েছি।
এদিকে বাস না ছাড়ার কথা অস্বীকার করে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস-মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, ‘সায়েদাবাদ থেকে সিলেটসহ পূর্বাঞ্চলের সব পরিবহন ছেড়ে গেছে। কোথাও কোনো সমস্যা নেই। আমি সকাল থেকে সায়েদাবাদ টার্মিনালে রয়েছি। শ্রমিক-মালিক সবাই পরিবহন নিয়ে সড়কে নেমেছেন।’
মহাখালী বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির সভাপতি হাজি আবুল কালাম বলেন, শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন, এটা সত্য। আমাদের বাসশ্রমিকদের কোনো সমস্যা নেই। তবে পরিবহনের সংখ্যা কিছুটা কম বলে দাবি করেন মালিক সমিতির এই নেতা।
চালকদের অনেকে বাড়ি চলে যাওয়ায় মহাখালী থেকে এখনো সব বাস চলাচল শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন মহাখালী আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক। তিনি জানান, বাসশ্রমিকরা কোনো আন্দোলনে নেই। কিন্তু তারা বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। ফলে সব গাড়ি চলছে না। চলছে ৫০ শতাংশের কম গাড়ি।
এনা পরিবহনের কর্মী মিজানুর রহমান বলেন, সড়কে অনেক জায়গায় চালকদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেক বাস ভাঙচুরও হয়েছে। এ কারণেই চালকরা বাস বের করতে চাইছেন না।
গাবতলী আন্তঃজেলা বাস-ট্রাক মালিক সমিতির সদস্য সালাউদ্দিন বলেন, গাবতলী টার্মিনাল থেকে বাস সেভাবে এখনো ছাড়তে পারছি না। অনেক যাত্রী এসে বসে আছেন, এটা সত্যি। দূরপাল্লার রুটে আমরা যেখানে ১০টা গাড়ি ছাড়তাম, সেখানে ছাড়ছি দুটা গাড়ি। তিনি জানান, সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে খুলনার রুটে। খুলনার বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা এখনো গাড়ি ছাড়তে চাইছেন না। তবে উত্তরবঙ্গের কিছু বাস ছেড়ে গেছে।
এদিকে গতকাল সকালে রাজধানীর কল্যাণপুর, আগারগাঁও, মহাখালী, তেজগাঁও ও গুলশান এলাকায় দেখা যায়, দুই লেনের সড়কে একটি লেনে গাড়ির চাপ থাকলেও আরেকটি বেশ ফাঁকা। ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতে অন্য দিনের মতো বিশেষ চাপ নেই। পিকআপ, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান, বাস, মিনিবাস ও দূরপাল্লার বাসও কম চলাচল করছে।
ডিএমপির ট্রাফিক উত্তরের উপ-কমিশনার (ডিসি) প্রবীর কুমার দাস বলেন, সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক। তবে যানবাহনের সংখ্যা কিছুটা কম। নতুন আইনের সঙ্গে যাদের কাগজ-ডকুমেন্টে ব্যত্যয় রয়েছে, তারা রাস্তায় গাড়ি নিয়ে নামছেন না। তবে কিছুদিনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।
ঢাকা-খুলনা রুটের ঠিকানা পরিবহনের মালিক বাবুল মিয়া বাবলু বলেন, ‘গতকাল (বুধবার) রাতেই তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এসেছে। তার পরও কেন শ্রমিকরা গাড়ি ছাড়তে দেবেন না? প্রশাসন কী করছে? কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?’ দূরপাল্লার রুটের সোহাগ পরিবহনের কাউন্টার ব্যবস্থাপকদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, সোহাগের যে গাড়িগুলো ছেড়ে গিয়েছিল খুলনার দিকে, সেগুলো ফিরছে না। শ্রমিকরা সে গাড়িগুলো আসতে দিচ্ছেন না। তাহলে ঢাকায় গাড়ি পাব কই? তাই এই সংকট। তবে রাতের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান বিপ্লব বলেন, আমরা গত তিন দিন ধরে চেষ্টা করেছি। কিন্তু শ্রমিকরা আমাদের কথা শুনছেন না। তারা আইন সংশোধন না হলে গাড়ি চালাতে রাজি নন। ঢাকায় আলোচনা হচ্ছে, কেন্দ্র থেকে সিদ্ধান্ত হলে তারপর গাড়ি চলাচল শুরু করা যাবে। তবে তিনি বলেন, সন্ধ্যার পর কিছু কিছু গাড়ি ছাড়তে শুরু করেছে। আশাকরি আগামীকাল ফেডারেশনের মিটিংয়ের সিদ্ধান্তের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
এদিকে চট্টগ্রাম ও ঝালিকাঠিসহ দক্ষিণের জেলাগুলোতে বাস চলাচল শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। চট্টগ্রামের সেন্টমার্টিন পরিবহন ও সোহাগ পরিবহনের কর্মকর্তারা বলেছেন, রাত থেকেই তাদের বাস নির্দিষ্ট গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনসহ ৯ দফা দাবিতে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচি ঘোষণা করে মঙ্গলবার। বুধবার সকাল থেকে কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর ট্রাকের সঙ্গে সারাদেশে বাস চলাচলও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বুধবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তার ধানমন্ডির বাসভবনে পরিবহন নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দিলে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক-শ্রমিকরা কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
