নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি এগিয়ে যাচ্ছে। গত ১০ বছরের ব্যবধানে পোশাক রপ্তানি পৌনে তিন গুণ বেড়েছে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয়। যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বে দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ।
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক খাতের ভবিষ্যত্ নিয়ে অনেকেই নানা রকম আশঙ্কার কথা বলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অগ্রাধিকার সুবিধা বা জিএসপি নেই। বাংলাদেশ এখন জিএসপির আশা ছেড়েই দিয়েছে। ইউরোপের বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা থাকলেও বারবার হুমকি আসছে। ক্রেতাজোটের পরিদর্শন প্রতিষ্ঠান অ্যাকর্ডের মেয়াদ না বাড়ালে এই সুবিধা বাতিলও হয়ে যেতে পারে। অথচ এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান ক্রেতা। যুক্তরাষ্ট্রের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নও যদি শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা প্রত্যাহার করে তাহলে এই খাত কিছুটা অসুবিধায় পড়বে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি ছিল মাত্র ৩ কোটি মার্কিন ডলার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে সেটি বেড়ে হয় ১ হাজার ২৪৯ কোটি ডলার। গত অর্থবছর পোশাক রপ্তানি হয় ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলারের। তার মানে ৩৬ বছরের ব্যবধানে পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে ১ হাজার ১৩৩ গুণ। আর সর্বশেষ দশ বছরে বেড়েছে পৌনে তিন গুণ। বছরের পর বছর ধরে সরকারের নীতিসহায়তা ও প্রণোদনা, সস্তা শ্রম আর উদ্যোক্তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশের পোশাকশিল্প শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। বিপুলসংখ্যক বেকারের বিশেষ করে নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান, সহযোগী উপখাত আর কোটি কোটি ডলারের রপ্তানির কারণে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে পোশাকশিল্প।
পোশাকের ব্যবসায় নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ আসছে। শুরু হয়েছে মূল্যযুদ্ধ। উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তৃতীয় সর্বোচ্চ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ ভিয়েতনাম ইতিমধ্যে বাংলাদেশের একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে।
চলতি বছরই হয়তো ভিয়েতনামের কাছে দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারকের মুকুট হারাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রপ্তানি ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে যাওয়ায় শঙ্কাটি আরো প্রবল হচ্ছে। ইতিমধ্যে বছরের প্রথম ৯ মাসে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে ভিয়েতনাম।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম ৯ মাসে বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ৬১০ কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে ভিয়েতনাম থেকে রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৯৩০ কোটি ডলারের পোশাক। তার মানে, ৯ মাসে বাংলাদেশের চেয়ে ভিয়েতনাম ৩২০ কোটি ডলারের পোশাক বেশি রপ্তানি করেছে—এমন তথ্যই দিচ্ছে দেশটির গণমাধ্যম।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধিতে ভিয়েতনাম অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) তথ্যমতে, ভিয়েতনাম চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৩৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৪৫৬ কোটি ডলারের পোশাক, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাজারটিতে শীর্ষ রপ্তানিকারক চীনের রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ১০ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে চীন রপ্তানি করেছে ২ হাজার ১০ কোটি ডলারের পোশাক।
ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ভিয়েতনামের জাতীয় দৈনিক ভিয়েতনাম নিউজ এর এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি বলা হয়েছে, চলতি বছর কয়েকটি বাজারে জটিলতা থাকার পরও দেশটির পোশাক রপ্তানি ৪ হাজার কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাবে। ইতিমধ্যে ৯ মাসে ২ হাজার ৯৩০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানির পাশাপাশি ভিয়েতনামের অভ্যন্তরীণ পোশাকের বাজারও ৯০০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে।
পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনাম যে বাংলাদেশকে ধরে ফেলতে যাচ্ছে, তা কয়েক মাস আগে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিসটিকস রিভিউ ২০১৯ প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), চীন, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ভারত, তুরস্ক, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র—এই শীর্ষ ১০টি দেশ ৪২ হাজার ১০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা মোট রপ্তানির ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে চীন। বিশ্ববাজারে দেশটির হিস্যা ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ।
চীনের পরই একক দেশ হিসেবে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষস্থানে আছে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম। বাংলাদেশ ৩ হাজার ২৯২ কোটি এবং ভিয়েতনাম ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। উভয় দেশের বাজার হিস্যা প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। গত বছর ১০ শীর্ষ রপ্তানিকারকের মধ্যে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা ছিল ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে ভিয়েতনামের বাজার হিস্যা বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ।
সরকার পোশাক রপ্তানিতে নতুন করে ১ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও কিছুটা হয়েছে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে আরো কী করা যায়, সেসব নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে, আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আরো ভালো হবে এবং বিশ্বে দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারকের মুকুট অব্যাহত থাকবে।
ছবি : ইন্টারনেট
