একটি ব্রিজ ও দেশের চিত্র!

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৩:০৪

একদিকে পদ্মা সেতুতে স্প্যান বসাইতে দেখিয়া আমাদের বুক স্ফীত হইয়া উঠে, আমরা উন্নয়নের কল্পনায় মোহিত হই। অন্যদিকে দেশব্যাপী রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণে ‘বিচিত্র ছলনা’ দেখিয়া আমরা সংকুচিত হইয়া পড়ি। তখনই আমাদের আশঙ্কা জাগে, উন্নয়নের সুফল কি আমরা ভোগ করিতে পারিব? কারণ উন্নয়নের ফল ভোগ করিতে হইলে প্রয়োজন সার্বিক উন্নয়ন। একদিকে অনিয়মের পাহাড় থাকিলে উন্নয়নের সুফল ব্যাহত হইতে বাধ্য। কিছু ছোটোখাটো অনিয়ম সারা পৃথিবীতেই দেখিতে পাওয়া যায়। সেই অনিয়মের একটি মাত্রা থাকে; কিন্তু বাংলাদেশে অনিয়মের বুঝি কোনো মাত্রাজ্ঞান নাই! তাহারই একটি উদাহরণ রাজধানীর নিকটেই সাভারের ধামসোনা ইউনিয়নের ‘নির্মিতব্য’ সেতুটি। আট বত্সর চলিল সেতুটির কাঠামোই দাঁড়াইতে পারিল না। ইহার পিছনের কাহিনি বলিতে গেলে বড়োই নির্মম শোনাইবে। ২০১১ সালে সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়াছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। দরপত্রে অংশ নিয়া একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২ কোটি ৩৮ লক্ষ টাকায় সেতুটি নির্মাণের কাজ পাইয়াছিল। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৩ সালের মার্চ মাসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করিবার কথা ছিল; কিন্তু আংশিক কাজ করিয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৮২ লক্ষ ১৭ হাজার টাকা বিল উত্তোলন করিয়া কাজ ফেলিয়া চলিয়া যায়। তিন বত্সর পর ২০১৬ সালে আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ২ কোটি টাকায় কাজটি গ্রহণ করিয়াছিল। ২০১৭ সালের মধ্যে কাজটি শেষ করিবার কথা ছিল; কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানও ৭৮ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা বিল তুলিয়া কাজ না করিয়া চলিয়া যায়।  অবশিষ্ট কাজের জন্য ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকায় কাজটি গ্রহণ করিয়াছিল আরো একটি প্রতিষ্ঠান। এইবারও ঐ প্রতিষ্ঠান কাজ ফেলিয়া চলিয়া যায়। চতুর্থ দফায় এই বত্সর দরপত্র আহ্বান করা হইলে ২ কোটি ৮০ লক্ষ টাকায় অন্য একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি গ্রহণ করিয়াছে; কিন্তু গত সেপ্টেম্বর মাসে কার্যাদেশ দেওয়া হইলেও অদ্যাবধি কোনোরকম অগ্রগতি হয় নাই।

এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলির দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় ইতিমধ্যেই সরকারের কত টাকা বাড়তি গুনিতে হইয়াছে তাহা লক্ষণীয়। প্রশ্ন হইল, ঠিকাদারি কাজের অগ্রগতি ও তদারকি করিবার জন্য সরকারের কয়েক স্তরের প্রকৌশলী রহিয়াছেন। তাহারা কী করিয়াছেন? সংশ্লিষ্ট মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীর নিকট খোঁজ লইয়া জানা গিয়াছে, শেষ দফা যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ ফেলিয়া গিয়াছে, তাহার নিকট হইতে যত্সামান্য ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করা হইয়াছে; কিন্তু ইহার পূর্বের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত হইয়াছে তাহা তিনি জানাইতে পারেন নাই(!)। সম্ভবত অন্ধকারে তলাইয়া গিয়াছে। এই ‘রসিকতা’ শুধু সাভারের এই ব্রিজের ক্ষেত্রেই নহে, দেশের সর্বত্র দেখিতে পাওয়া যায়। দেশের হাতে গোনা দুই-এক জায়গা ব্যতীত অন্য স্থানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এলাকার কাজ বুঝিয়া লইবার ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব দেন না। তাহারা হয়তো মনে করেন, ইহা তাহাদের কর্মের আওতায় পড়ে না! অথচ নিশ্চয়ই তাহাদের এলাকার অধীনে যে কোনো বিষয় নজর রাখিবার অধিকার ও দায়িত্ব তাহাদের রহিয়াছে! এইভাবেই দেশে ‘আবর্জনার’ স্তূপ তৈরি হয়। মনে রাখিতে হইবে, এইসব আবর্জনা দূর করিতে না পারিলে কোনো মহাপরিকল্পনা, কোনো বৃহত্ প্রকল্পই দেশকে যথাযথ ফল আনিয়া দিতে পারিবে না।