দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, সিলেট থেকে
মনে করা হয় যে, ১৮৪৮ সালে বম্বেতে ‘পারসি ওরিয়েন্টাল ক্লাব’ গঠনের ভেতর দিয়ে উপমহাদেশে ক্রিকেটের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু এরও ৩ বছর আগে এই উপমহাদেশেই একটি ক্রিকেট ম্যাচের খোঁজ পাওয়া যায় সেকালের সংবাদপত্রে।
১৮৪৩ সালে ইংল্যান্ডের ‘স্পোর্টিং ইন্টিলিজেন্স’ পত্রিকায় ছাপা হয় একটি ক্রিকেট ম্যাচের স্কোর কার্ড। ‘সেপয়’ বনাম ‘ইউরোপিয়ান ক্রিকেটার্স’-এর মধ্যে আয়োজিত হয়েছিল সেই ম্যাচটি। অনেক ঐতিহাসিকই মনে করেন, এটা ছিল উপমহাদেশের প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ। আর আমাদের জন্য দারুণ খবর হলো, সেই ম্যাচটি আয়োজিত হয়েছিল সিলেটের কোনো একটা চা বাগানের ভেতরের মাঠে!
আঠারো শতকের সেই সিলেট আর নেই। ব্রিটিশরা চলে গেছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু সিলেটের সেই চা বাগানগুলো এখনও সগৌরবে টিকে আছে। সেই ঐতিহাসিক ম্যাচটি কোনো চা বাগানে আয়োজিত হয়েছিল, সেটা আজ আর জানা যায় না। কিন্তু আজ এই ২০১৮ সালে এসে সিলেটেরই এক চা বাগান, লাক্ষাতুরা চা বাগানের ভেতর অনুষ্ঠিত হচ্ছে একের পর এক আন্তর্জাতিক ম্যাচ। টি-টোয়েন্টি, ওয়ানডে পার করে এসে সিলেটের এই লাক্ষাতুরা চা বাগানের ভেতর অবস্থিত আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের ওয়ানডে অভিষেকও হয়ে গেল এবার। সেই আদি কাল থেকে চলে আসা ক্রিকেটের ধারাবাহিকতায় সিলেট এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আয়োজক।
সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের এই নতুন পরিচিতি এখানকার সংগঠকদের ও ক্রিকেটারদের দীর্ঘদিনের একটা স্বপ্নপূরণ করেছে। অনেকদিন ধরেই তারা চাচ্ছিলেন নয়নাভিরাম এই স্টেডিয়াম হয়ে উঠুক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আয়োজক। সেই চাওয়াটা পূরণ হয়েছে। কিন্তু এখানেই আটকে থাকতে চাচ্ছে না সিলেট।
সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের প্রাণপুরুষ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক শফিউল ইসলাম চৌধুরী নাদেল বলছিলেন, তারা এখন সিলেট স্টেডিয়ামকে একটা পূর্ণাঙ্গ ক্রিকেট কমপ্লেক্সে পরিণত করতে চান। স্টেডিয়ামের পেছন দিকেতেই চলতে থাকা বিপুল গতির সংস্কার কাজের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বললেন, ‘আমরা সিলেটে একটা পূর্ণাঙ্গ ক্রিকেট কমপ্লেক্স গড়ে তুলতে চাচ্ছি। সে জন্য এখন আউটার স্টেডিয়ামের কাজ চলছে। এর বাইরে আমরা অ্যাকাডেমির কাজ শুরু করবো দ্রুত। আমাদের ইচ্ছা আছে মূল স্টেডিয়াম ও আউটার স্টেডিয়াম মিলিয়ে খেলোয়াড়দের অনুশীলনের জন্যই শুধু অন্তত ১৫টা উইকেট তৈরি করার।’
এই কমপ্লেক্সের চিন্তার বাইরে মূল স্টেডিয়ামেও কিছু সংস্কার ও উন্নয়ন পরিকল্পনা আছে এখানকার সংগঠকদের।
সিলেট স্টেডিয়ামের সবুজ গ্যালারি এরই মধ্যে দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা পাচ্ছে। কিন্তু এই গ্যালারির সিঁড়ির মতো ধাপগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট নন নাদেল। তিনি বলছিলেন, এগুলোর পরিবর্তন করতে চান, ‘বাইরের দেশে যেসব গ্রিন গ্যালারি আছে, সেগুলোতে দেখবেন একটা ঢালু জায়গা থাকে। যেখানে শুয়ে-বসে খেলা দেখা যায়। কিন্তু আমাদের এখানে এটা সিঁড়ির মতো আছে। আমরা এখানকার নকশাকারীর সঙ্গে আলাপ করেছি। খুব দ্রুতই আমরা এটাকে ঢালে পরিণত করে ফেলবো।’
এর বাইরে ঢালের পাশে কয়েকটা ‘কটেজ’ তৈরি করার পরিকল্পনা আছে স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষের। নাদেল ব্যাখ্যা করে বলছিলেন, এখানে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ঘরের মতো নকশায় কিছু কটেজ করা হবে। যেগুলোর সঙ্গে ছোট ছোট উঠোন থাকবে। ওই উঠোনে বা কটেজে বসে খেলা দেখার ব্যবস্থা থাকবে। এগুলোর হবে স্টেডিয়ামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আসন।
স্টেডিয়াম হলো, ক্রিকেট কমপ্লেক্স হবে; কিন্তু তারপরও সফিউল আলম চৌধুরী নাদেলদের স্বপ্ন থেমে থাকবে না। এই স্টেডিয়াম নয়, নাদেল স্বপ্ন দেখেন সিলেট জুড়ে অসংখ্য মাঠ তৈরি হবে। আগের মতো আবার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মনের আনন্দে ক্রিকেটে মেতে উঠবে। তবেই না ইতিহাসের মতো করেই ক্রিকেট প্রাণ ফিরে পাবে সিলেটে।
