হেমন্ত মানেই মিঠে রোদ। শিশির সিক্ত প্রকৃতি। ধানের গন্ধমাখা গাঁও-গ্রাম, মাঠ-ঘাট। ধান কাটার ব্যস্ততা সারা মাঠজুড়ে। হেমন্তের জন্য আকুলতাও কিছু কম নয়। ছুটে যাই, সোনারগাঁয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকা মেঘনা উপজেলার গ্রামে। নদী ঘেঁষা ফসলি জমিতে চোখে পড়ে কৃষকদের কর্ম-চাঞ্চল্য। কেউ কেউ আগাম বপন করা খিরাই বিক্রির উদ্দেশ্যে তুলতে সময় পার করছে। ফিরে তাকাই শৈশবে—ইঁদুরের গর্ত থেকে অভাবী নারীদের ধান সংগ্রহের দৃশ্য মনকে ব্যাকুল করেছে। পাশাপাশি শিশু-কিশোররা ছোটো-বড়ো গর্ত সেঁচে মাছ ধরছে। আবার বিল-ঝিলের পাশে শাখা নদীতে খরা জালেও বাইছে। দারুণ এক ভালোলাগা অনুভব করেছি!
খাল-বিল, পুকুর-জলাশয় শুকিয়ে যায় এই সময়। কৃষক যখন লাঙ্গল কাঁধে সারিবদ্ধভাবে গরু নিয়ে খেত-খামারে মেঠোপথে কখনো আলপথে রওয়ানা হয়, তখন চারপাশের বিশালতায় মন ভরে যায়। এই দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে আক্রান্ত না করে পারে না। ঋতুবৈচিত্র্যের এই পালাবদলের সৌন্দর্য অনন্য। এই ঋতু যেন অফুরন্ত রূপ-রসে বাংলার প্রকৃতিকে সাজায় নতুনত্বের আলপনায়।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘অঘ্রাণের সওগাত’ কবিতায় বলেছেন, ‘ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণীর সওগাত?/মাঠের সাগরে জোয়ারের পরে লেগেছে ভাটির টান।/রাখাল ছেলের বিদায়-বাঁশিতে ঝুরিছে আমন ধান’। হেমন্তে গ্রামবাসী থাকেন পাকা ফসল ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত। এ সময় বৃষ্টি কমই হয়। ফলে রবিশস্যের চাষাবাদের জন্য প্রকৃতি থাকে সদয়। আসন্ন শীতের টাটকা শাকসবজিতে ভরে যায় বাংলার মাঠ-ঘাট। নতুন আলু, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, লাউ, টমেটো, গাজর, শালগম, মূলা, লালশাক, পালংশাক প্রভৃতি আমাদের রসনাকে পরিতৃপ্ত করে তোলে। হেমন্তে সরিষা ফুলের শোভা প্রকৃতির শুষ্কতার মাঝেও এক অপরূপ উপহার।
সোনারগাঁয়ে এই সময় পাওয়া যায় খেজুরের রস। গাছিরা কলসি ভরে খেজুর রস বাজার-বন্দরে কাঁধে করে বিক্রি করে। হেমন্তে সেই রস দিয়ে কেউ কেউ তৈরি করে গুড়। খেজুর রস আর গুড়ের মিষ্টি গন্ধ মন মাতাল করে। খেজুর রসের পিঠা-পায়েস অসাধারণ। নতুন শাকসবজি ও নানা রকমের পিঠার সুবাসে ম ম করে গ্রামবাংলার পরিবেশ। পৌষ ও মাঘ—এ দুমাস শীতকাল হলেও এর শুরু কিছুটা আগেই এবং সমাপ্তিও ঘটে আরো কিছুটা পরে। হেমন্তে ফসল উঠে যাওয়ার পরে প্রকৃতিতে যে শূন্যতা, তার মাঝেই শীতের প্রভাবটা গাঢ় হয়। হেমন্ত ঋতুর পর উত্তুরে হিমেল বাতাস শীতকালের আগমনী বার্তা বয়ে আনে।
নগরে ইট-পাথরের চাপে গ্রামের মতো কুয়াশার স্নিগ্ধ জৌলুস নেই। নেই হেমন্তের উচ্ছ্বাস।
