রবিউল হুসাইন

আপনি আছেন স্যার

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০১৯, ২১:১৯

স.ম. শামসুল আলম

শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের একজন বোদ্ধা, ঋদ্ধ ও পুরোধা ব্যক্তিত্ব কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন গত ২৬ নভেম্বর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। আমরা যারা কাছে থেকে তাকে দেখেছি, জেনেছি—তারা এই মানুষটির ভালোবাসা, মহানুভবতা, পরোপকারিতার কথা কোনো দিন ভুলতে পারব না। রবিউল হুসাইন একাধারে ছিলেন কবি, স্থপতি, শিল্প-সমালোচক, গদ্যকার, ছড়াকার, স্থাপত্যবিষয়ক লেখক এবং দূরদর্শিতাসম্পন্ন একজন সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখালেখি করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গড়েছেন সতীর্থদের সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্যও কাজ করে গেছেন নিরন্তর। কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার একজন উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের সাহচর্যে এবং তার অবর্তমানেও। তিনি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসংরক্ষণ কেন্দ্রের ট্রাস্টি। জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যেমন—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিম ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট প্রভৃতি। ১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারি রবিউল হুসাইন ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার রতিডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। স্থপতি হওয়ার কারণেই তার সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আমি তাঁর কবিতার একজন পাঠক এ কথা জানিয়ে তার লেখা একটি কবিতা মুখস্থ শোনাই। কবিতাটি ছিল এ রকম—

একটি মানুষ হাঁটতে হাঁটতে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়, / তার শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্তের স্রোত বের হয় / কীভাবে মাধ্যাকর্ষণহীন হতে হয় সেই কৌশল বুঝতে। / একটি মানুষ সাঁতরাতে সাঁতরাতে পাতালে ডুবে যায়,/ তার দেহ থেকে বাতাসের বুদ্বুদ্ ফুটে শূন্যের ফুল হয় / পৃথিবীর গভীরে সেই কেন্দ্রবিন্দু খুঁজতে।

পুরো কবিতাটি মুখস্থ শুনে তিনি অবাক হন। আমি এটাও জানালাম, ১৯৭৯ সাল থেকে আমি তাঁর কবিতা পড়ি। সেই থেকে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুরু। তিনি বয়সে প্রায় ২২ বছরের বড়ো হওয়া সত্ত্ব্বেও আমার সঙ্গে এত সৌহাদ্যপূর্ণ ব্যবহার করতেন, যা আমার জীবনে এক পরম পাওয়া।

কচি-কাঁচা ভবন নির্মাণের সময় স্থপতি রবিউল হুসাইনের সঙ্গে আমার দহরম-মহরম বেড়ে গেলেও আমি তাকে সবসময় কবি হিসেবে সম্মান ও শ্রদ্ধা করেছি। সেটা তিনি বুঝতেন। গত বইমেলা ২০১৯-এ আমার কিশোরসমগ্র বইটি প্রকাশিত হয় যেটার উত্সর্গপত্রে লিখেছি—কবি রবিউল হুসাইন আপনি আমার হূদয় মন্দিরস্থপতি।

তার চলে যাওয়ায় আমার হূদয়মন্দির আজ ক্ষতবিক্ষত। কবি রবিউল হুসাইন এমনই একজন দিকনির্দেশক ছিলেন যেখানে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের মানুষ ছাড়া অন্য কিছু খুঁজে পাওয়া না। প্রধানমন্ত্রী তার শোকবার্তায় বলেছেন, ‘তার মৃত্যুতে দেশ ও জাতি একজন দেশপ্রেমিক ও বহুগুণে গুণান্বিত এক ব্যক্তিকে হারাল। রবিউল হুসাইন তার কাজের মধ্য দিয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’

আমরাও কবি রবিউল হুসাইনের সৃষ্টিশীল কাজ নিয়ে যেন গবেষণা করতে পারি, তার কাজকে মনেপ্রাণে লালন করতে পারি, ধারণ করতে পারি। তার উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—সুন্দরী ফণা, কোথায় আমার নভোযান, কেন্দ্রধ্বনিতে বেজে ওঠে, কী আছে এই অন্ধকারের গভীরে, আরো ঊনতিরিশটি চাঁদ, কর্পূরের ডানাঅলা বরফের পাখি, আমগ্ন কাটাকুটি খেলা, স্বপ্নের সাহসী মানুষেরা, যে নদী রাত্রির, এইসব নীল অপমান, কবিতাপুঞ্জ, নির্বাচিত কবিতা ইত্যাদি। উপন্যাস—বিষুবরেখা, গল্প—গল্পগাথা, স্থির বিন্দুর মোহন সংকট, কিশোর উপন্যাস—দুরন্ত কৈশোর, কুয়াশায় ঘরে ফেরা, দুর্দান্ত। এ ছাড়াও আছে—ছড়িয়ে দিলাম ছড়াগুলি, অপ্রয়োজনীয় প্রবন্ধ, বাংলাদেশের স্থাপত্য সংস্কৃতি প্রভৃতি।

রবিউল হুসাইন একুশে পদকে ভূষিত হন ২০১৮ সালে এবং বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান ২০০৯ সালে। তার সঙ্গে অফিসিয়াল কাজ করতে গিয়ে যেমন আনন্দ পেয়েছি, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সাংগঠনিক কাজ করতে গিয়েও তেমনই আনন্দ পেয়েছি। এত মজার মানুষ ছিলেন যে তাঁর রসিকতায় হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেছে। অপরদিকে, কাজের ক্ষেত্রে এত সিরিয়াস থাকতেন যে ভেবেই পেতাম না একই মানুষের মধ্যে সৃষ্টিশীল সত্তা ও কৌশলগত সত্তা থাকতে পারে।

আজ তার উদ্দেশে শুধু একটি কথাই বলব, আপনি আছেন স্যার, আপনি থাকবেন স্যার। আপনি যে কর্ম উপহার দিয়ে গেছেন এবং একটি স্বচ্ছ ও নির্মল পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন তার জন্য আপনাকে স্যালুট জানাই। যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন স্যার।

n লেখক : কবি, শিশুসাহিত্যিক ও শিশুসংগঠক