সাবেক এমপি কাদেরসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০১৯, ২২:৩৭

গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে গুলি করে হত্যার দায়ে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে নির্বাচিত সাবেক এমপি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ডা. আবদুল কাদের খানসহ সাত আসামির সবার ফাঁসির রায় দিয়েছে আদালত। গাইবান্ধা জেলা ও দায়রা জজ দিলীপ কুমার ভৌমিক গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে জনাকীর্ণ চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।

সর্বোচ্চ সাজার আদেশ পাওয়া অন্য আসামিরা হলেন :          মো. শামছুজ্জোহা (কাদের খানের একান্ত সহকারী), আবদুল হান্নান (কাদের খানের গাড়িচালক), মেহেদি হাসান, শাহীন মিয়া, আনোয়ারুল ইসলাম রানা ও চন্দন কুমার রায়। এদের মধ্যে চন্দন কুমার পলাতক রয়েছেন। এছাড়া বাকি ছয় আসামি রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়াতে উপস্থিত ছিলেন। মামলার সাক্ষী ও নিহতের স্বজনেরাও আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আদালতে হাজির করার সময় আসামিদের হাস্যোজ্জ্বল দেখা গেলেও রায় ঘোষণা শেষে তাদের বিমর্ষ দেখা গেছে।

মামলার অপর আসামি কসাই সুবল চন্দ্র রায় কারাগারে অসুস্থ হয়ে আগেই মারা গেছেন। আসামি চন্দনকে দ্রুত গ্রেফতার করে দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

আসামিদের পরিচয় সম্পর্কে জানা গেছে, আবদুল কাদেরের দূর সম্পর্কের ভাগনে ও তার বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক শাহীন মিয়া (২৫) সুন্দরগঞ্জ উপজেলার উত্তর সমস কবিরাজটারী গ্রামের ওসমান গনি ভুট্টুর ছেলে। কাজের লোক মেহেদী হাসান (২৬) একই গ্রামের আবদুল করিমের ছেলে। গাড়ির চালক আবদুল হান্নান (৩০) বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার কামারপাড়া আবদুর রহমান প্রামাণিকের ছেলে। আনোয়ারুল ইসলাম ওরফে রানা (২৯) সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভেলারায় কাজীর ভিটা গ্রামের তমশের আলীর ছেলে। তিনি ঢাকার একটি পোশাক তৈরির কারখানার শ্রমিক ছিলেন।

গতকাল বেলা ১১টা ২০ মিনিটের দিকে গাইবান্ধা জেলা কারাগার থেকে কঠোর নিরাপত্তায় আবদুল কাদের খানসহ ছয় জনকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। রায় ঘোষণা শেষে বেলা ১২টার দিকে আবারও তাদেরকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে আদালত থেকে জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে আদালতের পিপি শফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্ত শেষে কাদের খানসহ আট জনের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

২০১৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। ঐ বছরের ৮ এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত ২২ কার্যদিবসে বাদী, নিহতের স্ত্রী ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৫৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে আদালত। গত ৩১ অক্টোবর মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম শেষ হয়। পরে পর্যায়ক্রমে কারাগারে থাকা আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানি হয়।

শফিকুল ইসলাম বলেন, দ্রুত রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে এ রকম একটি জঘন্য ঘটনার কলঙ্কমুক্ত হতে চায় সুন্দরগঞ্জবাসী। তিনি বলেন, আসামি সাবেক এমপি জাতীয় পার্টির অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ডা. আবদুল কাদের খানকে একই ঘটনায় অস্ত্র মামলার একটি পৃথক রায়ে গত ১১ জুন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত। এছাড়া অস্ত্র মামলায় পৃথক এক ধারায় তাকে ১৫ বছর কারাদণ্ড দেয় একই আদালত।

লিটন হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত তিনটি অস্ত্রের মধ্যে একটি অস্ত্র কাদের খান নিজে সুন্দরগঞ্জ থানায় জমা দেন। একটি অস্ত্র ছয়টি গুলিসহ কাদের খানের স্বীকারোক্তি মোতাবেক তার নিজ বাড়ির উঠান থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। তবে অপর অস্ত্রটির সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।

আসামি কাদের খানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মঞ্জুর মোর্শেদ বাবু এই মামলার রায়ে অসন্তোষ ও হতাশ প্রকাশ করে বলেন, ন্যায়বিচারের আশা করা হয়েছিল, কিন্তু এই রায়ে তারা ন্যায়বিচার পাননি। তাই এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হবেন। 

আসামিপক্ষের অপর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ বলেন, ‘আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট নই। এমপি লিটনকে যেভাবে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছে, তেমনিভাবে আসামি কাদের খানকে এ মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। কেননা হত্যাকাণ্ডের সময় কাদের খান দেশের বাইরে ছিলেন। আগামী সাত দিনের মধ্যে এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।’

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে মামলার বাদী লিটনের বড়ো বোন ফাহমিদা কাকলী বুলবুল দ্রুত রায় কার্যকর করার দাবি জানান। নিহত এমপি লিটনের স্ত্রী ইসরাত জাহান স্মৃতিও রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে আশা করছেন, দ্রুত এই রায় কার্যকর হবে।

প্রসঙ্গত, দুর্বৃত্তদের গুলিতে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের সাহাবাজ গ্রামের পাড়ার নিজ বাড়ির বৈঠকখানায় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিত্সাধীন অবস্থায় সাড়ে ৭টার দিকে তিনি মারা যান। পরদিন এ ঘটনায় লিটনের বড়ো বোন ফাহমিদা কাকলী বাদী হয়ে অজ্ঞাত চার-পাঁচ জনকে আসামি করে সুন্দরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।