হূদ্ছন্দের পতন ও স্বাস্থ্য

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১৯, ২১:১১

প্রতিটি সুস্থ সবল দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শক্তিশালী, সুস্থিত,হূদ্স্পন্দন। একটি ভয়ানক স্বাস্থ্যবিপদ হলো অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন। হূিপণ্ডের ছন্দ তখন বিচ্যুত হয়। হূদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় গোলমাল হলে হূদযন্ত্রের ওপরের প্রকোষ্ট অলিন্দ দুটো কম্পিত হতে থাকে। তখন নিচের দুটো প্রকোষ্ঠ নিলয় দুটোর স্পন্দনে ঘটে অনিয়ম। অলিন্দের এই ছন্দপতন বড় বিপজ্জনক কারণ। এতে স্ট্রোক ও হূদিনষ্ক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে।

সতর্ক সংকেত :অসম নাড়ি স্পন্দন

অনেক লোকের মধ্যে অলিন্দে ছন্দচ্যুতি হলে অনেক সময় স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। যদি থাকে কখনো তাহলে এ ধরনের উপসর্গ হয়। যেমন—অসম নাড়ি স্পন্দন, দ্রুতবেগে ধাবিত হূদ্যন্ত্র, হূিপণ্ডে প্রবল ধুকধুকানি, হূদ্কম্পনের অনুভূতি, বুকব্যথা ইত্যাদি। স্বাভাবিক হূদ্ছন্দ ও হূদ্কম্পন স্বাভাবিকভাবে হূদ্যন্ত্রের সাইনাস নোড় থেকে শুরু হয় তড়িত্ সংকেত। সূত্রপাত ঘটে হূদ্স্পন্দনের। অ্যাভিনোড় রিলে করে সংকেত, তাই হূদ্যন্ত্রের চারটি প্রকোষ্টই রক্ত পাম্প করে যথাযথ ছন্দে। অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন হলে, অলিন্দের নানান এলাকা থেকে অস্বাভাবিক সংকেত নিক্ষিপ্ত হয়। এসব গোলমেলে বিশৃঙ্খল সংকেতগুলো দ্রুত কম্পন তোলে ওপরের প্রকোষ্ঠগুলোতে। খুব বেশি বেশি সংকেত ধাবিত হতে থাকে নিলয়ে। ফলাফল হতে পারে অনিয়মিত সংকোচন আর দ্রুত অনিয়মিত হূদ্স্পন্দন (প্রতি মিনিটে ১০০-১৭৫টি স্পন্দন)। স্বাভাবিক সীমা হলো প্রতি মিনিটে ৬০-১০০টি স্পন্দন। অনিয়মিত গোলমেলে হূদ্ছন্দ শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে আর হয় নানা উপসর্গ। যেমন- মাথা ঝিমঝিম করা, শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা ও ক্লান্তি, মূর্ছা যাওয়া ইত্যাদি।

কখন প্রয়োজন জরুরি চিকিত্সা

অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন সব সময় জরুরি বিপদ নয়। তবে নিচের সেসব উপসর্গ হলে জরুরি চিকিত্সা নিতে হবে। যেমন- গুরুতর বুক ব্যথা, অসম নাড়ি স্পন্দন এবং মূর্ছা যাওয়ার অনুভূতি, স্ট্রোকের লক্ষণ, যেমন- অবশভাব ও বাক শক্তিতে জড়তা।

কেন হয় অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন

যেসব পরিস্থিতি হূদ্যন্ত্রকে কঠোর চাপে ফেলে, এদের জন্যই এমন দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, করোনারি হূদেরাগ ও হার্ট অ্যাটাক, হূদিনষ্ক্রিয়া, হূত্কপাটিকা নিয়ে সমস্যা।

যে ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণযোগ্য

আমাদের জীবনযাপন ও অভ্যাস হতে পারে এ রোগের ঝুঁকি, যেমন- স্থূলতা, ফুসফুসের রোগ, কিছু প্রেসক্রিপশন ওষুধ যেমন-অ্যালবুটেরল, উদ্দীপক ওষুধ ও মাদক সেবন, অতিরিক্ত নিকোটিন ও ক্যাফিন ও প্রচুর মদ্যপান।

শুধুই অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন

কখনো কখনো অলিন্দ কম্পিত হতে থাকে, তেমন কোনো উদ্দীপক ছাড়াই। একে বলে নিংসঙ্গ অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন। ৬৫ বছর বয়সের নিচে লোকদের মধ্যে এটি বেশি হয়। হূদযন্ত্র নিজে নিজেই ফিরে আসে স্বাভাবিক নিজস্বছন্দে। দ্রুত হূত্স্পন্দন সমস্যা বেশি করলে চিকিত্সা প্রয়োজন হতে পারে। ৭৫ বছর ঊর্ধ্বে চিকিত্সার পরামর্শ দেন চিকিত্সকরা স্ট্রোক এড়াবার জন্য।

অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন নির্ণয়

একে নির্ণয়ের একটি নিশ্চিত পরীক্ষা হলো ইকেজি। এই বেদনাহীন টেস্ট রেকর্ড করে হূদ্যন্ত্রের তড়িত্ কর্ম এবং হূদ্ছন্দে অসংগ  তি চিহ্নিত করে এই পরীক্ষাই হলো ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম। অন্যান্য টেস্টগুলো হলো—কেজি যদি নির্দেশ করে অলিন্দে ছন্দচ্যুতি, তাহলে ডাক্তার আরো টেস্টের জন্য বলতে পারেন। হূদ্যন্ত্র সম্বন্ধে আরো জানার জন্য। একটি ইকোকার্ডিওগ্রাম বা আলট্রাসাউন্ড হার্টের যদি করা যায় তাহলে বোঝা যাবে কপাটিকার ক্ষতি বা হূদ্-নিষ্ক্রিয়ার কোনো নিদর্শন আছে কি না। স্ট্রিস টেস্ট করে বোঝা যাবে হূদ্যন্ত্র কত ভালো কাজ করছে। যেসব পরিস্থিতি এই সমস্যা উদ্দীপিত করেছে সেগুলো বোঝার জন্যও টেস্ট করা প্রয়োজন হতে পারে।

অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনের গতি প্রকৃতি

অলিন্দের স্পন্দনে অসংগতি, কম্পন এসব সূচনা হতে পারে আবার নিজে নিজে তা চলেও যেতে পারে। অনিয়মিত হূদ্ছন্দে থাকতে পারে কয়েক মুহূর্ত এমনকি কয়েক সপ্তাহ। তারপর চলে আসে স্বাভাবিক ছন্দে। কালক্রমে এই অসংগতি হতে পারে অটল। অর্থাত্ হূদ্ছন্দ হয়ে পড়ল অনিয়মিত। যদি এই অসংগতির কারণ হয় থাইরয়েড সমস্যা বা নিউমোনিয়া বা কোনো চিকিত্সাসাধ্য অসুখ তাহলে একে চিকিত্সা করলে অসংগতিও চলে যাবে।

চিকিত্সা : কার্ডিওভার্সন

নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ডাক্তার ইলেকট্রিক শক বা ওষুধ দিয়ে পুনঃস্থাপিত করতে পারেন হূদ্ছন্দ। এই পদ্ধতির নাম কার্ডিওভার্সন। তবে হূদ্ছন্দ্রে অনিয়ম ৪৮ ঘণ্টার বেশি চললে কার্ডিওভার্সন এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রয়োজন হতে পারে রক্ত পাতলা করার ওষুধ। সব কিছু সিদ্ধান্ত হবে ডাক্তারের বিবেচনায় ও তত্ত্বাবধানে।

চিকিত্সা :ওষুধ

উপসর্গ মৃদু হলে বা কার্ডওভার্সনের পর হূদছন্দে অসংগতি ফিরে এলে ডাক্তার দিতে পারেন ওষুধ। ছন্দ নিয়ন্ত্রক ওষুধ দিলে হূদ্ছন্দ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। গতি নিয়ন্ত্রক ওষুধ দিলে হূদযন্ত্রের দ্রুত ধাবনও মোকাবিলা করা সম্ভব। রক্ত জমাটবোধক ওষুধ ওয়ারফেরিন বা এসপিরিন দিয়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমোনো যায়।

চিকিত্সা :অপসারণ

উপসর্গ দূর করতে কার্ডিওভার্সন ও ওষুধ যথেষ্ট না হলে রেডিওফ্রিকুয়েন্সি অ্যাবলেশন হলো বিকল্প পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে রেডিও ফ্রিকুয়েন্সি এনার্জি ব্যবহার করে হূদ্যন্ত্রের যে টিসুটি অস্বাভাবিক তড়িত্ সংকেতের জন্য দায়ী একে নষ্ট করে দেয়া হয়। তবে চিকিত্সা বিবেচনা করবেন চিকিত্সক।

চিকিত্সা :পেসমেকার

পেসমেকার হলো ব্যাটারি-চালিত

ছোট্র যন্ত্র যা তড়িত্ সংকেত প্রেরণের মাধ্যমে হূদ্ঘাত হারকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেসব লোকের হূদ্ঘাত হার খুব ধীর এদের জন্য উপসর্গ, ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট উপশম  হয়। বুকে পেসমেকার

লাগালে সময় লাগে এক ঘণ্টা।

অনেকে এ সমস্যা আমল দেন না। কারো কারো সমস্যা হয়, যেমন ক্লান্তি, মূর্ছা যাওয়ার অনুভূতি, শ্বাসকষ্ট। চিকিত্সা লাগে। স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য ব্যবস্থা।  প্রতিরোধ করতে যা করতে হবে। স্বাস্থ্যকর অভ্যাস চর্চা, পুস্টিকর খাবার যাতে যেন থাকে মাছ, নিয়মিত ব্যায়াম, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান পরিহার ও নিয়মিত নাড়ির চাপ দেখা। সুতরাং লক্ষণীয় উপসর্গ দেখানোর আগেই অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন থেকে হতে পারে স্ট্রোক বা অন্যান্য সমস্যা। তাই মাসে একবার নাড়ি টিপে দেখুন। অসংগতি মনে হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

 nঅধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী

পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস

বারডেম, ঢাকা