আলোকপাত

এগিয়ে যাওয়ার মূলমন্ত্র

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৪৫

মানুষের ব্যক্তিজীবনে প্রভাব বিস্তার করে থাকা বিশেষ কিছু উপাদানের ভেতর উল্লেখযোগ্য হলো দায়িত্ববোধ। দায়িত্ব হলো ব্যক্তির ওপর প্রাকৃতিক উপায়ে নির্ধারিত করণীয় বিষয়, যা আপনাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব, পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য, ছাত্রের প্রতি শিক্ষকের দায়িত্ব, শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের কর্তব্য, কর্মীর প্রতি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীর কর্তব্য, সমাজের প্রতি ব্যক্তির দায়িত্ব—মোট কথা ব্যক্তি ও কর্মজীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে দায়িত্ব নামক অদৃশ্য এই বস্তুটির উপস্থিতি পাওয়া যায় না। দায়িত্ব নামক এই অদৃশ্য বস্তুটি জীবন চক্রের সঙ্গে পরিপূর্ণভাবে মিশ্রিত। একজন মানুষের ওপর আস্থা রাখা নির্ভর করে সে কতটা দায়িত্ববান, তার ওপর। দায়িত্ববান মানুষ সহজেই সবার আস্থা অর্জন করে থাকে ফলে সর্বস্তরে গৃহীত, সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়। ব্যক্তিজীবনে কে কতটা সুখী সেটা নির্ভর করে তার দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার ওপর।

মানুষ কর্মজীবনে কী পরিমাণ উন্নতি করবে সেটা তার দায়িত্বশীল কর্মের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। তবে আমাদের দেশে কর্মক্ষেত্রের শ্রেণি অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে বেশ তারতম্য লক্ষণীয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করে তারা নিজ দায়িত্বের প্রতি বেশি যত্নশীল হয়ে থাকে, কারণ এখানে একদিকে যেমন জবাবদিহিতা থাকে অন্যদিকে থাকে পদোন্নতি ও ছাঁটাইভীতি। অপরদিকে সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা না থাকা ও চাকরিচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম থাকায় দায়িত্ব পালনে যে যার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ অবহেলা করছে, সাধ্যানুযায়ী দিচ্ছে ফাঁকি। বাদ যাচ্ছে না চিকিত্সক, শিক্ষক, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, আমলা এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্মকর্তারাও। গত ১০ অক্টোবর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে এক শিশুর ভাঙা পা রেখে ভালো পায়ে প্লাস্টার করা হয়েছে। কারণ হিসেবে জানা গেছে জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকা চিকিত্সক না থাকায় ওয়ার্ড বয় ভুলবশত ভালো পায়ে প্লাস্টার করেছে। শুনতে খারাপ লাগলেও এ কথা সত্য যে বর্তমানে বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নিজ প্রতিষ্ঠানের ক্লাস বাদ দিয়ে প্রাইভেট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্লাস করাতে যাচ্ছেন বাড়তি ইনকামের জন্য।

স্বাধীনতার ৪৮ বছর পার হওয়ার পরও আমরা অন্যদের থেকে অনেক গুণ পিছিয়ে থাকার মূল কারণ হিসেবে সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনা না করে ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেশ তথা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায় গুরুত্বহীনতাকে দায়ী করব। দায়িত্ব হলো মানুষের জন্য এক ধরনের আমানত, সুযোগের স"্ব্যবহার করে দায়িত্বে অবহেলা করা কোনোভাবেই উচিত নয়।

দেশের উচ্চস্তরের শ্রেণি-পেশার মানুষেরা যদি এভাবে মুখোশ আবৃত হয়ে নিজ দায়িত্ব ভুলতে থাকে তাহলে এগিয়ে যাওয়ার যাত্রা স্রোতের বিপরীতে যেতে থাকবে যা কখনো কাম্য হতে পারে না। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা শুধু সরকারকে দায়ী করি এবং সরকারের সমালোচনা করি। কিন্তু দেশটা যে শুধু সরকারের নয়, আমার আপনার সবার এবং সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা এগিয়ে যেতে পারি সেটা কেউ ভাবি না।

দায়িত্বজ্ঞানহীন ও নীতি বিসর্জিত ব্যক্তিরা কখনোই বড়ো কিছু করতে পারেনি। আপনার দয়িত্বজ্ঞান আপনার পরবর্তী অনুসারীদেরও আরো সমৃদ্ধ করবে। আপনাকে নিয়ে যাবে অনন্য এক উচ্চতায়। যদি প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রত্যেকেই নৈতিকতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা হয়, তাহলে ব্যক্তি উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে দেশের উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে। সুতরাং দেশ এগিয়ে যাওয়ার এই যাত্রায় অংশ নিতে হবে সবাইকে, হতে হবে দায়িত্বপরায়ণ।

n লেখক :প্রকৌশলী