শুদ্ধি অভিযানের প্রভাব পড়বে চার নেতা নির্বাচনে

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১৯, ২২:০৪

ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সম্মেলন আজ। বেলা ১১টায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিকালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে কাউন্সিল অধিবেশনে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র মহানগরের কান্ডারি কারা হবেন সেই আলোচনা এখন সর্বত্র।

চলতি মাসেই আওয়ামী লীগের চারটি সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সম্মেলন হয়েছে। তাতে চলমান শুদ্ধি অভিযানের বড়ো প্রভাব দেখা গেছে। ক্যাসিনোসহ নানা কারণে বিতর্কিতরা নতুন কমিটির নেতৃত্ব পাননি। অনেকে সম্মেলনেই আমন্ত্রণ পাননি। জানা গেছে, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সম্মেলনেও শুদ্ধি অভিযানের প্রভাব থাকবে। জানা গেছে, আওয়ামী রাজনীতির রাজপথের হূিপণ্ড বলে খ্যাত ঢাকা মহানগরের বর্তমান শীর্ষ নেতাদের ওপর মহাবিরক্ত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ইতিমধ্যে কৃষকলীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগের সম্মেলন শেষ হয়েছে। সব সংগঠনেই এসেছে নতুন নেতৃত্ব। এরই ধারাবাহিকতায় মহানগর রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বেও আসছে নতুন নতুন মুখ—এমন আভাস দিয়েছেন দলটির হাইকমান্ড। জানা গেছে, নতুন নেতৃত্বে কারা আসবেন এর একটি খসড়া তালিকা প্রস্তুত করেছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। কাউন্সিলের মাধ্যমে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির, ত্যাগী, ক্লিন ইমেজ যাচাই-বাচাই করে একটি সুন্দর ও চ্যালেঞ্জিং কমিটি উপহার দেবেন তিনি। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন মাধ্যমে সম্ভাব্য সবার আমলনামা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেছেন। যাদের নামে কমিটি বাণিজ্য এবং দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে, এমনকি পদ পাওয়ার পর যারা নিস্ক্রিয় থেকেছেন তারাও বাদ পড়বেন মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে। এরই মধ্যে এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলটির দুই প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক ও লে. কর্নেল (অব.) মুহম্মদ ফারুক খানকে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছেন। এদিকে নির্বাচনে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দেওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা ও বঞ্চনার শিকার নেতারা মাঠে নেমেছেন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের কাছে যোগ্যতা প্রমাণে দুই সপ্তাহ ধরে ছুটেছেন তারা। ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা আশা করছেন আওয়ামী লীগের চলমান শুদ্ধি অভিযানের আলোকে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের শীর্ষ পদে বসালে সংগঠন আরো চাঙ্গা হবে। এতে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের পোড়খাওয়া নেতাকর্মীরা আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন।

ঢাকা মহানগরের উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি একে এম রহমতউল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, দক্ষিণের সভাপতি আবুল হাসনাত, সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ। তারা আবারো স্ব স্ব পদপ্রত্যাশী। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উত্তর ও দক্ষিণের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে বেশ কয়েকজনের আমলনামা দলীয় সভানেত্রীর কাছে জমা পড়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকা মহানগরে শীর্ষ দুই পদ পেতে পারেন চাঁদপুর-২ (মতলব উত্তর-মতলব দক্ষিণ) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন রুহুল, মহানগরের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য কাজী নজিবুল্লাহ হিরু, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, ডিএসসিসির ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ওমর বিন আজিজ ওরফে তামিম আজিজ, সহসভাপতি হুমায়ুন কবির, আওলাদ হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীলিপ কুমার রায়, সাংগঠনিক সম্পাদক মোর্শেদ কামাল, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক প্রফেসর ডা. নজরুল ইসলাম, বিএম সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ। এছাড়া সাবেক মন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামও শীর্ষ পদের জন্য আলোচনায় আছেন। জানা গেছে, দক্ষিণে সভাপতি পদে একজন আদি ঢাকাইয়া খুঁজছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

এদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নতুন নেতৃত্বে আসার ক্ষেত্রে আলোচনায় রয়েছেন সংগঠনের বর্তমান সহসভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সহসভাপতি শেখ বজলুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবীব হাসান, এম এ কাদের খান, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান, এস এম মান্নান কচি, এম সাইফুল্লা সাইফুলসহ অনেকেই। এছাড়া নতুন নেতৃত্ব উঠে আসতে পারে ঢাকা মহানগরের আওতাধীন যে কোনো থানা শাখা থেকেও। এক্ষেত্রে ক্লিন ইমেজের নেতা হিসেবে দারুস সালাম থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ফরিদুল হক হ্যাপী মহানগরের শীর্ষ পদ পেতে পারেন।

দলের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, মহানগরের কমিটির ঘোষণার পর উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন থানা ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া শুরু করে মহানগরের শীর্ষ নেতারা। এছাড়া সম্প্রতি ক্যাসিনো বাণিজ্য, বিএনপি-জামায়াত দলীয় পরিবার থেকে কমিটিতে স্থান দেওয়াসহ সরকারি ও সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন কমিটির কয়েকজন নেতা। যা নিয়ে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের কাছে অভিযোগ যায়। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বিভিন্ন বর্ধিত ও আলোচনা সভায় এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে মহানগর নেতাদের সতর্ক করেন। কিন্তু কোন অদৃশ্য কারণে মহানগরের শীর্ষ নেতারা কর্ণপাত করেননি। এমনকি থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেন। কয়েকটি থানায় কমিটি গঠন করার উদ্যোগ নিলেও সেখানে বিএনপি-জামায়াত ও ফ্রিডম পার্টির লোকদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ ওঠে দলের ভিতরে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছেও দ্বারস্থ হন বর্তমান কমিটির কয়েকজন নেতা।

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের দীর্ঘদিন পরও কমিটি দিতে না পারায় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাককে দক্ষিণ এবং লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খানকে উত্তরের কমিটি সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে সম্মেলনের সাড়ে তিন বছরের মাথায় ২০১৬ সালে ১০ এপ্রিল প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মহানগর উত্তরে এ কে এম রহমত উল্লাহকে সভাপতি ও সাদেক খানকে সাধারণ সম্পাদক এবং দক্ষিণে আবুল হাসনাতকে সভাপতি ও মো. শাহে আলম মুরাদকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকার দুই অংশে কমিটি দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ভেঙে মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ নামে দুটি কমিটি হয়। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরের ৪৯টি থানা ও ১০৩টি ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নামও ঘোষণা করা হয়। আজ মহানগরের শীর্ষ চার নেতার নাম ঘোষণা করা হবে। পরে থানা-ওয়ার্ডের সম্মেলন।