শান্তিতে বসবাস করছে সাধারণ মানুষ

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:০০

প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে তত্কালীন শান্তি বাহিনী রক্তের হোলি খেলায় মেতে ছিল। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি হলে অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনার অবসান ঘটে। আগামীকাল সোমবার সেই শান্তি চুক্তির ২২ বছর পূর্তি হচ্ছে। শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে তত্কালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে শান্তি বাহিনীর শীর্ষ গেরিলা নেতা সন্তু লারমা তার বিপুলসংখ্যক সহযোগীদের নিয়ে অস্ত্র সমর্পণের মধ্য দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। সরকার তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ প্রদান করে। বর্তমান পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ শান্তিতে বসবাস করছে। তবে চারটি সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে চলছে অস্ত্রের মহড়া। চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এই চার গ্রুপ নিজেদের মধ্যে খুন-খারাবি করছে।

শান্তি চুক্তির পর কেটে গেছে ২২টি বছর। একের পর এক চুক্তির বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে পাহাড় জুড়ে। সরকারের দাবি চুক্তির অধিকাংশ ধারাই এরই মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। অবশিষ্ট কিছু ধারা বাস্তবায়নাধীন। তবে জেএসএসের এ শান্তি চুক্তি সম্পাদনের বিরোধিতায় রয়েছে সংগঠনটির বিবদমান একটি গ্রুপ। পরবর্তীতে যারা ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট) নামে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করে। শান্তি চুক্তির পর জেএসএসের সামরিক উইং শান্তি বাহিনী বিলুপ্ত ঘোষিত হয়েছে। এ উইংয়ের সদস্যদের অনেককে সরকার নানাভাবে পুনর্বাসিত করেছে। এর পাশাপাশি পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য গত ২১ বছরে যে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে নানা স্থাপনা প্রতিষ্ঠা হয়েছে তা অভাবনীয় হলেও জেএসএসবিরোধী গ্রুপের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ অব্যাহত রেখেছে। যে কারণে গত দুই দশকে চার গ্রুপ নিজেদের সংঘর্ষে জড়িয়ে এ পর্যন্ত ৭ শতাধিক নেতাকর্মী ও তাদের সমর্থক প্রাণ হারিয়েছে। অন্তর্কোন্দলে জড়িয়ে থাকা এসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। পাহাড়ি বাঙালিরা যদি একটা কলার ছড়া বাজারে বিক্রি করতে যায়, তাহলে চাঁদা দিতে হয়। মূলত এই চার সশস্ত্র গ্রুপকে নির্ধারিত হারে চাঁদা দেওয়া ছাড়া কোনো পাহাড়ি ও বাঙালির রক্ষা নেই। প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকা এ চারটি গ্রুপ পার্বত্য অঞ্চলে যার যার নির্ধারিত এলাকা থেকে তুলছে। অন্তর্কোন্দলে জড়িয়ে থাকা এ চারটি গ্রুপের চাঁদা ছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে কোনো ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।

চুক্তির পর পার্বত্য অঞ্চলে একে একে কয়েকটি সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ (প্রসিত) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ লেগেই আছে। তাদের কাছে পাহাড়ি বাঙালিরা জিম্মি। তারা বলেন, আমাদের মধ্যে কোনো ধরনের সমস্যা নেই। আমরা একে অপরের ভাই। অশান্তি সৃষ্টির মূলে চারটি সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে। এ চারটি গ্রুপ থেকে রক্ষার জন্য সাধারণ পাহাড়ি বাঙালিরা সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। তাদের দাবি, চারটি গ্রুপের মধ্যে যতদিন সশস্ত্র সংঘর্ষের অবসান না হবে ততদিন পাহাড়ে শান্তি আসবে না। তাই তাদের নির্মূলের দাবি জানান তারা।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগামীকাল তিন পার্বত্য জেলায় ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২১ বছর পূর্তি পালনের ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সম্পাদনকে দল ও সরকারের জন্য বড়ো সাফল্য—এ বিবেচনায় তিন পার্বত্য জেলায় আওয়ামী লীগও নানা কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। শান্তি চুক্তির অন্যতম ফসল প্রতিষ্ঠিত পার্বত্য জেলা পরিষদ দিনব্যাপী আনন্দ উল্লাসের পাশাপাশি বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং তিন পার্বত্য জেলায় সেনাবাহিনীর উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

পার্বত্য শান্তি চুক্তির শর্তানুযায়ী ১৯৯৮ সালের ৬ মে প্রতিষ্ঠা করা হয় স্থানীয় সরকার পরিষদ। আইন সংশোধনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম আইন সংসদে পাশ হয়। গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এরপর গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ। এরপর একে একে চলে আসছে উন্নয়নের এক মহাযজ্ঞ। যার প্রেক্ষাপটে গত ২১ বছরে চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন এবং নয়টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলায় হস্তান্তরযোগ্য ৩৩টি বিষয়ের মধ্যে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি, খাগড়াছড়িতে ৩০টি এবং বান্দরবান জেলা পরিষদে ২৮টি বিষয় হস্তান্তর করা হয়েছে। চুক্তির পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে পাহাড়ের মানুষ অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়েছে।

স্বাধীনতার আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে ছিল ৪১ কিলোমিটার সড়ক। যা বর্তমানে ১ হাজার ৫৩৫ কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। পাশাপাশি তিনটি স্থলবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনাও নিয়েছে সরকার। এসবের পাশাপাশি টেলিযোগাযোগের ব্যাপক উন্নয়নের ফলে বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি ১২০টি এনজিও কাজ করছে সামগ্রিক উন্নয়নে। এসবের পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর উদ্যোগে বিপুলসংখ্যক উন্নয়ন পরিকল্পনা এরই মধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। যা পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সকলের জন্য বড়ো ধরনের সুফল বয়ে এনেছে।

ইত্তেফাক/জেডএইচ