রকেটে চড়ে ভিনদেশে

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:১৪

আমার জন্মস্থান আদি ঢাকার বাদামতলি। রকেট স্টিমার ঘাট থেকে বাড়ির দূরত্ব ছিল মাত্র ১ মিনিটের হাঁটার পথ। স্টিমারের হুইসেলের আওয়াজ ছিল নিত্যসঙ্গী। দুরন্তপনার কৈশোর ও তরুণ বয়সের অনেকটা সময়ই কেটেছে রকেট স্টিমার গাজী, টার্ন, লেপচা, মাসুদ, অস্ট্রিচ, কাজল, শহীদ বেলায়েত নামক জাহাজের ছাদে, বারান্দা আর কেবিনে আড্ডা দিয়ে। বর্ষার সময় বাল্যবন্ধু আতিক, স্বপন, বিপ্লবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দিনে কতবার যে স্টিমারের ছাদ হতে পানিতে লাফিয়ে পড়েছি তার কোনো ইয়াত্তা নেই, আর আমিনুল ইসলামের পাগলামির বর্ণনা লিখে শেষ করার নয়। সে অন্ধকার রাতেও ভরা বর্ষায় প্রচণ্ড স্রোতের মধ্যে বীরত্ব দেখাতে নদীতে ঝাঁপ দিতো। আজ সবই স্মৃতি।

ঘাটে যখন জাহাজ ভিড়ত কিংবা ছেড়ে যেত তখন কত রঙের মানুষের দেখা মিলতো। জাহাজে আড্ডা দেওয়ার সুবাদে প্রায় সব স্টাফদের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে এলাকার বড় ভাই ছাবের, তার কর্তৃত্ব এখনও আছে স্টিমার ঘাটে। সে কারণে বাড়তি সুযোগ ছিল জমপেশ আড্ডা দেওয়ার। আজ আর আড্ডা দেওয়া হয় না, তবে ছোটবেলা থেকেই মনের ভেতর শখ ছিল জাহাজে ভ্রমণের। কিন্তু সময় সুযোগের অভাবে হয়ে ওঠেনি। তবে রকেট স্টিমারে ভ্রমণের শখ প্রতিনিয়ত ছিল। অবশেষে চলে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিশেষ কারণে ২ দিনের জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। ঠিক তার আগের দিন অস্ট্রিচ জাহাজের প্রধান ইঞ্চিন কর্মকর্তা লোকমান হোসেন আমার বিজসেন ফার্মে এসে হাজির। কথা প্রসঙ্গে ভদ্রলোক অফার করে ফেললেন আগামীকাল বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে বাদামতলি থেকে জাহাজ ছাড়বে, চলুন ঘুরে আসবেন। মোক্ষম সময়ে উপযুক্ত প্রস্তাব হাতছাড়া করতে ইচ্ছে করল না। রাত্রের মধ্যেই দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের একজনকে সঙ্গী করে নিলাম। পরের দিন সে যথাসময়ে এসে হাজির, আমিও সন্ধা ৬টা ৩০ মিনিটের মধ্যে সদরঘাট টার্মিনাল হতে অস্ট্রিচ নামক জাহাজে চড়লাম। শৈশবের বহু স্মৃতি এই জাহাজকে ঘিরে। ফাস্ট ক্লাস এসি কেবিন আমাদের জন্য বুকিং করা হয়েছে। কেবিনের ডেকোরেশন বেশ চমত্কার। জাহাজ ছাড়ল ৬টা ৪০ মিনিটে। নির্ধারিত সময় থেকে ১০ মিনিট লেট, পরে জানতে পারলাম ১০ মিনিট দেরিতে ছাড়ার কারণের মহানায়ক আমি। খানিকটা অপরাধী মনে হয়েছে নিজেকে। সময় জ্ঞান সম্পর্কে সবারই সচেতন হওয়া জরুরি। একদা স্বচ্ছ টলটলে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি পঁচে বাতাসে উত্কট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কিছুটা সময় চলার পর ধলেশ্বরী নদীতে জাহাজ যেতেই  নির্মল বাতাসের ছোঁয়া পেলাম। যে বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে রাজধানী গড়ে উঠেছিল, নবাবরা নদীর তীরে তাদের প্রাসাদ গড়ে তুলেছিলেন। আর আজ কি-না সেই বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌ-ভ্রমণের সময় নাক চেপে ধরতে হয়। সত্যিই দুর্ভাগা জাতি আমরা, সচেতনতার অভাবে নদী পরিণত হয়েছে ড্রেনে। লোকমান সাহেব নাস্তার এন্তেজাম করলেন। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর ফিস কাকলেট। রকেট স্টিমার হুইসেল ছেড়ে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে চাঁদপুর ঘাটের দিকে। আমি  পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই। মনে পড়ে শৈশবে ডুব সাতারে অংশ নেওয়া অনেক বন্ধুদের কথা। রাত্রের ডিনার শেষে ইঞ্চিন কর্মকর্তার কেবিনে গিয়ে বসলাম। বিভিন্ন আলাপচারিতার মধ্যে আমরা আমাদের ভ্রমণ সূচি ঠিক করে নিলাম। প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত ছিল অস্ট্রিচ জাহাজেই যাব, আবার এই জাহাজেই ফিরব। কিন্তু বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ও হযরত খানজাহান আলী (র.) মাজার সঙ্গে যাওয়া বন্ধুর জিয়ারত করা হয়নি তাই সিদ্ধান্ত পাল্টালাম। উড়োজাহাজ থেকে লক্ষগুণ আরামদায়ক নৌ জাহাজে একটা ফ্রেশ ঘুম দিয়ে পরের দিন সকাল ১০টায় হুলার হাট নেমে পড়লাম। তবে ভ্রমণপিপাসুদের উদ্দেশ্যে একটি কথা না লিখলেই নয়। কাউখালী বন্দরে জাহাজ ভেড়ার পূর্বে গাবখাঁন চ্যানেল যখন জাহাজ ক্রস করে তখন যেকোনো নিরস ব্যক্তিও দু-পাশের প্রকৃতি দেখে বেশ উত্ফুল্ল হবে। মনে হবে অবারিত সবুজের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছে কোনো এক ভূ-স্বর্গের পানে।

 

হুলার হাট নেমে তিন চাকা বাহনে পিরোজপুর শহরে। উদ্দেশ্য নদী মার্তৃক শহর পিরোজপুর কিছুটা সময় ঘুরবো। কিন্তু বাঁধ সাধে রাজনৈতিক কর্মসূচি। নতুন এলাকায় পুলিশি ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাই মানিকের শরণাপণ্ন হলাম। উনি একজন ডিবি পুলিশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নির্বিঘ্নে ঘুরতে বললেন। ধন্যবাদ তার সহযোগিতার হাত প্রসারিত করার জন্য। পিরোজপুরের ডাব আর ঘোল পান করে দুপুর পৌনে একটার দিকে মটরবাইকে ছুটলাম ঐতিহাসিক শহর বাগেরহাটের দিকে। সুনসান নীরবতায় ভর দুপুরে পিচঢালা পথে গাছের ছায়া সঙ্গী করে মটরবাইক ছুটে চলছে। হঠাত্ চোখে পড়ল রসের হাঁড়ি। জিজ্ঞেস করতেই হাঁড়িওয়ালা বললেন, রস। ব্যস, রসওয়ালা বেটা আর যায় কোথায়! এক এক করে সাবাড় করে দিলাম কয়েক গ্লাস। এ যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টি। রস পান শেষে বাইক আবারো ছুটল। ঘণ্টাখানেকে মধ্যেই বাগেরহাট এসে হাজির। দুপুরের খাবার হলো এক হতাশাগ্রস্থ  ব্যক্তির রেস্টুরেন্টে। সে প্রসঙ্গে আর না যাই। তবে কপাল ভালো মালিকের হতাশার কালো মেঘ বাবুর্চির ওপর ভর করেনি। খেয়ে চলে গেলাম হযরত খানজাহান আলী (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে। জহুরের নামাজ শেষে জিয়ারত করা হলো। দিঘির পুরোনো কুমির কালাপাহাড় মারা গেছে কয়েক বছর হলো। নতুন করে অবমুক্ত করা হয়েছে হিংস্র কুমির। অন্তত সাবধান বাণী দেখে তাই মনে হলো। মানুষের আনাগোনা কম থাকায় টাউট বাটপারদের উপস্থিতি তেমন নেই। আমি যখন আগে এখানে এসেছিলাম তখন আমার সঙ্গে ছিল দে-ছুটের প্রথম সক্রিয় সদস্য বন্ধু মোক্তার। আজ সে এই নশ্বর পৃথিবীতে নেই। তাই মনটা কিছুটা সময়ের জন্য বিষণ্ন হয়ে উঠেছিল। এরপর গেলাম ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদে। অল্প দূরত্বের, তাই কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। মসজিদটি পুরোনো আদল ঠিক রেখেই সংস্কার করা হয়েছে। মসজিদটির পিলার আছে ষাটটি। গম্বুজ আছে ৮১টি। দেয়ালের পলেস্তারের পুরুত্ব দুই পাশে ৮ ফুট ৬ ইঞ্চি। হযরত খানজাহান আলী (র.) মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আনুমানিক ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে। গুম্বুজ ৮১টি হলেও ৬০টি পিলারের কারণে মসজিদটি ষাট গুম্বুজ মসজিদ নামেই সর্বাধিক পরিচিত। মসজিদের পাশেই রয়েছে জাদুঘর ও বিশাল দিঘি। জাদুঘরে রয়েছে কুমির কালাপাহাড়ের মমিসহ প্রত্নতাত্ত্বিক যুগের অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। যা কি-না ভ্রমণপিপাসুদের জ্ঞান ভাণ্ডারের ঝুলি আরো সমৃদ্ধ করে। হাতে এখনও অনেক সময়, সিদ্ধান্ত পাল্টালাম। বরিশাল গিয়ে আর স্টিমার ধরবো না। খুলনা হয়ে ট্রেনে ঢাকা চলে যাব। বাইকের চালককে ভালো লেগে গেল, তাই ওকে নিয়েই খুলনার পথে। এরইমধ্যে খুলনা শহরের পূর্ব পরিচিত তরুণ আকাশকে রেল স্টেশনে টিকেটের জন্য পাঠালাম। রাত ৮টা ২০ মিনিটে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ফাস্ট ক্লাস এসি চেয়ারের টিকেট বুক করা হলো। আমরা গিয়ে টিকেট তুলে নিলাম। মাস্টার জানিয়ে দিলেন রাত ১০টায় ট্রেন ছাড়বে। বাইকের ভাড়া মিটিয়ে আমরা আকাশকে নিয়ে খুলনা শহরের এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ালাম। এক সময় ৮টা ২০ মিনিটের ট্রেন রাত ১টা ১০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়লো। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ সিটি বাস সার্ভিসের ড্রাইভার-হেলপারদেরও হার মানালো।

 

যাতায়াত

হাতে ২ দিনের সময় নিয়ে বাদামতলি অথবা সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে রকেট স্টিমারে হুলার হাট অথবা মোড়লগঞ্জ যেতে হবে। এরপর বাইক কিংবা বাসে খুলনা হয়ে ট্রেনে ঢাকা। ডেকে গেলে তেমন হবে না, তবে কেবিন চাইলে খরচের লাগাম তখন আপনার হাতে। শুক্রবার রকেট সার্ভিস বন্ধ থাকে। বিস্তারিত জানতে হলে তাদের ওয়েব সাইটে বা গুগলে রকেট স্টিমার লিখে সার্চ দিলেই আপডেট তথ্য মিলবে।

 

ছবি:মিরাফ, মারুফ ও সংগৃহীত