বৈশ্বিক কূটনীতির পাদপ্রদীপ এখন চীন

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:০৮

স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর বিশ্ব রাজনীতিতে চীনকে কেন্দ্রীয় শক্তি বললে কি খুব বেশিই বাড়াবাড়ি হবে? সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে অন্তত নয়। নানা বিচারে সম্ভাব্য সেরা ভেবেই তারা চীনা উত্থানের গমনপথ অনুসরণ করে আসছেন। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, সেগুলো কী কী? উত্তর হলো—অর্থনীতির আকার, বিনিয়োগের পাল্লা ও বিস্তৃতি এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক; উপরন্তু সামরিক বাহিনীর বাজেট ও সামর্থ্য। ২০১৯ সালের এ সময়ে এসে কম প্রশংসিত অথচ বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ এক পরিমাপে খোদ যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে দিয়েছে চীন। কূটনৈতিক নেটওয়ার্কের আকারের প্রশ্নে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র এখন এক নম্বরে, আর এর মধ্যে অনেক কিছুই আঁচ করতে পারছেন প্রখ্যাত বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকেরা।

বেশ কয়েক দশকজুড়ে ওয়াশিংটনেরই ছিল বিশ্বের সর্ববৃহত্ কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা সোভিয়েত ইউনিয়ন এ ব্যাপারে তাদের ধারে কাছেও ছিল না। সে কৃতিত্ব কেড়ে নিল চীন। দূতাবাস, কনস্যুলেট ও আন্তর্জাতিক স্থায়ী সংগঠনসমূহে স্থায়ী মিশনসহ তাদের সর্বমোট কূটনৈতিক পদের সংখ্যা এখন ২৭৬। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক পদের সংখ্যা কমে গিয়ে হয়েছে ২৭৩। পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় এই পরিবর্তন চিহ্নিত হতে পারে টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে। তার মানে বেইজিয়ের বৈশ্বিক শক্তি বিস্তারের ইচ্ছেটা ক্রমবিস্তৃত হচ্ছে। এখন আর লুকোনোর উপায় নেই যে, সাবেক নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের ওই নির্দেশনা তারা আর মানছে না, ‘শক্তি লুকিয়ে রাখো, সময় পার করো’। সক্রিয় ও দূরদৃষ্টির কূটনীতিতে বিনিয়োগ করছে পর্যাপ্তই। কিন্তু ওয়াশিংটন এ দুটোতেই বাঁক দেখছে নিচের দিকে এবং বাধ্য হয়েই অন্যান্য সাধনার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। দীর্ঘদিন বৈশ্বিক কূটনীতির শ্রেষ্ঠত্ব উপভোগ করা যুক্তরাষ্ট্র এখন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের মুখোমুখি। নতুন সহস্রাব্দ শুরুর আগেও হয়তো তাদের কল্পনাতে ছিল না যে, অন্তত আসছে শতকে এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

   চীনের শীর্ষ স্থানে আরোহণের ঘটনাটা ঘটেছে খুব দ্রুতগতিতে। লোয়ি ইনস্টিটিউটের তৈরি বৈশ্বিক কূটনীতি সূচক একটি দেশের বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক নেটওয়ার্কের অবস্থান বলে দেয়। ২০১১ সালে ওয়াশিংটনের চেয়ে ২৩ পদ সংখ্যায় পিছিয়ে ছিল বেইজিং। ২০১৬ সাল নাগাদ ব্যবধান নামিয়ে আনে আটে এবং সে সুবাদে উঠে আসে তিন নম্বরে। তখন পর্যন্ত প্রথম দুটি স্থান যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের। কিন্তু পরের বছরেই ফ্রান্স তার দ্বিতীয় স্থানটি খুইয়ে বসে চীনের কাছে। ক্রমোন্নতি বহাল থাকায় চলতি বছরের সূচক বলে দিচ্ছে অন্য ৬০টি প্রধান কূটনৈতিক নেটওয়ার্কের সবকটিই তাদের পেছনে। গেল দুই বছরে পাঁচটি নতুন দূতাবাস চালু করেছে চীন।

স্থানগুলো হলো—  বারকিনা ফাসো, ডোমিনিকান রিপাবলিক, গাম্বিয়া, সাও টোমে ও প্রিন্সিপে। এক্ষেত্রে দেশগুলোর নাম ক্রমান্বয়ে উল্লেখ করা হয়নি। সাধারণত ‘চেকবুক ডিপ্লোম্যাসি’ খ্যাত অটল অভিযান অনুসরণ করে বেইজিং তাইওয়ানের শেষ কূটনৈতিক সঙ্গীদের বেশ কয়েকটিকে পর্যন্ত বানিয়ে ফেলেছে নিজের সহযাত্রী। অতি সম্প্রতি তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্যাসিফিক আইল্যান্ডস অঞ্চলের কিরিবাতি ও সলোমন দ্বীপপুঞ্জ তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক বন্ধন ছিন্ন করে তরি ভিড়িয়েছে চৈনিক ঘাটে। ২০১৬ সালেও তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশের সংখ্যা ছিল যেখানে ২২, এখন তা নেমে এসেছে ১৫-তে (এর মধ্যে রয়েছে গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস ও ভ্যাটিকান সিটি)। এ কৌশলে একদিকে যেমন তাইওয়ানের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা আরো বাড়ছে, অন্যদিকে চীন তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য বৃদ্ধি করছে। তার মানে, তারা মারছে এক ঢিলে দুই পাখি।

 চীন সম্পর্কে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে বিষয়টি, তারা শুধু কূটনৈতিক নেটওয়ার্কেও বিস্তারের উপরই জোর দিচ্ছে না, গভীরতাকেও আমলে নিচ্ছে আন্তরিকতার সঙ্গে। দূতাবাসের সংখ্যার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যখন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে, তখন দ্বিতীয় দেশটি কনস্যুলেট বা বাণিজ্য দূতাবাসের সংখ্যায় প্রথম দেশটির চেয়ে বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেছে। চীনের (৯৬) চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট সংখ্যা আটটি কম। দূতাবাস যেখানে রাজনৈতিক শক্তির প্রতিফলন ঘটায়, সে জায়গায় কনস্যুলেট তুলে ধরে অর্থনৈতিক শক্তি। প্রথাগত কূটনীতির বদলে অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নিতেই নিজেদের দৃষ্টিকে কেন্দ্রীভূত করেছে কনস্যুলেটের ওপর। চীনের ৯৬টি কনস্যুলেটের ৪১টি এশিয়ায় আর ইউরোপে ২৮টি। এর পাশাপাশি তারা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলয় ও রাস্তা তৈরির উদ্যোগকে। চীনের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগকে আরো সহজতর করার জন্য রাস্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের পেছনেই খরচ করে যাচ্ছে কয়েক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

      ২০১৭ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উপস্থিতি নাজুক হয়ে রয়েছে। ক্রেমলিনের সঙ্গে বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে ২০১৮ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গের কনস্যুলেট জেনারেলের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া এবং এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নতুন কোনো কনস্যুলেট না খোলায় কূটনৈতিক পদের সংখ্যা ২৭৩-এ নেমে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের মেয়াদ শেষ হতে থাকলেও এ মুহূর্তে তাদের মোট কূটনৈতিক পদের ৭৩ শতাংশ পূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজে ৩৪২টি দূতাবাস ও কনস্যুলেটের ঠিকানা। কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক সূচকে অন্তর্ভুক্ত ৬১টি দেশেরই দূতাবাস বা কনস্যুলেট রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। পক্ষান্তরে চীনে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস কনস্যুলেটের সংখ্যা ২৫৬। এদিক থেকে আবার যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে।