ব্যাংকগুলো যে ব্যবস্থা নিতে পারে

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১২

এম এ খালেক

একটি দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকিং সেক্টর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির অধিকাংশ সূচকই ইতিবাচক ধারায় প্রবাহমান থাকলেও ব্যাংকিং সেক্টর সেই ধারার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। বিশেষ করে পর্বতপ্রমাণ ঋণের ভারে ব্যাংকিং সেক্টর জর্জরিত হয়ে পড়েছে। এই দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো আশু সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। গত মার্চ কোয়ার্টারে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে প্রদর্শিত বা দৃশ্যমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। এর সঙ্গে অবলোপনকৃত এবং মামলাধীন প্রকল্পসমূহের নিকট পাওনার পরিমাণ যোগ করলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। উল্লিখিত খেলাপি ঋণের মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়যোগ্য। অবশিষ্ট ঋণাঙ্ক ব্যাংক চাইলেও আদায় করতে পারবে না।

সংশ্লিষ্ট মহল অনেক দিন ধরেই ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণ নিয়ে আলোচনা করছেন। বিশেষ করে কীভাবে বিস্তর খেলাপি ঋণের দায়ভার থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে সেটাই আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কি করলে ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হবে না সে ইস্যুটি তেমন একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। অথচ ভবিষ্যতে ব্যাংকিং সেক্টরকে সুষ্ঠু ধারায় প্রবাহমান রাখতে হলে খেলাপি ঋণ সৃষ্টির পথগুলো কীভাবে বন্ধ করা যায় তা খুঁজে বের করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাঁধের উজানে কেউ পানি ঘোলা করলে সেই পানিই ভাটিতে প্রবাহিত হবে। কাজেই ভাটিতে স্বচ্ছ পানি পেতে হলে বাঁধের উজানে কেউ যাতে পানি ঘোলা করতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। ঠিক তেমনি সৃষ্ট খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং সেক্টরকে কলুষিত করবেই। কাজেই কোনোভাবেই যাতে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হতে না পারে সে ব্যাপারে পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সৃষ্ট খেলাপি ঋণ আদায়ের পাশাপাশি নতুন করে যাতে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ঋণখেলাপি অ্যাকাউন্টধারিগণ দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। একটি শ্রেণি আছেন যারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নানা প্রতিকূলতার কারণে গৃহীত ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে পারেন না। এরাই প্রকৃত ঋণখেলাপি। আর্থিক প্রণোদনা দান অথবা অন্য কোনোভাবে তাদের সামর্থ্যবান করে তোলা গেলে তারা আবারও ঋণের কিস্তি পরিশোধে সচেষ্ট হবেন। কিন্তু আর এক শ্রেণির ঋণ গ্রহীতা আছেন যারা সামর্থ্য থাকা সত্তেও ইচ্ছে করেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন না। এরা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। এরাই সবচেয়ে ভয়ংকর। তারা বিপুল ক্ষমতার অধিকারীও বটে। ঋণখেলাপিদের জন্য যে সব আইনি সুবিধা প্রদান করা হয় তার বেশির ভাগই ভোগ করেন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা। দেশের বিদ্যমান সমাজব্যবস্থায় আর্থিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকলে কারো পক্ষে ঋণখেলাপি হওয়া সাধারণত সম্ভব হয় না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কোনো ধরনের ছাড় দিলে কোনোভাবেই ব্যাংকিং সেক্টরকে খেলাপি ঋণমুক্ত করা যাবে না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি কার্যক্রমকে ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ হিসেবে ঘোষণা করে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। একজন ঋণ প্রত্যাশী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন কোনো ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করেন তখন তার আচার-আচরণ বিশ্লেষণ করলেই অনুধাবন করা যায় ভবিষ্যতে তিনি ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করবেন কি না। একই সঙ্গে ব্যাংক ম্যানেজার যদি সর্বোচ্চ সততা, কঠোরতা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে প্রচলিত আইনের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে ব্যাংকের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে খেলাপি ঋণ সৃষ্টির সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে।

সামান্য কয়েকটি খাত ব্যতীত প্রায় সব ক্ষেত্রেই ঋণ প্রাপ্তির একটি বড়ো শর্ত হচ্ছে ঋণের ঝুঁকি কভার করে এমন সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে বন্ধক প্রদান করা। যদি ব্যাংক ম্যানেজার সঠিকভাবে বন্ধকীকৃত সম্পদের মূল্যায়ন করতে পারেন তাহলে পরবর্তীতে সেই ঋণ হিসাব খেলাপি হবার আশঙ্কা অনেকাংশেই কমে যায়। কিন্তু বন্ধকীযোগ্য সম্পদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা রয়েছে। অনেক সময় ব্যাংক ম্যানেজার উদ্দেশ্যমূলকভাবে বন্ধকীযোগ্য সম্পদের অতি মূল্যায়ন করে দেখান। ব্যাংক ম্যানেজারের নেতৃত্বে শাখার দুই বা তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিনে বন্ধকীযোগ্য সম্পদ মূল্যায়ন করে থাকেন। মূল্যায়নকালে ব্যাংক ম্যানেজারের ইচ্ছানুযায়ী প্রকল্প সম্পদ মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। কোনো বন্ধকীযোগ্য সম্পদ মূল্যায়নকালে ম্যানেজার তার সহকর্মীদের নিয়ে অকুস্থলে উপস্থিত হন। তার পর উপস্থিত আশেপাশের লোকজনের নিকট বন্ধকীযোগ্য সম্পদের মূল্য কেমন হতে পার তা জিগ্যেস করেন। তাদের মতামতের ভিত্তিতে বন্ধকীযোগ্য সম্পদের মূল্যায়ন করে থাকেন। অনেক সময় ঋণ আবেদনকারী তার নিজেদের লোকজনকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত রাখেন। তারা বন্ধকীযোগ্য সম্পদের মূল্য বাড়িয়ে বলেন।

শুধু বন্ধকী নির্ভর ঋণ দিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা ভালো করা যাবে না। বন্ধকীযোগ্য সম্পদের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভ্যালুয়েশন টিমে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়া যারা ভ্যালুয়েশনের কাজে যুক্ত থাকবেন তাদের টার্মস অব রেফারেন্স নির্ধারণ করা যেতে পারে। ভ্যালুয়েশনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভুল করলে কি শাস্তি পেতে হবে তাও বলে দেওয়া যেতে পারে। যে কোনো ঋণ আবেদনপত্র বিবেচনার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত চরিত্র, সামাজিক অবস্থান, অতীত আর্থিক কার্যক্রম ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া প্রয়োজন। শুধু বন্ধক দিতে পারলেই তাকে ঋণ প্রদান করা উচিত নয়।

n লেখক :অর্থনীতি বিষয়ক কলাম লেখক