স্বাস্থ্য খাতে আউটসোর্সিংয়ের নামে কর্মীদের অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটছে। কর্মী নিয়োগের নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জনপ্রতি ১ থেকে ২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এরপর আবার বেতনের বড়ো একটি অংশ চলে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের পকেটে। কোনো কর্মীর বেতন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা ধার্য হলেও তাকে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। বাকি টাকা যাচ্ছে ঠিকাদারদের পকেটে। এর ওপর আছে ছাঁটাই আতঙ্ক। অভিজ্ঞতা অর্জন হতে না হতেই ছয় মাস পরপর কর্মীদের ছাঁটাই করে নতুন কর্মী নিয়োগ দেন ঠিকাদাররা। আবার মানসম্পন্ন কর্মী নিয়োগ না দেওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে উন্নয়ন কার্যক্রমও। যা ক্যাসিনো কাণ্ডের চেয়েও ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সরকারি হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে ক্লিনারসহ চতুর্থ শ্রেণিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকেই এটি হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির অন্যতম উত্স। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির একদল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে কোটি কোটি টাকার এ বাণিজ্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিএমএসডি, স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, নার্সিং অধিদপ্তর ছাড়াও প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, স্বাস্থ্য বিভাগীয় অফিস, সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ সব স্বাস্থ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রয়েছে এ সিন্ডিকেটের পদচারণা। সব কিছু চলে তাদের নিয়ন্ত্রণে।
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক সরকারের সময়ের একটি আদেশ বাতিল হওয়ায়। ঐ আদেশের কারণেই চতুর্থ শ্রেণির অনেক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এতে অধিদপ্তর, হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে জনবল ঘাটতির কারণে কাজে স্থবিরতা দেখা দেয়। এ সমস্যা সমাধানেই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ শুরু করে কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে আউটসোর্সিং বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সেবা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগ দেওয়া হয় ঠিকাদারের মাধ্যমে। নিয়োগপ্রাপ্তদের যে বেতন দেওয়ার কথা তার তিন ভাগের দুই ভাগ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার নিয়ে যান। অন্যদিকে চাকরি দেওয়ার নামে নিয়োগ প্রার্থীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় লাখ টাকা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, অনেক প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১৫০-২০০ লোকও নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে লাভবান হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আর এ কাজে সহযোগিতা করেন যে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হবে সেখানকার বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী। এসব নিয়োগের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় সিন্ডিকেট। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৫-৬ মাস পরপর নিয়োগকৃত ব্যক্তি পরিবর্তন করে। প্রতিবাদ করলেই ছাঁটাইয়ের হুমকি দেওয়া হয়। ফলে প্রতিবাদ করার সাহস পান না নিয়োগপ্রাপ্তরা। সম্প্রতি নরসিংদীর একটি হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোক নিয়োগ নিয়ে উল্লিখিত কাণ্ড ঘটেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, ঘটনাটি সত্য। এ নিয়ে অনেক ঝামেলায় আছি। সরাসরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে লোক নিয়োগ দিলে এ সমস্যা সমাধান হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লোক নিলে জঙ্গিরা এসব স্থানে আশ্রয় পেতে পারে।
ইতিপূর্বে আগারগাঁও নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ নিয়োগকৃত আউট সোর্সিং কর্মচারীদের বেতন সরাসরি তাদের নামে ব্যাংকে পাঠিয়ে দেন। এ কারণে সেখানে ঠিকাদার কোন অবস্থাতেই কর্মচারীদের বেতনের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারে না। অনুরূপ শেখ হাসিনা বার্ণ এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ একই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোক নিয়োগ হওয়ায় উচ্চ শিক্ষিত তরুণরা চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কারণ সরকারিভাবে নিয়োগ হলে তারা এসব পদগুলোতে আবেদন করতেন এবং পরবর্তীতে পদোন্নতি পেতেন।
