গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নির্বাচনে হেরে যাওয়াটাকে উদার মনে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি বাংলাদেশে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর প্রধান কারণ, রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শের জায়গায় চরম ও নজিরবিহীন বিভাজন— যা বিশ্বের অন্য একটি দেশেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধু মৌলিক আদর্শের বিভাজন বললে কম বলা হয়। দীর্ঘ সংগ্রাম, রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৩০ লাখ মানুষের জীবন বিসর্জন ও সমগ্র জাতির নজিরবিহীন ঐক্যবদ্ধতার মাধ্যমে রচিত ও গৃহীত রাষ্ট্রের আদর্শকে ১৯৭৫ সালের পরে আবির্ভূত এক রাজনৈতিক পক্ষ একাত্তরের পরাজিত গোষ্ঠীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে শুধু অস্বীকার করা নয়, সম্পূর্ণ ফেলে দিয়ে পরিত্যক্ত পাকিস্তানি মতাদর্শে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের চিন্তাশীল কোনো মানুষ এটা শুনলে বিশ্বাস করতে চান না। বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং বলেন এটা কী করে সম্ভব। এই বিভাজনটি সৃষ্টি করেছেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান। পঁচাত্তরের রক্তক্ষরণের পথ ধরে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, দর্শন, চেতনা-সংবলিত সব কিছু তিনি বাতিল ও ছুড়ে ফেলে দেন এবং একাত্তরের গণহত্যাকারী যুদ্ধাপরাধী জামায়াতসহ সকল পাকিস্তানি পন্থার দল ও রাজনীতিকে বাংলাদেশে শুধু ফিরিয়ে আনলেন তা নয়, সামরিক ক্ষমতা ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে সেটিকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শকে ঘিরে রাজনীতি বিভক্ত হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বিপক্ষ হিসেবে। এই দুই আদর্শের প্রেক্ষাপট ও বৈশিষ্ট্যগত জায়গাটি এমন যে, এক রাষ্ট্রের ভেতরে এই দুই আদর্শের সহঅবস্থান কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, আর তা হলো, বিশ্বের রাজনৈতিক ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধের সাংঘাতিক ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শকে আবার হটিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিত্যক্ত আদর্শকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করা নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক পন্থায় সম্ভব নয়। সে জন্যেই আমরা দেখেছি জামায়াত-বিএনপি সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতাকে ব্যবহার করে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সব সিনিয়র নেতাকে এক সঙ্গে হত্যা করার জন্য ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড আক্রমণ চালায়। এ ছাড়া আরও ১৯ বার শেখ হাসিনাকে হত্যা করার চেষ্টা হয়। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে দেখা গেছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবী এবং মেধাবী ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদের ওপর আক্রমণ হয়েছে। তার মধ্যে অনেককে হত্যাও করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ এবং মেধাবী রাজনীতিক শাহ এএমএস কিবরিয়ার নাম উল্লেখ করা যায়। নিয়মতান্ত্রিক সুস্থ রাজনীতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে পরাজিত করা যাবে না জেনেই ২০০১-২০০৬ মেয়াদে জামায়াত-বিএনপি এক সঙ্গে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে শেষ করে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে সশস্ত্র আক্রমণ চালায় এবং জঙ্গি সন্ত্রাসীদের উসকে দেয়। কিন্তু এত ত্যাগ, এত রক্ত এবং সত্তর-একাত্তরে ঐক্যবদ্ধ জাতির সমগ্র মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে জন্ম নেওয়া আদর্শ ও চেতনার অনিঃশেষ দুর্দমনীয় সহজাত শক্তির মধ্যে সেই পৌরাণিক কাহিনির ফিনিক্স পাখির মতো শক্তি রয়েছে। আগুনের ভস্ম থেকে আবার জ্বলে ওঠে। সেটাই ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় আছে গত দশ বছর ধরে। এই পক্ষের চরম শত্রুও বলতে পারবে না যে, এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের ওপর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বা হুমায়ুন আজাদ ও শাহ কিবরিয়ার হত্যাকাণ্ডের মতো কোনো একটি ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও কৌশলের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি রাজনীতির প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছে। তাদের একটা নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক আছে ঠিকই, কিন্তু দেশের বৃহত্তর মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ভীষণভাবে হ্রাস পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের বড় দল বিএনপি শুরু থেকেই জানতো এবং এখনো বোঝে, তাদের পাকিস্তানপন্থি রাজনীতি তরুণ প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই তারা আসল কথাটি বলে না, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের নামকে ব্যবহার করে বলে আসছে তারাও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা আর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তাই জন্মের ৪৩ বছরের মাথায় এসে বিএনপির ছদ্মবেশী চেহারাটি তরুণ প্রজন্মের কাছে একেবারে নগ্নভাবে ধরা পড়ে গেছে। বিএনপির কফিনের ওপর শেষ পেরেকটি মেরে দিয়েছেন তাদের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেছেন, জামায়াতের মধ্যেও মুক্তিযোদ্ধা আছে। অথচ এই জামায়াতি নেতারাই ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপির সঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে বলেছে, বাংলাদেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। এ হেন জামায়াতকে বিএনপি মুক্তিযোদ্ধার সনদ দিচ্ছে! গত দশ বছরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যে অর্জন ও অগ্রগতি এবং দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা যত ওপরে উঠেছে, তাতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষ জামায়াত-বিএনপি নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গন থেকে। বিএনপি-জামায়াত এর পূর্বে দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় ছিল। কী অর্জন, সাফল্য ও সম্বল নিয়ে তারা আজ মানুষের কাছে ভোট চাইবে। গত দশ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তুলনা করলে বিএনপি তার ধারে কাছেও থাকবে না। তথ্য-উপাত্তহীন, উদাহরণহীন ঢালাও বক্তব্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রদান ব্যতিরেকে তারা নিজেদের কোনো বড় অর্জনের কথা বলতে পারবে না। তাই বিএনপি নেতৃত্বহীন অবস্থায় ক্যাপ্টেনহীন জাহাজের মতো দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক করছে এবং তাদের জাহাজে থাকা যাত্রীদের মনোবল ধরে রাখার জন্য মুখে যা আসছে তাই বলছে। কী আর করা, যাকে ক্যাপ্টেন হিসেবে ভাড়া করেছেন, সেই ড. কামাল হোসেন নিজেও দিশেহারা, অস্থির ও অসুস্থ মানুষের মতো আচরণ করছেন। দেশি-বিদেশি চাপের কারণে নির্বাচন বর্জন করতে পারছে না বিএনপি। তাই নির্বাচনে জিততে পারবে না জেনেও অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে, যা তাদের স্বভাবের সঙ্গে যায় না। জগাখিচুড়ির ঐক্য, জামায়াতকে ধানের শীষ প্রদান এবং অস্থির সব আচরণ দেখে মনে হয় বিএনপি বুঝতে পেরেছে নির্বাচনের মাধ্যমে শেষ রক্ষা হবে না। তাই তাদের পাকিস্তানি মতাদর্শের রাজনীতিকে বাংলাদেশে টিকিয়ে রাখার জন্য বহু রকম কৌশল ও পন্থার মাধ্যমে নির্বাচনকে বানচাল, আর নয়ত নিদেনপক্ষে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করবে— এমনটাই আশঙ্কা করা হচ্ছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল থেকে।
গত ১৩ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক হাডসন ইনস্টিটিউটের একটি আলোচনা সভায় মার্কিন কংগ্রেসের একজন প্রভাবশালী সদস্য বলেছেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে ঘিরে জামায়াত তার ক্যাডার বাহিনী নিয়ে বড় ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটাতে পারে। ওয়াশিংটনের ওই আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য জামায়াতই সবচাইতে বড় হুমকি। জামায়াত এবার বিএনপির সঙ্গে একাকার হয়ে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করায় আশঙ্কা আরও বেড়ে গেছে। আলোচনা অনুষ্ঠানের কিছু দিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উঠেছে এবং তাতে বলা হয়েছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত মিলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে রকম ভয়ঙ্কর সহিংস আক্রমণ ও জ্বালাও-পোড়াও চালিয়েছিল, এবার নির্বাচনকে বানচাল করার জন্য একই রকম সহিংস ঘটনা ঘটাতে পারে জামায়াত-শিবির এবং উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠী। কয়েকদিন আগে আসাম টাইমস্ পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহুমুখী অপতত্পরতায় লিপ্ত। প্রায় মাসখানেক আগে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায়ও একই রকম খবর বেরিয়েছিল। আইএসআই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জঙ্গি তত্পরতার সঙ্গে জড়িত, যার কারণে ২০১৪-২০১৫ সালে ঢাকাস্থ পাকিস্তানি দূতাবাসের দুইজন কর্মকর্তা বহিষ্কার হয়ে পাকিস্তানে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এ হেন আইএসআইয়ের এক কর্মকর্তা মেহমুদের সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য টেলিফোনে নির্বাচনের জন্য সহায়তা প্রার্থনা করেছেন। সেই টেলিফোন কথোপকথন ফাঁস হয়ে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় সবাই তা জেনে ফেলেছে। একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যাকারী, ধর্ষণকারী পাকিস্তানের মতো একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের কাছে বিএনপির পক্ষ থেকে যখন সহায়তা চাওয়া হয়, তখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে তার অর্থ বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। বানচাল করতে না পারলে তাদের বিকল্প প্রোজেক্ট, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্যে পরিকল্পনাসহকারে বিএনপি কাজ করছে সেই সময় থেকে, যখন বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলো। তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার সম্পর্কে যে রকম অগ্রহণযোগ্য ভাষায় কথা বলেছে, তা কিছুতেই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক নয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেই তাদের এত ক্ষোভ, তা তো সকলেই বুঝতে পারছে। যারা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করল, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের বিএনপি বিশ্বাস করতে পারে না। তারা সবাইকে একই দাঁড়িপাল্লায় মাপার অভ্যাসবশত তাদের নিয়োগকৃত বিচারপতি আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশনের লেভেল লাগানোর অপচেষ্টা করছে বর্তমান কমিশনের ওপর। বিচারপতি আজিজ বিএনপিকে নির্বাচনে জয়ী করার জন্য সোয়া কোটি ভুয়া ভোটার তৈরি করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে। গাজীপুরের সিটি নির্বাচনের সময় নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটা রিহার্সেল বিএনপি করেছিল। তাদের এক পাতি নেতা স্পাই ঘড়ির মাধ্যমে স্থানীয় কিছু বিএনপি নেতা-কর্মীকে নির্দেশ দেয় তারা যেন নৌকা প্রতীক গায়ে লাগিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে ভোট কেন্দ্রে ঢুকে ধানের শীষের পক্ষে ভোট কেটে দেয় এবং তার জন্যে সব দোষ গিয়ে যেন পড়ে আওয়ামী লীগের ওপর। শোনা যাচ্ছে, এবার জাতীয় নির্বাচনে গাজীপুরে রিহার্সেল দেওয়া প্রোজেক্ট নিয়ে সারা দেশে তারা মাঠে নামবে।
n লেখক: রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
