গুহাবাসীরা এঁকেছিল শরীর
দেবতারা খুঁজল পাথর...
কোনো অভিব্যক্তির শৈল্পিক সৌন্দর্যকে আর্ট বলা যায়। শৈল্পিক সৌন্দর্য উপস্থাপনে শিল্পী যেভাবে অন্তরের মূর্ছনায় কায়া-কান্তিময় করে তুলতে পারেন—তার শিল্পপ্রয়াসের অনুভূতি ও অনুতৃপ্তি ততটুকুই সুসিদ্ধ ও পরিব্যাপ্ত হয়ে উঠবে। আসলে উপস্থাপন নির্ভর করে শিল্পীর চৈতন্যবোধ, যাপিতজগেক শিল্পকৌশলের মাধ্যমে বিনির্মাণের সমগ্রতার ওপর। এ কারণে অনেকে শিল্প জীবন ও জগতের প্রতিরূপ বলতে চেয়েছেন। তবে ললিতকলা বা চারুশিল্পের ভাষায় শিল্প হলো সৃজন বা সৃষ্টিশীল। সঙ্গতকারণে বলতে হবে, জীবন ও জগত্ হলো শুধুমাত্র শিল্পীর অনুপ্রেরণা। শিল্পী জীবন ও জগেক আঁকেন এবং তাঁর ভাষায় থাকে বিশেষ অনুরণন ও অভিব্যক্তির মূর্ছনা। জগত্ যেভাবে আছে যেভাবে থাকে; তার সৌন্দর্যে মানুষ পরাভূত ও অমলিন কিন্তু মানুষ তার সৃষ্টিদাগ ও সৃষ্টিকে নিয়ে গেছেন একযুগ থেকে অন্যযুগে, রহস্য ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। তাই দেবতা নয়, মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায় তার শিল্পে তার পরিবর্তনে।
পাবলো রুইজ ই পিকাসো ১৮৮১ সালের ২৫ অক্টোবর স্পেনের মালাগা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিকাসোর বাবার নাম হোসে রুইজ ব্লাসকো এবং মায়ের নাম মারিয়া পিকাসো লোপেজ। পাবলো মায়ের নামের অংশ ‘পিকাসো’-কে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর অবাক ও বিস্ময়ের ব্যাপার, তিনি মাত্র দশ বছর বয়সে শিল্পকর্মের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। এ বয়সে তিনি স্প্যানিশ ফ্রান্সিসকো ডি জোয়ারবেরন, ফ্রান্সিসকো গয়া, জোয়ান গ্রিস, জোয়ান মিরো, সালভাদর দালি’র মতো খ্যাতিমান শিল্পীদের নামের পাশে নিজের নাম স্থান করে নেন। তাঁর মতো এত অল্প বয়সে সে সময় ইউরোপে শিল্পকর্মের জন্য বিখ্যাত হওয়ার দৃষ্টান্ত অতি বিরল। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনা শহরে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। তবে পাবলো পিকাসোর চিত্রকর্ম শুরু থেকে মধ্যযুগীয় চার্চের চিন্তাজগত্ ও ধর্মানুরাগের বাইরে বেশ ভালো করেই মুক্তচিন্তার আবহে প্রস্ফুটিত হয়। তাঁর চিত্রকর্ম গির্জানুরাগ ও দেবদেবীর সদৃশমণ্ডিত পিউরিটান কল্পজগেক অতিক্রম করে মানুষের দিকে গেছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইউরোপে মধ্যযুগীয় চিন্তাচেতনা থেকে বেরিয়ে আসার আন্দোলন শুরু হয় মূলত ষোড়শ শতাব্দীতে। এসময় থেকে মানুষ তার ভাবনায় গেঁথে ফেলে—‘প্রতিভা কোনো দৈবলব্ধ দান নয়’। এ পরিবর্তনকে ইউরোপীয় রেনেসাঁস বলা হয়। ইউরোপীয় এ রেনেসাঁসে Sir Thomas More-এর ‘Utopia’ এবং Bacon-এর ‘Novum Organum’-এর প্রভাবের কথা উল্লেখ করা যায়। ইউরোপীয় রেনেসাঁসের আলোড়ন মানুষের মুক্তবুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ও পরিবর্তনের সূচনা করে। এ পরিবর্তন মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থনীতি, শিল্প, সাহিত্য, সাংস্কৃতির সকল পরিমণ্ডলে প্রবাহিত ও ব্যাপৃত হতে থাকে। এ কারণে বলা যায়, রেনেসাঁস সূচনার (১৫১৬—১৫৭৮) প্রায় সাড়ে তিনশো বছর পরে চারু ও কারুকলা শিল্পীর ঘরে (পিকাসোর বাবা ছিলেন মালাগার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের চিত্র ঙ্কনের শিক্ষক এবং স্থানীয় জাদুঘরের কিউরেটর) জন্ম নেওয়া এক অকালপক্ক ছবি আঁকিয়ে একসময় ‘lineament of satisfied desire’-এ রূপ নেবে—সেটিই স্বাভাবিক। আমরা জানি, অভাব্যকে শিল্পী যেমন তাঁর তুলির আঁচড়ে কাঙ্ক্ষিত করে তুলতে পারেন তেমনি ভাব্যকে যুক্তিগ্রাহের বাইরে টেনে তাকে রূপান্তর বা ‘convulsive energy’-তে ব্যক্ত করার শক্তি শিল্পীকেই অর্জন করতে হয়। পাবলো পিকাসো সেই শক্তি অর্জন করেছিলেন তাঁর শিল্পকর্মের বিবিধ বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে। আমরা এখন পিকাসোর শিল্পকর্ম ‘গোয়ের্নিকা’ নিয়ে আলোচনা করব।
আমরা দেখি, সমাজে যুগেযুগে ক্ষীণস্বার্থে মানুষ সভ্যতা ও মানবতার ওপর যুদ্ধ, নৈরাজ্য, বর্বরতা, অশান্তি, সংকট ইত্যাদি চাপিয়ে দিয়েছে। সকল যুগেই এসবের বিরুদ্ধে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীগণ তাঁদের কলম ও তুলির শাণিত শক্তিকে হুঙ্কার ও বিপ্লবের প্রতিরূপে রূপান্তর করেছেন। আর ‘গোয়ের্নিকা’র পিকাসো ও পিকাসোর ‘গোয়ের্নিকা’-তে রয়েছে যুদ্ধ ও অশান্তির বিরুদ্ধে ‘বলীবর্দের হুঙ্কার’। গোয়ের্নিকা স্পেনের একটি শহর। ১৯৩৭ সালে স্পেনে গৃহযুদ্ধ চলছিল। ২৬ এপ্রিল জার্মান নািস ও ফ্যাসিবাদের সহযোগিতা ও গৃহযুদ্ধ গোয়ের্নিকা শহরটি ধ্বংস করে দেয়। বোমাবর্ষণে শতশত মানুষ ও প্রাণী নিহত হয়। পিকাসো এ যুদ্ধের পৈশাচিকতা ও নৃশংসতায় ক্ষুব্ধ ও বেদনার্ত হয়ে সেটি ‘গোয়ের্নিকা’য় রূপ দিতে অনুপ্রাণিত হন। গোয়ের্নিকার ধ্বংসস্তূপ থেকে দুঃখ ও যন্ত্রণার কালো ও ধূসর রঙ উঠে আসে। পিকাসোর ১৩৭.৪ বাই ৩০৫.৫ ইঞ্চি আকারের এ চিত্রকর্মে অনেকগুলো প্রতীকী ব্যঞ্জনা রয়েছে। চিত্রে আহত ঘোড়া, ভাঙা তলোয়ার, সৈনিকের কর্তিত বাহু, একগুচ্ছ ফুলের ছবি রয়েছে। যা একদিকে যেমন বীরোচিত পরাজয়কে স্মরণ করিয়ে দেয় তেমনি ধ্বংসের বিরুদ্ধে রয়েছে শান্তির আহ্বান ও নতুন প্রাণের জাগরণের ইঙ্গিত। আবার চিত্রে প্রশস্ত চোখবিশিষ্ট অদ্ভুত ষাঁড়, জ্বলন্ত বাল্ব, মৃত শিশু ও মহিলার ছবি—যা একদিকে যেমন অবিবেচক দানব ও শয়তানের উপস্থিতিকে স্মরণ করিয়ে দেয় তেমনি অসহায়, নিরুপায় ও অসমকক্ষ মানবিকতার ওপর তাদের পৈশাচিকতার প্রতীকায়ন করে। রেনেসাঁর যুগ অতিক্রান্ত হওয়ার এ চিত্রায়ণভঙ্গিটি পিকাসোর বৈপ্লবিক দৃঢ়তাকে প্রমাণ করেছে।
তবে আমরা যদি পিকাসোর ‘গোয়ের্নিকা’র কথা বলি, তাহলে এ চিত্রটি শুধু যুদ্ধের অমানবিকতার বিরুদ্ধে সমন্বিত ঘৃণা, ক্ষোভ, বিদ্রোহ ও প্রতিবাদকেই তুলে ধরে না—বরং মানুষের বর্বর ধ্বংলীলার বিরুদ্ধে একটি সর্বকালীন বিপ্লবীয় নিশানা ও প্রবাহকে জাগ্রত করে। ‘গোয়ের্নিকা’ শিল্পকলার মধ্যযুগীয় গির্জা সিসটিন মিমেসিস ও রেনেসাঁসের ‘পরিপ্রেক্ষিত নাটকীয়তা’ ভাঙার একটি নবনির্মিতির ‘কনটেম্পরার’। ‘গোয়ের্নিকা’র শক্তি মানবতার এমন এক বিবর্তন যা হাজার বছরের শিল্পকৃতির ‘প্রিমি লুমি’-কে অতিক্রমণের বিস্ময়াবহ রূপের প্রমাণ বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে। এ শিল্পকর্মটি যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিবাদ, বিরুদ্ধতা ও বিক্ষোভের প্রতিমূর্তিকে প্রকাশ করে। বিশ্ববাসীর কাছে শুধু যুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই নয়—চিত্রকর্মটি যুগে যুগে মানুষকে ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’—বাক্যটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
তবে পিকাসোর বিশ্বখ্যাত ‘গোয়ের্নিকা’ দিয়ে তাঁর চিন্তা-চেতনার পরিব্যাপ্তি ও সমগ্রতাকে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। একটি ধ্বংস ও প্রতিবাদচিত্র তাঁকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দিলেও তাঁর ‘লেই দেমোয়াজেল দে’তিনিয়োঁ’, ‘দ্য উইপিং উইম্যান’, ‘দ্য ব্লু রুম’, ‘ওল্ড গিটারিস্ট’, ‘ল্য মুঁল্যা দ্য লা গালেত্’, ‘টু ন্যুডস’, ‘সেল্ফ-পোর্ট্রেট’, ‘মডেল অ্যান্ড ফিশবৌল’, ‘থ্রি মিউজিশিয়ানস্’ ও ‘উইমেন অব আলজিয়ার্স’—শিরোনামের শিল্পকর্মগুলো তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
