নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট যশোর জেনারেল হাসপাতাল এলাকা ঘিরে অবৈধ, নামসর্বস্ব প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকের রমরমা ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগী মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে হরহামেশা। লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে আবেদন করেই এসব প্রতিষ্ঠান অস্ত্রোপচার, চিকিত্সা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠান মালিকরা স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের কাছে আবেদন করেই লাইসেন্স পেয়ে যাবার ভাব নিয়ে ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন। শুক্রবার দুপুরে সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার রায় ইত্তেফাককে বলেছেন, আগামীকাল (রবিবার) থেকে তারা এসব অবৈধ হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযানে নামবেন।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, যশোর জেলায় মোট বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল রয়েছে ১৭০টি। এর মধ্যে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট যশোর জেনারেল হাসপাতালের আশপাশে গড়ে উঠেছে কমপক্ষে ৪০টি। যার মধ্যে ২৫টি অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালিত করছে। ২০১৭ সালের পর থেকে জেলায় কমপক্ষে ৬০টি প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্থাপিত হয়েছে। সরকারি নিয়মবহির্ভূতভাবে স্ব স্ব নীতিমালায় চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। রোগীদের কাছ থেকে নিজেদের মতো করে ফি আদায় করছে তারা। একই ধরনের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য একেক প্রতিষ্ঠানে আদায় হয় একেক ধরনের ফি। এতে চরম বিভ্রান্তিতে পড়েন রোগী ও স্বজনরা। সরকারি নির্দেশ পাওয়ার পরও অধিকাংশ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্ধারিত ফি-র তালিকা টাঙানো হয়নি।
সূত্র আরো জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ক্লিনিক্যাল প্যাথলজির জন্য ৩৭ ধরনের, মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইমিউনোলজির জন্য ৪১, বায়োকেমিস্ট্রি ৪২, হিস্ট্রোপ্যাথলজি ৩, ড্রাগ এবিউজ ৮, থেরাপিউটিক ড্রাগ ৫ ও ভাইরোলজির ২৩ ধরনের গ্রহণযোগ্য ফি প্রস্তাব করা আছে। ক্লিনিক্যাল প্যাথলজির ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৮০ ও সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা, মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইমিউনোলজিতে সর্বনিম্ন ১৫০ ও সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩০০ টাকা, বায়োকেমিস্ট্রিতে সর্বনিম্ন ১২০ টাকা ও সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা, হিস্ট্রোপ্যাথলজিতে সর্বনিম্ন ৫০০ ও সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকা, ড্রাগ এবিউজে সব ধরনের পরীক্ষা ৫৫০ টাকা, থেরাপিউটিক ড্রাগের ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা ও ভাইরোলজির ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২০০ ও সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়। অথচ এসবের কোনোকিছুই মানা হয় না প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
সরকারের অনুমোদন থাকা কিংবা অনুমোদনহীন এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিত্সার নামে চলছে ব্যবসা। তাদের ফাঁদে পড়ে অনেক রোগী হয়রানির শিকার হচ্ছে। হাতুড়ে টেকনিশিয়ান দিয়েই করা হয় রোগ নির্ণয়ের যাবতীয় পরীক্ষা এবং দেওয়া হয় মনগড়া রিপোর্ট। পর্যায়ক্রমে এ প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করার কাজ চলছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালরা এসব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নির্ধারিত কমিশনের বিনিময়ে রোগী ভাগিয়ে এনে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে নেমেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। লাইসেন্স না থাকা ও অপচিকিত্সায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগে এক সপ্তাহের ব্যবধানে চারটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করে দিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। এগুলো হলো: যশোর শহরের ঘোপ জেলখানা রোডের বন্ধন হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ঝিকরগাছার সালেহা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মণিরামপুরের প্রগতি সার্জিক্যাল ক্লিনিক এবং অভয়নগরের নওয়াপাড়ার মমতাজ হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এছাড়া ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. ফতে আলী হাসান ও মেডিক্যাল অফিসার ডা. মাশহুরুল হক জুয়েলের নেতৃত্বে একটি টিম প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সময় যশোর শহরের সাতটি অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার ও চিকিত্সা সেবাসহ সকল কর্মকাণ্ড অবৈধ ঘোষণা করেছেন।
সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার রায় জানান, লাইসেন্স না করা পর্যন্ত ঐসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা জারি করে নোটিশ দেওয়া হবে। আরো একাধিক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার কালো তালিকাভুক্তির কাজ চলছে। তিনি জানান, জেলার অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান মালিক স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের কাছে লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে আবেদন করেছেন। কিন্তু আবেদন করেই ব্যবসা করার নিয়ম নেই। এজন্য রবিবার থেকে স্বাস্থ্য বিভাগ অভিযান শুরু করবে। ভুঁইফোঁড় এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। লাইসেন্স না থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। কালো তালিকাভুক্ত সকল প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরই মধ্যে বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ ইত্তেফাককে বলেন, সিভিল সার্জনকে বলেছি যেকোনো মেডিক্যাল অফিসার যেকোনো উপজেলার ইউএনওকে বললেই তিনি যেকোনো সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করবেন। তবে যশোর শহরে কোনো ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কোনো আবেদন সিভিল সার্জন অফিস থেকে তিনি পাননি বলে জানান।
