হারাধনের ইনজেকশন

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:০৪

 আফরীন সুমু

 

হারাধন আর যশরাজের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নাম শুনে বিভ্রান্ত হবেন না। এরা কুস্তিগীর নন। দুজনেই ডাক্তার। একজন পাস করা, আরেকজন চাষ করা। চাষ করা ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা দরকার। সদর হাসপাতালের এক নামকরা ডাক্তারের কম্পাউন্ডারি করতে করতে হারাধন ডাক্তারির চৌদ্দো আনা শিখে ফেলল। নাড়িদেখা, জ্বর মাপা, প্রেসার মাপা, ডায়বেটিস চেকিং, ইনজেকশন দেওয়া, ফোড়া কাটা, জোড়া, তালি, সেলাই—এমন কিছু নেই যা সে পারে না। এদিকে যশরাজের পাসও যেনতেন পাস নয়, প্যারামেডিকেল পাস।  সে সব পড়েশুনে এসেছে। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হারাধন সব সময় এগিয়ে। যশরাজ পড়ে লিখে কেবল ডাক্তারিটাই শিখেছে। হারাধন কম্পাউন্ডারি করতে করতে ডাক্তারির পাশাপাশি কেতাকানুন, ভাব-সাব অনেক কিছু শিখে নিয়েছে। অসুখ যাই হোক, রোগীকে কী করে ভড়কে দিতে হয়, সে কায়দা তার চেয়ে ভালো আর কে জানে? হারাধন রোগা-পটকা মানুষ। মাথাজুড়ে স্টেডিয়ামের মতো গোল টাক। টাকের কারণে তার চেহারায় ডাক্তারভাব জোরালো হয়েছে। রোগা-পটকা বলে তাকে এক রত্তি হেলা করার উপায় নেই। কানে স্টেথো লাগিয়ে হার্টবিট চেক করার সময় দেখে মনে হয় হিমালয়ের চূড়ায় ধ্যান করতে বসেছে। চোখ বুজে হূদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা শব্দের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করছে। হারাধনের সবচেয়ে প্রিয় চিকিত্সা হলো ইনজেকশন। ইনজেকশনের জন্য সে অত্র অঞ্চলে বিখ্যাত। জরুরি কলে গেলে তার প্রথম কাজ হলো ডাক্তারি ব্যাগটি অতি যত্ন সহকারে রাখার ব্যবস্থা করা। ব্যাগ সে যেখানে সেখানে রাখে না। তার বসার জন্য যেমন একটা আলাদা চেয়ার লাগবে, ঠিক তেমন তার ব্যাগটা রাখার জন্যও আলাদা চেয়ারের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাগটাকে চেয়ারে অতি যত্নসহকারে উপবেশন করিয়ে হারাধন স্টেথোস্কোপ বের করে কানে পরবে। রোগীর বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত সেটা তার গলায় ঝোলানো থাকবে। প্রথমে রোগীর নাড়ি দেখা হবে, তারপর হূদকম্পন পর্যবেক্ষণ, তারপর গম্ভীরমুখে কিছুক্ষণ শরীর টিপাটিপি করে একটা ইনজেকশন। ইনজেকশন দেওয়ার ভঙ্গিটা অত্যন্ত নাটকীয়। তার ইনজেকশন দেওয়া যারা দেখেছে, মানে রোগীর লোকজনকে যদি হলফ করেও বলা হয় হারাধন কম্পাউন্ডার থেকে ডাক্তার হয়েছে, তাহলে জুতিয়ে মুখ ভেঙে দেবে। তার ইনজেকশনের ওপর গ্রামবাসীর অগাধ বিশ্বাস। ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর’ প্রবাদটি খাগুড়িয়া গ্রামবাসীর জন্য অক্ষরে অক্ষরে প্রযোজ্য। হারাধন গায়ে ঢুকেছে যশোরাজের পরে। তা সত্ত্বেও কেবল ইনজেকশনের জোরেই হারাধনের খ্যাতি লতার মতো তরতর করে উঠে গেছে অনেক উপরে।

 

দাসের হাট বাজারে তার ঐতিহ্যবাহী একটি চেম্বার আছে। সাধারণত ফার্মেসিগুলোর এককোণে চেম্বারের জন্য জায়গা করে দেওয়া হয়। হারাধনের ক্ষেত্রে উল্টো। তার চেম্বারে কোনো ফার্মেসি নেই। হারাধনের মতে ফার্মেসি ও চেম্বার একত্রে রাখা ছোটলোকি। সে ডাক্তার ডাক্তারি করবে। ঔষধের বেচাবিক্রি হবে আলাদা। ডাক্তারকে যদি ঔষধের দোকানের মধ্যে বসে ডাক্তারি করতে হয় তবে আর ইজ্জতের বাকি কী থাকে? তবে ফার্মেসিকেও তো একেবারে এড়ানো যায় না। ভান-টান যতই করুক, মূল ব্যবসা তো ঐটাই। হারাধনের ফার্মেসিটি তার চেম্বারের ঠিক উল্টো দিকে। হারাধনের মেজো পুত্র সেটি চালায়। বড়ো পুত্রটি তার কম্পাউন্ডার। বড়ো পুত্রের মাথা ভালো। হারাধনের ইচ্ছা প্রাথমিক ট্রেনিং নিজের কাছে দিয়ে তাকেও একজন বড় ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া। মাথা যতই ভালো হোক, পড়েলিখে ডাক্তারি যে তার ছেলেপুলেদের দিয়ে হবে না, সে বিষয়ে হারাধন ভালোভাবে অবগত। চেম্বারে কোনো রোগী এলে হারাধনের বড়ো পুত্র কাম কম্পাউন্ডার তাকে যত্ন করে শুইয়ে দেয়। হারাধন বসা রোগীর সঙ্গে কথা বলে না। হারাধনের কাছে বসে কথা বলা রোগী আর খোশগল্প করতে আসা লোকজনের মধ্যে কোনো পাথর্ক্য নেই। জ্বরের রোগী এসেছে, হারাধন নাড়িটেপাসংক্রান্ত কাজ শেষ করে ইনজেকশন নেবে। সিরিঞ্জে টেনে নিয়ে আলোর সামনে ধরে কয়েকটা টোকা দিয়ে টুকুস করে ফুটিয়ে দেবে। পেটে ব্যথার রোগী এসেছে, টুকুস করে একটা ইনজেকশন। পড়ে গিয়ে হাত-পা ছড়ে গেছে, টুকুস করে ইনজেকশন। গলায় কাঁটা ফুটেছে, সেখানেও ইনজেকশন। পায়খানা কষা হয়েছে, তাও ইনজেকশন। মোট কথা, হারাধনের কাছে রোগী আসা মানেই ইনজেকশন। হারাধনের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অসাধারণ। দেখেই বলে দিতে পারে, রোগী তার হাতে ভালো হবে কি না। রোগীর অবস্থা খারাপ দেখলে হারাধন তাকে জেলা শহরের কোনো এক বড়ো ডাক্তারের কাছে রেফার করে দেয়। তার মানে এই নয় যে, সে স্বীকার করে নিচ্ছে, সে ডাক্তারি বিদ্যায় কমজোরি। তার বক্তব্য হলো, এই অজপাড়াগাঁয়ে প্র্যাকটিস করার মতো পর্যাপ্ত উপকরণ তার নেই। চাইলেই সে শহরে গিয়ে উচ্চতর প্র্যাকটিস করতে পারে। কিন্তু গ্রামভর্তি দুর্বল, অসুস্থ রোগীদের অনন্যোপায় অবস্থায় ফেলে যাওয়া তার কাছে সমীচীন নয়। তাছাড়া উচ্চতর প্র্যাকটিস করে সব রোগী যদি সেই দেখে ফেলে তবে বাকিদের কী উপায় হবে?

 

যশরাজের কাছেও যে রোগী একেবারে যেত না, তা নয়। হারাধনের কৌশলের কাছে টিকতে না পেরে শেষ উপায় হিসেবে যশরাজ তার ফি কিছুটা কমিয়ে দিয়েছিল। যাদের কাছে হারাধনের ফিয়ের পয়সায় টান পড়ত, তারা উপায়ান্তর না পেলে যশরাজের কাছেই আসত। রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে থাকলেও মৃত্যুর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হারাধনের কোনো কৌশল কাজে এলো না। হারাধনের অকাল মৃত্যু হওয়ায় সবচেয়ে উপকৃত ব্যক্তিটি হলো যশরাজ। এদিকে হারাধনের ছেলেরা পড়ল অথৈ জলে। ডাক্তার ছাড়া তাদের ফার্মেসি ব্যবসাটিও মুখ থুবড়ে পড়ল। নিতান্ত উপায় না দেখে হারাধনের বড়ো পুত্র যশরাজের কম্পাউন্ডারিতে লেগে গেল। যশরাজ আর হারাধনের ফার্মেসি যৌথ হলো। যাই ঘটুক, হারাধনের ইনজেকশনের রহস্যটি যশরাজ তার জীবিতকালে কোনো দিনই জানতে পারেনি। এবার মওকা পেয়ে হারাধনের কম্পাউন্ডার কাম বড়ো পুত্রটিকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করতেই সে মাথা নিচু করে জানাল, ‘পিওর ডিস্টিল ওয়াটার, স্যার।’ হারাধনের ডিস্টিল ওয়াটার ইনজেকশনের বুদ্ধিটি প্রায়শই নিজের ডাক্তারিতে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সাতাশ বছর সাফল্যের সঙ্গে ডাক্তারি করে অবশেষে পরলোক গমন করল পাস করা ডাক্তার যশরাজ সাহা।   g