সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর
শহর থেকে একজন মান্যগণ্য লোক এসেছেন। হিরুর খোঁজে। পুরো মহল্লায় সয়লাব হয়ে গেল—কোটিপতি ব্যবসায়ী লোকটি তার একমাত্র কন্যার জন্য পাত্র বাছাই করতে এসেছেন! হিরু বুঝি তার ঘটক!
সবার হালচাল দেখে হিরুর এক শুভাকাঙ্ক্ষী বলে বেড়াতে লাগল, ‘কেন রে ভাই, হিরুকে ঘটক ভেবে বসে আছিস! হিরু কি স্বয়ং পাত্র হতে পারে না?’
তোতা চাকলাদারের দোকানে বসেও কথাটা বলছিল সে। এমনিতে চাকলাদার হিরুর গুণমুগ্ধ ভক্ত হলেও, এবেলায় সে হিরুর পক্ষ নিতে পারল না। বলল, ‘হিরু সুখে আছে। তবে তাকে ভূতে কামড়াচ্ছে না যে, সে অমন হোমড়া-চোমড়া, মোটকু ব্যবসায়ীর মেয়ের জামাই বনে যাবে।’
‘কেন? সে মোটা হয়েছে বলে যে তার মেয়ের জামাই হওয়া যাবে না—এমন বিধি কোন শাস্ত্রে রয়েছে, শুনি?’
তোতা চাকলাদার তার প্রশ্নের আশপাশ দিয়েও গেল না। সে বলল, ‘হিরু সুখে আছে। তবে তাকে ভূতে কামড়াচ্ছে না যে, সে অমন কোটিপতি ব্যবসায়ীর মেয়ের জামাই বনে যাবে।’
লোকটা ফের বলল, ‘কেন? সে পয়সাদার হয়েছে বলে যে তার মেয়ের জামাই হওয়া যাবে না—এমন বিধিই বা কোন শাস্ত্রে লেখা আছে, শুনি?’
তোতা চাকলাদার এবার বলল, ‘আমাদের হিরু সবার হিরো। তাকে বিয়ের করার জন্য খোদ সিনেমার হিরোইন চলে আসবে।’
‘হিরু হিরোইন খায় না। হিরোইন বিয়েও করবে না।’
তোতা চাকলাদার তবু বলল, ‘হিরু লোকটার কন্যাকে বিয়ে করলে আর এলাকায় ফিরবে না। শহরে গিয়ে পাকাপোক্ত হয়ে যাবে। এক যুগেও ওর মুখ দর্শন হবে না।’
‘এ কারণে তো আমরা হিরুকে এখানে আটকে রাখতে পারি না। হিরুর একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ রয়েছে। শহরে গিয়ে বড়োলোকের জামাই হয়ে সুখের জীবন গড়ুক ছেলেটা।’
তোতা চাকলাদার তবুও গাইগুই করতে লাগল। ‘হিরু তো এমনিতেই সুখে আছে। শহরের ওই বিষাক্ত আবহাওয়ায় গিয়ে ও যে কীভাবে...’ বলতে বলতে থেমে গেল সে।
মান্যগণ্য লোকটা যে স্বয়ং প্রাইভেটকার নিয়ে তার দোকানের সামনে এসে হাজির। তোতা চাকলাদার স্বস্বব্যস্ত হয়ে পড়ল। দোকানের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো সে। কোমরের গামছাটা খুলে হাতে নিয়ে দোকানের সামনে পেতে রাখা বেঞ্চির ধুলা ঝাড়ল।
হোমড়া-চোমড়া লোকটা আনমনে বেঞ্চিতে বসে পড়ল। মুখে তার রাজ্যের হতাশা।
‘চা দিব সাহেব?’ চাকলাদার আদিখ্যেতা দেখিয়ে জানতে চাইল।
‘চা!’ যেন গভীর ধ্যান ভাঙল তার। ‘হ্যাঁ, দিতে পারেন।’
‘কিছু মনে করবেন না— কোনো কারণে আপনাকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে?’
‘না, হ্যাঁ।’ লোকটা দ্বিধান্বিত। ‘আসলে চ্যালাপুরে তো এলাম, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটির দেখা পেলাম না এখনো।’
‘কার কথা বলছেন?’ তোতা চাকলাদার জানতে চাইল।
‘তার নাম জানলে কী আর এখানে বসে থাকি!’
‘তাও ভালো। নাম জানেন না বলে সৌভাগ্যবশত আমার দোকানে এসে অন্তত চা গলাধঃকরণ করতে পারছেন!’ তোতা চাকলাদার স্বগতোক্তি করল।
পাশে বসা লোকটা, যে এতক্ষণ ধরে চাকলাদারের সঙ্গে কথা বলছিল, সে বিগলিত হাসি হেসে বলল, ‘আপনি তাহলে আপনার সুযোগ্য কন্যার জন্য পাত্র দেখতে এসেছেন, তাই তো?’
‘হা হা।’ লোকটা হঠাত্ হেসে উঠল। ‘আমার মেয়ের বয়স মাত্র ১৩।’
‘আপনার আর কোনো মেয়ে নেই?’
‘না। একটু লেট করে বিয়ে করলে যা হয় আর কি! কোন সুখে থাকতে যে ভূতে কামড়েছিল আমাকে!’
‘কাহিনিটা কী, একটু ঝেড়ে কাশবেন? আমরা হয়তো আপনাকে হেল্প করতে পারব।’ পাশের লোকটা বলল।
লোকটা কয়েক মুহূর্ত একটু ইতস্তত করল। তারপর বলতে শুরু করল, ‘আসলে বহু বছর ধরেই আমি মনের দিক থেকে অসুখী। তখন একজন পরামর্শ দিল— বিয়ে করো। করলামও। কিন্তু তাতে সুখ না বেড়ে, বরং কমল আরো। ধীরে ধীরে মনের বাঘে খেতে লাগল আমাকে। কোথায় কোথায় যে সুখ খুঁজে বেড়ালাম...।’ এক মুহূর্ত থামল সে। আবার বলতে লাগল, ‘সুখের খোঁজে তিব্বতে গিয়ে গুম্ফায় বসে লামাদের সঙ্গে ধ্যান করেছি। নিঝুম-নিরিবিলি এক দ্বীপে গিয়েও থেকে এসেছি কয়েক মাস। কিছুতেই কিছু হলো না। সেদিন একজন বলল, কোনো এক সুখী মানুষকে খুঁজে বের করে তার জামা পরতে। তাহলেই নাকি সুখ মিলবে! চাষাবাদের মতোই টানা কয়েকদিন সুখী মানুষ খুঁজে বেড়ালাম। কোথাও পেলাম না। তার কাছে আবার গেলাম। বললাম, ‘সুখী মানুষই তো পাচ্ছি না। তার জামা পাব কোথায়?’ তখন সে বলল, ‘চ্যালাপুরে গিয়ে দেখো। ওখানে একজন সুখী মানুষের দেখা পাবে। তার জামা এনে পরবে।’ ব্যস আমিও এখানে এসে পড়লাম। কিন্তু...’
‘সুখী মানুষটিকে আর খুঁজে পেলেন না, তাই?’
‘হ্যাঁ।’
‘আপনি এক কাজ করতে পারেন।’
‘কী কাজ?’
‘আমাদের এই গ্রামের এক যুবক, ওর নাম হিরু, ওর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। ও এই ব্যাপারে আপনাকে হেল্প করতে পারবে।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ মনে পড়েছে।’ হঠাত্ লোকটা খুশি হয়ে উঠল।
‘কী মনে পড়েছে?’
‘হিরুর কথাই বলেছিল সে। তা হিরুকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে?’ সুটেট-বুটেট লোকটা উঠে দাঁড়াল।
‘হিরুকে খুঁজতে কোথাও যেতে হবে না। ঐ যে ও। এইদিকেই আসছে।’
দুই.
গাড়িওয়ালা কোটিপতি লোকটা হিরুকে সবকিছুই খুলে বলল। সবশুনে হিরু বলল, ‘আমি কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি, বলুন?’
‘একজন সুখী মানুষের সন্ধান দিন।’
‘পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের কাছে যান। উনারা এখন বেশ সুখে আছেন।’
‘গিয়েছিলাম। লাভ হলো না কোনো। বলল, বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছে সত্য, কিন্তু সামনের বছরে এই দাম থাকবে না ভেবেই ভীষণ মন খারাপ তাদের।’
‘তাহলে হীরক রাজার দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে যান। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পরেও যেভাবে মহাসুখে আছেন...। পদত্যাগ করা তো উনার জন্য এক মিনিটের কাজ, অথচ করছেন না।’
‘যাইনি ভেবেছেন? উনি বললেন, ‘ওই ‘এক মিনিটের’ ভয়েই তটস্থ থাকতে হয় সর্বদা।’
‘ঢাকার সিনেমার কোনো এক নায়ক...’
হিরুর বলার আগেই সে বলে উঠল, ‘ঢাকার সিনেমার নায়করা বাস্তব জীবনে সিনেমার পর্দার নায়িকাদের মতো বউ পায় না বলে অসুখী।’
‘ভাগ্যরেখা বলে দেওয়া কোনো এক জ্যোতিষী কিংবা বছরের পর বছর ধরে ধ্যানমগ্ন কোনো এক জটাধারী সাধু বাবা?’
‘সুখের সন্ধান করতে গিয়েই তো তাদের এই অবস্থা। সুখ মিললে কি আর তারা ঘরে ফিরত না?’
‘তাও কথা। আচ্ছা, আপনি তো অনেক টাকার মালিক। তাহলে আপনি সুখী না হলেও, আপনার স্ত্রী নিশ্চয়ই সুখী?’
‘ওর কষ্ট কী, জানেন? ওর স্বামীর এত এত টাকা, আর ও কিনা সালমান খানের মতো স্বামী পেল না!’
‘আপনি তো দেখতে-শুনতে বেশ ভালো।’
‘কিন্তু, ওর পছন্দ যে ওই সালমান খান...’
‘তিনি আশা ছেড়ে দিয়েছেন নাকি? সালমান খান তো এখনো বিয়েই করেননি।’ ফান ছেড়ে হিরু এবার সিরিয়াস হলো। হঠাত্ ও তোতা চাকলাদারের কাছে জানতে চাইল, ‘আপনি কি সুখী?’
চাকলাদার হঠাত্ এই প্রশ্ন শুনে ইতস্তত বলল, ‘ইয়ে মানে... না।’
একে একে ওখানে উপস্থিত সকলকেই প্রশ্নটা করল ও। সকলেরই একই জবাব। তখন ও লোকটাকে বলল, ‘কথা হলো গিয়ে—সুখী মানুষের সন্ধান আমার কাছে নেই। যদি সন্ধান পাই, তাহলে জানাব আপনাকে। আপনার নম্বর দিয়ে যান। অন্যদেরও দিতে পারেন। উনারা খোঁজ পেলে আপনাকে জানিয়ে দেবে।’
‘আচ্ছা।’ গম্ভীর মুখকরে বলল সে।
‘চা খাবেন?’ হিরু জানতে চাইল।
‘না। একটু আগে খেয়েছি।’
হিরু চাকলাদারকে ওর জন্য চা দিতে বলল।
চাকলাদার চা বানিয়ে দেওয়ার পরে হিরুর পায়ের ওপর পা তুলে বেশ আরাম করে চাটুকু খেল। তা দেখে কোটিপতি লোকটির চোখদুটি চকচক করে উঠল।
তিন.
সকালে ঘুম থেকে উঠে হিরু ওর নতুন কেনা শার্টটা খুঁজে পেল না। বেশ মন খারাপ হলো ওর।
কথায় কথায় খবরটা সোলায়মান কেবলাপুরীর কানেও গেল। আগের ঘটনাও তার কানে এসেছিল। তার বুঝতে বাকি রইল না, এটা কার কাজ।
সোলায়মান কেবলাপুরী সেই কোটিপতি লোকটির নম্বর জোগাড় করে তাকে ফোন দিল, ‘আপনি কি সুখী হতে পেরেছেন?’
‘কেন বলুন তো?’
‘শার্টটা একেবারে নতুন। হিরু একদিনও পরেনি। ওই শার্ট গায়ে দিলে আপনি সুখী হবেন কী করে?’
গতকাল ফেরার পথে কোটিপতি লোকটি হিরুর বাড়িতে গিয়েছিল। সে ভেবে দেখেছে, হিরুর মতো সুখী মানুষ দ্বিতীয়টি নেই। হিরুর জামা পরতে হবে তাকে।
হিরু যে তখন বাড়িতে থাকবে না—এই খবরটা সে জেনে এসেছে। এক ফাঁকে হিরুর রুম থেকে একটা শার্ট তুলে নেয়। কোটিপতি মানুষ, পুরোনো শার্ট নিতে একটু ইতস্তত করছিল। প্যাকেট করা নতুন শার্টটিই নিয়ে নেয় সে। কিন্তু এখন যা শুনছে... সে তত্ক্ষণাত্ তার পূর্বপরিচিত এক চোরকে ডেকে পাঠাল।
কালু চোরা আজ ব্যাপক খুশি। তার চুরির ক্যারিয়ারে আজ পূর্ণতা এসেছে। এক কোটির ডিল একটা পেয়েছে সে। এই টাকাটা সে পাবে হিরুর বাড়িতে গিয়ে হিরুর ব্যবহূত একটি শার্ট চুরি করে আনার জন্য!
চার.
দুদিন পর আবারও সোলায়মান কেবলাপুরীর ফোন, ‘আপনি কখনোই সুখী হতে পারবেন না।’
‘কেন? এবারে তো হিরুর পরিহিত শার্ট এনেছি।’
‘কিন্তু জিনিসটা তো চোরাই। চোরাই জিনিস পরে কি কেউ জীবনে সুখী হয়েছে?’
‘তাহলে কী করতে হবে?’
‘হিরু তো আর মানবে না যে ও সুখী ব্যক্তি। কিন্তু কৌশলে ওর জামার মূল্য পরিশোধ করে দিতে পারেন। কীভাবে করবেন, সেই উপায়ও আমার কাছে জানতে চাইবেন না প্লিজ।’
‘আচ্ছা, জামার মূল্যের চেয়ে বেশি টাকা দিলে কি সমস্যা আছে?’
‘দোকানে গিয়ে আপনি যদি বিক্রয়মূল্যের চেয়েও বেশি দাম দিয়ে কিছু কিনে আনেন, দোকানদার কি অখুশি হবে?’
পাঁচ.
কয়েকদিন পর হিরুর মাথায় এক বুদ্ধি এলো। ও সেই কোটিপতি লোকটিকে ফোন করল।
‘সুখী মানুষের জামা পেয়েছেন?’ হিরু জানতে চাইল।
‘ইয়ে মানে... হ্যাঁ।’
‘সুখ পেয়েছেন?’
‘এখন অব্দি পাইনি। তবে শিগগিরই পাব।’
‘বেশ। বেস্ট অব লাক।’ এই বলে ও চাকলাদারকে এককাপ গরমাগরম চা দিতে বলল।
চা খেতে খেতে ও চাকলাদারকে বলল, ‘বুঝলে মিয়াভাই, সুখী হওয়ার মূলমন্ত্র খুঁজে পেয়েছি।’
‘কার জামা?’
‘আরে কারো জামা-টামা নয়।’
‘তাহলে?’
‘আমাদের আশপাশে কেউ সুখে নেই। আমরা যদি নিজে যে অবস্থানে আছি, তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকি, তাহলেই সুখী থাকতে পারি।’
‘ওওও।’
‘আচ্ছা উঠি ভাইসাব।’
ছয়.
বাড়িতে ঢুকতেই কুরিয়ারের লোকটার সঙ্গে দেখা হলো। সে একটি বিশালাকৃতির প্যাকেট নিয়ে বসে আছে।
‘হিরু ভাই, প্যাকেকটা আপনার বদলে অন্য কারো হাতে না দেওয়ার কড়া নির্দেশ আছে।’
‘বেশ তো, রেখে যাও।’
লোকটা চলে যাওয়ার পর প্যাকেটটা খুলল ও। টাকার বান্ডেল। দুই দিন লাগিয়ে গুনল ও, পুরো পাঁচ কোটি টাকা। কে পাঠাল? কুরিয়ারের ছেলেটা জানাল, সে জানে না। প্রেরকের ঠিকানামতো লোক পাঠিয়ে জানল, ঠিকানাটা জাল।
‘টাকাটা কে পাঠাল?’ পাঁচ কোটি টাকা পেয়ে হিরুর ঘুম উধাও।
ওদিকে, হিরুকে পাঁচ কোটি পাঠিয়ে প্রথম প্রথম মনে একটু সুখ জেগেছিল সেই কোটিপতি লোকটির। কিন্তু দুদিন পরেই তার সেই সুখ উধাও।
পাঠক, এই গল্পের এখানেই সমাপ্তি। জামা পেয়েও কোটিপতি লোকটি সুখী হতে পারেনি। অজ্ঞাত উত্স থেকে টাকা পেয়ে হিরুর মনেও আজকাল সুখ নেই।
অবশ্য একজন সুখী হতে পেরেছিল। সে হলো আমাদের তোতা চাকলাদার। কীভাবে? তা নাহয় আপনারাই অনুমান করেই নিন। g
