‘বাংলাদেশ’ নামকরণ দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণার দাবি জানাই

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৫৬

ইতিহাস মানবজাতির দর্পণ। মানবহূদয়ের চিরন্তন কৌতূহলের জবাব। সমাজ, রাষ্ট্র-জাতির ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও গৌরবময় ইতিহাস দেশপ্রেমের প্রেরণা। ইতিহাস তার নিজস্ব চলমান বৈশিষ্ট্যে বিদ্যমান। তথাপি কোনো ঐতিহাসিক সত্য বা ঘটনাকে ‘বিশেষ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে জাতির সামনে সহজবোধ্য করার ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় সংহতি, উন্নয়ন ও দেশাত্মবোধের জন্য ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ দিবস হতে পারে একটি ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

জাতিসত্তার অস্তিত্বগত দিক থেকে বাঙালি জাতি, জাতীয়তার চেতনা, জাতিরাষ্ট্রের ধারণা অনেক পুরোনো। প্রাচীনকাল থেকেই বহুজাতিক-বহুভাষিক জনগোষ্ঠীর বাসস্থান হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশে। ড. নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, ‘বাংলাদেশের যে ‘জন’ ও সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে, তার প্রায় সবটাই আদি-অষ্ট্রেলীয় ও আলপাইন লোকদের কীর্তি।’ তবে প্রাচীন যুগে বর্তমান বাংলাদেশের অনুরূপ ভূখণ্ড-বসতির অস্তিত্ব ছিল না। বৃহত্তর বঙ্গীয় অঞ্চল (বর্তমান গোটা বাংলাভাষী অঞ্চল) এক সময় বঙ্গ পুণ্ড্র্র সমতট বঙ্গাল রাঢ় নামীয় একাধিক স্বতন্ত্র কৌম জনপদে বিভক্ত ছিল। পরবর্তীকালে এসব কৌম জনপদেও স্বতন্ত্র রাষ্ট্ররূপ গড়ে ওঠে। প্রাচীন গ্রন্থ বা রচনায়, সাহিত্যে বা গাথায় রাঢ়, বঙ্গাল, সমতট জনপদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে স্বাধীন বঙ্গাঞ্চলীয় রাষ্ট্র গঙ্গাহূদি (গঙ্গারিড্ডি)-র বিবরণ পাওয়া যায় মেগাস্থিনিসের ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থে এবং প্লিনি, টলেমি প্রমুখ ভিনদেশি পর্যটকদের রচনায়।

ষষ্ঠ শতকে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে বঙ্গ পরিচিত হয়ে উঠে। প্রায় ৪০০ বছরের পালবংশীয় শাসনামলকে অনেকে প্রথম স্বাধীন বাংলা বাঙালি রাষ্ট্রের সুসংহত সূচনা বলে মনে করেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৪১৪) বাঙ্গালা রাষ্ট্রে নিজেকে ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালা’ রূপে পরিচিত করে দিয়ে যে ধারার সৃষ্টি করেছিলেন, সেই ধারাকে পরবর্তী সুলতানি আমলগুলো পরিপুষ্ট করেছে মনে করা হয়। পর্যায়ক্রমে পাঠান, মোগল ও বিদেশি ইংরেজ শক্তি বাংলাকে শাসন করেছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় আসাম ও বঙ্গ বা বাংলার রাজশাহী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ নিয়ে ‘পূর্ববাংলা ও আসাম’ প্রদেশ গঠিত হয়েছিল এবং ঢাকা ছিল এর রাজধানী। উনিশ শতকের সাহিত্যে অবিভক্ত বাংলাকে ‘বঙ্গদেশ’ বা ‘বাংলাদেশ’ বলার দৃষ্টান্ত রয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনিতে ‘বঙ্গদেশ’ শব্দের উল্লেখ আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আজি বাংলাদেশের হূদয় হতে’ এবং কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘নম নম নম বাংলাদেশ মম’-এর মতো দেশাত্মবোধক গানগুলোতে সাধারণ পরিভাষা হিসেবে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি পাওয়া যায়।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ও বঙ্গপ্রদেশ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব হলে ‘পূর্ব বাংলা’ হয় পাকিস্তানের অধীন। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ ধ্বংস করতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শুরু করে নতুন ষড়যন্ত্র। বাঙালির শত-সহস্র্র বছরের সংগুপ্ত আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি শেখ মুজিবুর রহমান তা অনুধাবন করেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার নাম থেকে ‘বাংলা’ শব্দটি বাদ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান দিতে চাইলে বাঙালিমুক্তির প্রধান কান্ডারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিবাদী হন। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি বলেন, ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে, আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন। ‘বাংলা’ শব্দটির একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য...।

সেই সময় থেকেই বাঙালির রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও আন্দোলনে ‘পূর্ব বাংলা’ নামটি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উত্তুঙ্গ গতি পায়। বঙ্গবন্ধুই ছিলেন একমাত্র বাঙালি যার নখদর্পণে ছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ৭ কোটি বাঙালির মনের ভাব, ভাষা, চিন্তা, চেতনা, সংকল্প ও সংস্কৃতি। প্রত্যহ, জীবনের অন্তিমমুহূর্ত পর্যন্ত স্বদেশ ও বাঙালির প্রতি আত্মনিবেদনে উন্মুখ ও অবিচল বঙ্গবন্ধু ১৯৬০ সালের ৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট আবেদন করে মুক্তিলাভ করে গঠন করেন গোপন সংগঠন। সামরিক ও আইয়ুব শাসন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে তত্কালীন ছাত্র নেতৃবৃন্দ দ্বারা গঠিত সেই সংগঠনটির নামও দেওয়া হয় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’।

ইতিহাস যেমন নায়ক সৃষ্টি করে, তেমনি নায়কও ইতিহাস সৃষ্টি করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই ঠিক করেন এই দেশটির নাম। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন এদেশের নাম ‘বাংলাদেশ’। সে সভায় তিনি বলেছিলেন ‘একসময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। ...একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোনো কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই।...জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধু ‘বাংলাদেশ’।’

বঙ্গবন্ধুকে যেমন দাবিয়ে রাখা যায়নি, তেমনি বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ‘বাংলাদেশ’ নামকে— বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে দাবিয়ে রাখা যায়নি। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার যে ঘোষণা দেন তাতেও ‘বাংলাদেশ’ নামটি পুনরুক্ত হয়েছে বারবার। সেদিন তার ঘোষণাটি ছিল, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্য বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।’ মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের প্রচারিত ঘোষণাপত্রেও বলা হয়েছে এই দেশটির নাম ‘বাংলাদেশ’। সে আলোকেই ১৯৭২ এর ৪ নভেম্বর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে গৃহীত হয়েছে দেশটির সাংবিধানিক নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে অজস্র দুর্লঙ্ঘ্য বাধা অতিক্রম করে, মৃত্যুকে বারবার পরাস্ত করে তার স্বপ্নকে-বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে সফল করেছিলেন। তিনিই এ দেশটির জন্ম দিয়েছেন এবং নাম দিয়েছেন ‘বাংলাদেশ’। ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো দিবসটি পালন করেছে বাংলাদেশ নামকরণ দিবস উদ্যাপন জাতীয় কমিটি। আমি মনে করি, ৫ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ দিবস এবং নামকরণের জনকের নাম রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হলে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ‘বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে আরো বেশি অনুপ্রাণিত হবে। তাই, গৌরবের মুজিববর্ষে ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ দিবস ও নামকরণের জনকের নাম রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণার দাবি জানাই।

n লেখক :গবেষক ও প্রাবন্ধিক