জুনাইদ আল হাবিব
মুক্ত সমুদ্র, মৃদু জলরাশি। সমুদ্রের বুক চিরে আসা জলরাশি আঁছড়ে পড়ছে বালুর ওপর। এখানেই মুক্ত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে প্রকৃতিপ্রেমীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল ঝাউবন। দু’জন আসবে। হাত ধরে হাঁটবে। তাদেরই প্রতীক্ষায় ঝাউবনটি। দক্ষিণের মুক্ত বাতাস ঝাউবন স্পর্শ করে যাচ্ছে পরম আবেশে। খোলা বাতাসের ছোঁয়ায় প্রেমিকার উড়ন্ত চুলের মতো দুলছে ঝাউগাছগুলো। জন্ম থেকেই সমুদ্রের খোলা বাতাস গায়ে মেখে ঝাউগাছগুলো এখন অনেক বড় হয়ে উঠেছে।
সমুদ্রের ঢেউ, বালুময় দীর্ঘ সৈকত আর ঝাউবনের সবুজ সমীরণের এ দৃশ্যটি যেন অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্যের এক উদাহরণ। এই প্রেমময় দৃশ্যপটের নাম শুভ সন্ধ্যা। হ্যাঁ, সমুদ্রের কোলঘেঁষা বরগুনার প্রান্তিক উপজেলা তালতলী নিশানবাড়িয়ার নলবুনিয়ায় অবস্থিত শুভ সন্ধ্যা সমুদ্রের কথাই বলছি। সাগর তীরের বালুকণা পর্যটকদের দুই পায়ের অলঙ্কার হয়ে সঙ্গে থাকে যতদূর পা চলে। এখানে এলে দেখা যাবে, সাগরপাড়ে সবুজের সমারোহে বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও পাখির কুহুতান।
দক্ষিণে তাকালে অথৈ সমুদ্রের ঢেউ, আর ঢেউয়ের সঙ্গে দোল খেলা মাছধরার ট্রলার ব্যতীত আর কিছুই দেখা যায় না। বরগুনার ৩টি প্রধান নদী পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বরের মিলিত জলমোহনায় সৈকতটি দাঁড়িয়ে আছে যৌবনা রূপ নিয়ে। ৪ কিলোমিটার লম্বা বেলাভূমিতে বিস্তৃত সৈকতটি। তালতলী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে সোনাকাটা ইকোপার্কসংলগ্ন নলবুনিয়ার এই চরটি এখন অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট টেংরাগিড়ি এই বেলাভূমির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মৃদু ঢেউয়ের ভালোবাসা পায়ে লাগিয়ে, স্নিগ্ধ বাতাস গায়ে লাগিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে একেকটি গোধূলি সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখার মুহূর্তটা কোনো পর্যটকের পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব না। প্রকৃতি প্রেমের এমন লোভে পড়ে গেলে এই স্বর্গে যেতে মন চাইবে বারবার। শুধু সমুদ্র ভ্রমণ কিংবা সৈকতের বালুময় সৈকত দর্শনার্থীর মন ভরাবে তা নয়, পাশাপাশি আরো অনেককিছু দেখার সুযোগ মিলবে এখানে।
শুভ সন্ধ্যার পাশেই আশার চরের অবস্থান। অসংখ্য মত্স্যজীবীর বসবাস এই চরে। আবার শীত মৌসুমে পর্যটকরাও সেখানে যান। দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, গভীর অরণ্য, বিশাল শুঁটকি পল্লী রয়েছে আশার চরে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে যাওয়া মানুষ শুঁটকি উত্পাদনের জন্য চরটিতে ঘর বাঁধেন। বছরে ৭ থেকে ৮ মাস থাকে শুঁটকি উত্পাদনের ব্যস্ততা। আশার চরের কাছেই রয়েছে তালতলীর বিশাল রাখাইন পল্লী। বঙ্গোপসাগরের তীরে এ পল্লীতে কুপি জ্বালিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাঁতে কাপড় বোনা। তাঁত শিল্প ছাড়াও রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ মন্দিরও অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ।
এখানে নদী-সমুদ্রের তাজা মাছ পাওয়া যায় ফকিরহাট বাজারের ছোট ছোট খাবারের হোটেলগুলোতে। এখানে খুব অল্প টাকায় পাওয়া যাবে মাছ-ভাত বা স্থানীয় খাবার। এই সৈকতটিতে খাবার ও মাছের দাম তুলনামূলক কম।
প্রান্তিক জনপদের সৈকতটি যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি। তবে জেলা শহর থেকে দূরে হওয়ায় পরিবহন সঙ্কট, প্রশাসনের নজরের বাইরে থাকা ও প্রচার-প্রচারণার অভাবে সৈকতটি পর্যটন সম্ভাবনার বাইরেই ছিল। পার্শ্ববর্তী স্থানীয় জনগণ ও মত্সজীবী ছাড়া এখানে পর্যটকদের যাতায়াত খুব কম ছিল। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সৈকতটি এখন বরগুনার অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে। দৃষ্টি কেড়েছে জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে স্থানীয় সুশীল সমাজ, প্রকৃতিপ্রেমী, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের। ২০১৭ সালে ১ ডিসেম্বর পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে জায়গাটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তত্কালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার বদরুদ্দোজা শুভ। তার নামের সঙ্গে মিল রেখেই এই পর্যটন কেন্দ্রটির নামকরণ করা হয় ‘শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত পর্যটন কেন্দ্র’। বর্তমানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সহযোগিতায় পর্যটকদের জন্য সৈকতটি সুসজ্জিত করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালের ২৩ নভেম্বর শুভ সন্ধ্যায় জোছনা উত্সবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বরগুনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ।
শুভ সন্ধ্যা সৈকতটিকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করার আরেক স্বপ্নদ্রষ্টা আরিফুর রহমান। নিজের ক্রয় করা তাবু ও পরিকল্পনা দিয়ে তিনি আগত পর্যটকদের সাহায্য করছেন। শুভ সন্ধ্যায় আসার জন্য পর্যটকদের জন্য তিনি একটি নৌ সার্ভিস চালু করেছেন। তিনি নৌযানটির নাম দিয়েছেন জল তরণী।
আরিফ রহমান জানান, সমুদ্রের ঢেউ যেখানে আঁছড়ে পড়ে তার ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে ঝাউ সারির প্রাকৃতিক রূপ দর্শনার্থীদের মনে প্রশান্তি এনে দিতে সক্ষম।
