মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিশংসনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার ছেলের বিরুদ্ধে তথাকথিত দুর্নীতির তদন্ত করতে জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ইউক্রেন সরকারকে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটরা তার বিরুদ্ধে অভিশংসন তদন্ত শুরু করে। গত কয়েক মাসের তদন্ত প্রক্রিয়া শেষে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ইন্টেলিজেন্স ও জুডিশিয়ারি কমিটিকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য অভিশংসনের প্রস্তাব দিতে বলেছেন হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। বলা চলে, এর ফলে ট্রাম্প এখন অভিশংসিত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন। এই প্রস্তাবকে বলা হয় ‘আর্টিক্যালস অব ইমপিচমেন্ট’। চলতি সপ্তাহেই এই ‘আর্টিক্যালস অব ইমপিচমেন্ট’ পেশ করার কথা রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র এখন বিপদগ্রস্ত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যা করেছেন, তাতে তাকে অপসারণ ছাড়া অন্য পথ খোলা নেই। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক সুবিধার উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থকে তিনি জলাঞ্জলি দিয়েছেন। সামরিক সহায়তা প্রত্যাহার এবং গুরুত্বপূর্ণ ওভাল অফিস মিটিং করেছেন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা দেওয়ার প্রতিদান হিসেবে। এখন স্পিকার পেলোসি প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবেন। সদস্যরা অভিশংসনের পক্ষে নাকি বিরুদ্ধে ভোট দেবেন, তা জানার চেষ্টা করবেন তিনি। প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতাদের এই আর্টিক্যালস অব ইমপিচমেন্ট লিখতে হবে। এখানে বড়ো দায়িত্ব পালন করবে জুডিশিয়ারি কমিটির প্রধান জেরি ন্যাডলার এবং হাউস ইন্টেলিজেন্স চেয়ার অ্যাডাম শিফ। তারা বিবেচনা করবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কিনা। ইউক্রেনকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তাকে তিনি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ঘুষ হিসেবে ব্যবহার করেছেন কি না। একই সঙ্গে কংগ্রেসের সমনে সাড়া না দিয়ে বিচারের প্রক্রিয়াকে তিনি বাধাগ্রস্ত করেছেন কি না।
তাদের এই ‘আর্টিক্যালস অব ইমপিচমেন্ট’-এর ওপর প্রতিনিধি পরিষদের জুডিশিয়ারি কমিটিতে প্রথম ভোটাভুটি হবে। আগামী সপ্তাহেই এই ভোটাভুটি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এর আগে হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটিকে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ‘আর্টিক্যালস অব ইমপিচমেন্ট’ জুডিশিয়ারি কমিটিতে দিতে হবে। জুডিশিয়ারি কমিটিতে ‘আর্টিক্যালস অব ইমপিচমেন্ট’ পাশ হলে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে তা প্রতিনিধি পরিষদে ভোটাভুটির জন্য উত্থাপিত হবে। সেখানে সব সদস্য ভোট দেবেন। প্রতিনিধি পরিষদে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের। এজন্য ট্রাম্পকে অভিশংসনের প্রথম ধাপ ডোমোক্র্যাটরা সহজেই উতরে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিনিধি পরিষদের পর এই প্রক্রিয়া গড়াবে সিনেটে। এ ব্যাপারে সিনেট একটি বিচার কার্যক্রম গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। সিনেটে দোষী প্রমাণিত এবং প্রেসিডেন্টকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করতে হলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার হবে। তবে এক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দলই সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দুই জন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব পাশ হয়েছিল। তাদের এক জন হচ্ছেন বিল ক্লিনটন, আরেক জন অ্যান্ড্রু জনসন। তবে তাদের কেউই সিনেটে দোষী প্রমাণিত হননি বা ক্ষমতা থেকেও সরে যেতে হয়নি। যদিও ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরুর আগেই পদত্যাগ করেছিলেন আরেকজন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। ডেমোক্র্যাটদের এই উদ্যোগের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, তিনি অন্যায় কিছু করেননি। তিনি ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদে দ্রুত এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আহ্বান জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারি স্টেফানি গ্রিশাম বলেন, ‘স্পিকার পেলোসি ও ডেমোক্র্যাটদের লজ্জিত হওয়া উচিত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অন্যায় কিছুই করেননি, বরং দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার নেতৃত্বে মার্কিন অর্থনীতি মজবুত হয়েছে, কর্মসংস্থান বেড়েছে এবং সেনাবাহিনী আরো শক্তিশালী হয়েছে। আমরা সিনেটে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকছি।’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অভিশংসন প্রক্রিয়া শেষ করতে চান ডোমেক্র্যাট ও রিপাবলিকান দলের সিনেটররা। রিপাবলিকান সিনেটররা বলছেন, তারা ট্রাম্পকে আত্মপক্ষ সমর্থন ও সাক্ষী হাজিরে সময় দিতে চান। তবে তারা এই প্রক্রিয়া আগামী স্টেট অব দ্য ইউনিয়নের ভাষণের আগে শেষ করতে চান। কিছু ডেমোক্র্যাট নেতা বলছেন, তারা চান না এই প্রক্রিয়ার কারণে ভোটাররা বিরক্ত হয়ে ওঠেন। দুই দলের নেতারা বলছেন, ইমপিচমেন্ট ট্রায়াল একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং চেম্বার এটি ‘সিরিয়াসলি’ নেবে। তবে এজন্য দীর্ঘ সময় ধরে প্রক্রিয়া চালাতে চান না তারা। একজন রিপাবলিকান সিনেটরের মতে, এই প্রক্রিয়ার মধ্যে স্পিকার পেলোসি হয়তো ট্রাম্পকে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণের জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন না। তাই প্রক্রিয়াটি দ্রুতই শেষ করার তাগিদ থাকবে দুই পক্ষের।
