সার ও কীটনাশক তথা বিষমুক্ত শাকসবজির পসরা লইয়া রাজধানীতে শুরু হইয়াছে ব্যতিক্রমী ‘কৃষকের বাজার’। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর সেচ ভবন প্রাঙ্গণে গত শুক্রবার এই বাজার উদ্বোধন করেন কৃষিমন্ত্রী। এই বাজার হইতে সম্পূর্ণরূপে কীটনাশকমুক্ত সবজি পাওয়া যাইবে। অবশ্য সপ্তাহের প্রতিদিন পাওয়া যাইবে না। প্রতি সপ্তাহে শুধু সরকারি অফিস বন্ধের দিন শুক্র ও শনিবার সকাল ৭টা হইতে এই বাজার বসিবে। কৃষকরা সরাসরি এই বাজারে সবজি নিয়া আসিবেন। প্রথমবার তাহাদের পরিবহন খরচ সরকার বহন করিবে। পরবর্তী সময়ে তাহাদের নিজ উদ্যোগে সবজি নিয়া আসিতে হইবে। ঢাকার আশেপাশের মোট আটটি উপজেলা হইতে অর্গানিক বিভিন্ন সবজি নিয়া আসিতেছেন কৃষকরা। স্বল্প পরিসরে এই উদ্যোগ শুরু হইলেও আমরা আশা করি, একসময় ইহা বৃহত্ পরিসরে সম্প্রসারিত হইবে।
সার ও কীটনাশক কৃষিতে কেন ব্যবহার করা হয়? মূলত জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে কৃষি উত্পাদন বাড়াইতে সার ও বিভিন্ন বালাইনাশক ব্যবহার করা হইয়া থাকে। বিশেষ করিয়া কীটনাশক ব্যবহারে অনেক কৃষক অপরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়া থাকেন। এই কীটনাশক হইল এমন এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ যাহা কীটপতঙ্গ মারিয়া ফেলিতে সহায়ক। ইহার প্রয়োগে পোকামাকড়ের ডিম ও লার্ভার বিনাশ ঘটে। কৃষিক্ষেত্রসহ চিকিত্সা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও গৃহস্থালি কর্মকাণ্ডেও ইহা প্রয়োগ করা হয়। বিংশ শতাব্দীতে কৃষির উত্পাদন বৃদ্ধিতে প্রধান নিয়ামক হিসাবে কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার ও প্রচলন দেখা যায়; কিন্তু এখন দেখা যাইতেছে, শাকসবজির সহিত কীটনাশক মিশ্রিত খাবার খাইয়া অনেক সময় মানুষ ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হইতেছে। ইহা জীববৈচিত্র্যের উপরও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতেছে। নদনদীর মত্স্য সম্পদসহ পশু-পাখির জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। এইজন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসমূহে কীটনাশকের ব্যবহার নিষিদ্ধ। তাই এখন কীটনাশকের বিকল্প ব্যবহার ও কীটনাশকমুক্ত শাকসবজির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রচার-প্রচারণা ও জনসচেতনতার মাধ্যমে ইহাই একদিন জেলা-উপজেলা পর্যন্ত জনপ্রিয় হইয়া উঠিতে পারে।
বিগত চার দশকে বাংলাদেশের বড়ো অর্জন হইল খাদ্য উত্পাদনে বিপ্লব সাধন। এই সময় খাদশস্যের উত্পাদন বাড়িয়াছে তিন গুণেরও বেশি। সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহার ও রাসায়নিক সার প্রয়োগের কারণে এই বিপ্লব ঘটানো সম্ভব হইয়াছে; কিন্তু এই বিপ্লব কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের জন্য যে ক্ষতির কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে, সেই ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হইতে হইবে। বিশেষ করিয়া খাদ্যশস্য ও শাকসবিজ উত্পাদনে মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার হইতে আমাদের বিরত থাকিতে হইবে। কৃষিতে ব্যবহার করিতে হইবে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জমিতে জৈব সার ব্যবহার করিতে হইবে। কীটনাশক ব্যবহারের বদলে প্রাকৃতিক উপায়ে বালাইয়ের বংশ নির্বংশ করিতে হইবে। কেননা উত্পাদিত শস্যে কীটনাশকের অস্তিত্ব কোনো না কোনোভাবে থাকিয়া যায়। এই ব্যাপারে জনগণের সচেতনতারও অভাব রহিয়াছে। কোনো শাকসবজি বা ফল-ফলাদিতে কোনো দাগ থাকিলে শহরের বাজারগুলিতে দাম একটু কম পাওয়া যায়। তাই ফ্যাশনেবল ভোক্তাদের জন্য উচ্চমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করিয়া থাকে কেহ কেহ। ভোক্তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন হওয়া দরকার। তবেই ‘কৃষকের বাজার’ ধারণা সম্প্রসারিত হইবে।
