চলচ্চিত্র শিল্পী ও কলাকুশলীদের সবচেয়ে আনন্দের দিন ছিল গতকাল। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে শিল্পীজীবনের সেরা স্বীকৃতি পাওয়ার এই দারুণ আনন্দ উপভোগের প্রতীক্ষায় ছিলেন তারা। টানা দুই বছরের সেরা স্বীকৃতি প্রদানের অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি শিল্পী এ টি এম শামসুজ্জামান অসুস্থ শরীর নিয়ে এসেছিলেন। অনুষ্ঠানে দুই ব্যক্তির সহায়তায় ধীর পায়ে হেঁটে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যাচ্ছিলেন, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের অনবদ্য মুহূর্ত সেই সময়টাতেই তৈরি হয়েছিল। এ টি এম শামসুজ্জামান ফোনে ইত্তেফাককে অনুভূতি জানাতে গিয়ে বলেন, ‘জীবনে আর সুযোগ হবে কি না, জানি না। শরীরের অবস্থা তো ভালো না। শুরুতেই আমাকে দেখে প্রধানমন্ত্রী আমার শারীরিক কুশলাদি জানতে চাইলেন। জীবনের হয়তো সর্বশেষ এই স্বীকৃতি বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত থেকে পেয়ে আমি ধন্য।’ উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেই শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এ টি এম শামসুজ্জামান।
২০১৭ সালের সেরা নায়ক হিসেবে পুরস্কার পান শাকিব খান ও আরেফিন শুভ। অনুভূতি জানাতে গিয়ে শাকিব খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে জীবনের সেরা স্বীকৃতি পাওয়াটা সব সময়ের জন্য আনন্দের। একই সঙ্গে আমি বলব, এটা আরো বেশি দায়িত্বশীল করে তোলে। তাই যতবারই সম্মাননা পাই না কেন, এই স্বীকৃতি পাওয়ার আকুলতায় ভালো কাজ করে যাওয়ার তাগিদ থাকবে আমার ভেতরে সব সময়।’
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল রবিবার ২০১৭ ও ২০১৮ সালের চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের ফাঁকে বিভিন্ন পরিবেশনায় অংশ নেন চলচ্চিত্র ও সংগীতাঙ্গনের তারকারা। অনুষ্ঠানে গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নেন অপু বিশ্বাস, মাহিয়া মাহি, নুসরাত ফারিয়া, তমা মির্জা, আঁচল প্রমুখ। অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন সামিনা চৌধুরী, নকীব খান, ইমরান, কনা, সাব্বির, লিজা প্রমুখ। দুটি দেশের গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করবেন ওয়ার্দা রিহাব।
পুরস্কার প্রদান শেষে প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব বিজয়ীকে অভিনন্দন জানান। তথ্যমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি তার বক্তব্যে দেশের চলচ্চিত্র তথা শিল্প-সংস্কৃতিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগ্রহ, ভালোবাসা ও অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ও গাজি সব মুক্তিযোদ্ধার প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চলচ্চিত্রের উন্নয়নে অনেক কিছু করেছি। আরো অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের সিনেমা দর্শক হারিয়েছে। কীভাবে দর্শককে আবারও হলে ফেরানো যায়, সেজন্য অনেক উদ্যোগ হাতে নিয়েছি আমরা। আমি নিজেও হল মালিকদের সঙ্গে বসেছি। আমার মনে হয় দর্শক ফেরাতে হলে সিনেমাকে ডিজিটালাইজড করতে হবে। বিশেষ করে দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়েও সিনেমা হল ডিজিটাল করতে হবে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। এখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। তাদের জন্য সময়োপযোগী বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।’
ব্যস্ততার কারণে সিনেমা দেখা হয় না বলে বক্তব্যে জানান প্রধানমন্ত্রী। তবে বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানে বসে দেশের সিনেমা দেখেন তিনি। দেশের সিনেমা তাকে মুগ্ধ করে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের নাটককে বিশ্বমানের বলে ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এর আগে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘চলচ্চিত্রের অনুদান বাড়ানো হয়েছে। এফডিসির জন্য ৩৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিল্পী কল্যাণ ফান্ড গঠন করা হচ্ছে, যা এখন প্রক্রিয়াধীন।’
এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করেন। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ২০১৭ সালের আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন এ টি এম শামসুজ্জামান ও সালমা বেগম সুজাতা এবং ২০১৮ সালের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন অভিনেতা প্রবীর মিত্র এবং এম এ আলমগীর।
অসুস্থ ছিলেন বরেণ্য অভিনেতা প্রবীর মিত্র। লাঠিতে ভর করেই মঞ্চে উঠে নিলেন সম্মাননা। দুই অগ্রজ অভিনেতার পুরস্কার নেওয়ার মুহূর্তে পুরো হলে থাকা সকল শিল্পী-কলাকুশলী দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান তাদের। এরপর একে একে পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এবার গত দুই বছরের ২৮টি শাখায় ৬১ জনকে পুরস্কৃত করা হয়। দুই বছরের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘ঢাকা অ্যাটাক’ (২০১৭) ও ‘পুত্র’ (২০১৮)। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা যৌথভাবে শাকিব খান (সত্তা, ২০১৭) ও আরিফিন শুভ (ঢাকা অ্যাটাক, ২০১৭)। অন্য বছরের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ফেরদৌস (পুত্র, ২০১৮) ও সাইমন (জান্নাত, ২০১৮)। ২০১৭ সালের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা (হালদা) ও ২০১৮ সালের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হয়েছেন জয়া আহসান (দেবী)।
২০১৭ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তালিকা: আজীবন সম্মাননা:এটিএম শামসুজ্জামান ও সালমা বেগম সুজাতা, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র: ঢাকা অ্যাটাক (কায়সার আহমেদ ও সানী সানোয়ার), শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র: বিশ্ব আঙিনায় অমর একুশে (বাংলাদেশ টেলিভিশন), শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক: বদরুল আনাম সৌদ (গহীন বালুচর), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা প্রধান চরিত্র: শাকিব খান (সত্তা) ও আরিফিন শুভ (ঢাকা অ্যাটাক), শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী প্রধান চরিত্র: নুসরাত ইমরোজ তিশা (হালদা), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পার্শ্ব-চরিত্র: মো. শাহাদাত্ হোসেন (গহীন বালুচর), শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পার্শ্ব-চরিত্র: সুবর্ণা মুস্তাফা (গহীন বালুচর) ও রুনা খান (হালদা), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা খল-চরিত্র: জাহিদ হাসান (হালদা), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা কৌতুক চরিত্র:এম ফজলুর রহমান বাবু (গহীন বালুচর), শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী: নাইমুর রহমান আপন (ছিটকিনি), শিশুশিল্পী শাখায় বিশেষ পুরস্কার: অনন্য সামায়েল (আঁখি ও তার বন্ধুরা), শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক: এম ফরিদ আহমেদ হাজরা (তুমি রবে নীরবে), শ্রেষ্ঠ নৃত্য পরিচালক: ইভান শাহরিয়ার সোহাগ, (ধ্যাততেরিকি), শ্রেষ্ঠ গায়ক: মাহফুজ আনাম জেমস (গান:তোর প্রেমেতে অন্ধ হলাম, চলচ্চিত্র:সত্তা), শ্রেষ্ঠ গায়িকা: মমতাজ বেগম (গান: না জানি কোন অপরাধে, চলচ্চিত্র: সত্তা), শ্রেষ্ঠ গীতিকার: সেজুল হোসেন (গান: না জানি কোন অপরাধে, চলচ্চিত্র:সত্তা), শ্রেষ্ঠ সুরকার: শুভাশীষ মজুমদার বাপ্পা (গান: না জানি কোন অপরাধে, চলচ্চিত্র:সত্তা), শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার: আজাদ বুলবুল (হালদা), শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার: তৌকীর আহমেদ (হালদা), শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা: বদরুল আনাম সৌদ (গহীন বালুচর), শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশক: উত্তম কুমার গুহ (গহীন বালুচর), শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক: কমল চন্দ্র দাস (গহীন বালুচর), শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক: রিপন নাথ (ঢাকা অ্যাটাক), শ্রেষ্ঠ পোশাক ও সাজসজ্জা: রিটা হোসেন (তুমি রবে নীরবে), শ্রেষ্ঠ মেকআপ আর্টিস্ট: মো. জাভেদ মিয়া (ঢাকা অ্যাটাক)।
২০১৮ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তালিকা:আজীবন সম্মাননা: অভিনেতা প্রবীর মিত্র ও এম এ আলমগীর, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র: পুত্র (চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর), শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র:গল্প সংক্ষেপ (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট), শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক: মোস্তাফিজুর রহমান মানিক, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা প্রধান চরিত্র: ফেরদৌস আহমেদ (পুত্র) ও সাইমন সাদিক (জান্নাত), শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী প্রধান চরিত্র: জয়া আহসান (দেবী), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পার্শ্ব-চরিত্র: আলীরাজ (জান্নাত), শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পার্শ্ব-চরিত্র: সুচরিতা (মেঘকন্যা), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা খল-চরিত্র: সাদেক বাচ্চু (একটি সিনেমার গল্প), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা কৌতুক চরিত্র:মোশাররফ করিম (কমলা রকেট) ও আফজাল শরীফ (পবিত্র ভালোবাসা), শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী: ফাহিম মুহতাসিম লাজিম (পুত্র), শিশুশিল্পী শাখায় বিশেষ পুরস্কার: মাহমুদুর রহমান (মাটির প্রজার দেশে), শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক: ইমন সাহা (জান্নাত), শ্রেষ্ঠ নৃত্য পরিচালক: মাসুম বাবুল (একটি সিনেমার গল্প), শ্রেষ্ঠ গায়ক: নাইমুল ইসলাম রাতুল (গান: যদি দুঃখ ছুঁয়ে, চলচ্চিত্র: পুত্র), শ্রেষ্ঠ গায়িকা: সাবিনা ইয়াসমিন (গান: ভুলে মান অভিমান, চলচ্চিত্র: পুত্র) ও আঁখি আলমগীর (গান: গল্প কথার ওই, চলচ্চিত্র:একটি সিনেমার গল্প), শ্রেষ্ঠ গীতিকার: কবির বকুল (গান: যদি এভাবেই ভালোবাসা, চলচ্চিত্র: নায়ক) ও জুলফিকার রাসেল (গান: যদি দুঃখ ছুঁয়ে দেখো, চলচ্চিত্র: পুত্র), শ্রেষ্ঠ সুরকার: রুনা লায়লা (গান: গল্প কথার ওই, চলচ্চিত্র: একটি সিনেমার গল্প), শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার: সুদীপ্ত সাঈদ খান (জান্নাত), শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার: সাইফুল ইসলাম মান্নু (পুত্র), শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা: এস এম হারুন-অর-রশীদ (পুত্র), শ্রেষ্ঠ সম্পাদক: তারিক হোসেন বিদ্যুত্ (পুত্র), শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশক: উত্তম কুমার গুহ (একটি সিনেমার গল্প), শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক: জেড এইচ মিন্টু (পোস্ট মাস্টার ৭১)।
