নেপালে সাউথ এশিয়ান (এসএ) গেমসের ১৩তম আসর শুরু হইয়াছিল পহেলা ডিসেম্বর। ২৬টি ডিসিপ্লিনে মোট ৩১৭টি স্বর্ণপদকের জন্য লড়াই করিতেছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার প্রতিযোগীরা। সর্বশেষ পদক তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশ মোট আটটি স্বর্ণসহ ১০২টি পদক জিতিয়াছে। বৃহত্ দেশ হিসাবে ২৫২টি পদক পাইয়া ভারত রহিয়াছে শীর্ষে। ইহার পর স্বাগতিক নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান পাইয়াছে যথাক্রমে ১৬৫, ১৯৭ ও ১১০টি পদক। বাংলাদেশের নিচে ভুটান ও মালদ্বীপ যথাক্রমে পদক পাইয়াছে ৯ ও তিনটি। এই পদকপ্রাপ্তির তালিকা হইতে স্পষ্টই অনুধাবন করা যায় যে, শীর্ষ পাঁচটি অন্য দেশেসমূহের মধ্যে চলিতেছে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা। আর ইহার মধ্যেই বাংলাদেশের মেয়েরা ঘটাইয়া ফেলিয়াছে নীরব বিপ্লব। যখন প্রান্তিক পর্যায়ের একজন নারী সকল বাধা টপকাইয়া স্বর্ণ জিতেন এবং এই অর্জনের পূর্বে ঐ স্বর্ণজয়ীর বাবাকে যখন প্রতিনিয়ত শুনিতে হইত—‘আপনার মেয়ে কেন এত রাত করে বাড়ি ফেরে?’, তখন ইহাকে খুব সাধারণ বলিয়া অভিহিত করিবার সুযোগ নাই। এমনটি আমরা দেখিতে পাইয়াছিলাম আমীর খান অভিনীত দঙ্গল ছবিতে, যাহা ছিল বাস্তব ঘটনার উপর নির্মিত। একইভাবে আমরা দেখিতে পাই, এসএ গেমসে মেয়েদের অনূর্ধ্ব ৫৫ কেজি ওজনশ্রেণি ক্যারাটে কুমিতে স্বর্ণপদক জয়ী মারজান আক্তার প্রিয়ার অসম্ভবকে সম্ভব করিবার কাহিনি।
আমাদের দেশের বাবা-মায়ের সাধারণ স্বপ্ন হইল, তাহাদের কন্যা খুব বেশি হইলে পড়াশোনায় ভালো হইবে, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হইবে; কিন্তু মেধাবী ছাত্রীরা খেলাধুলায় আসিতে চাহিলে তাহাদের পথে বিছানো থাকে লক্ষ-কোটি কাঁটা; কিন্তু প্রিয়া সেই ‘সকল কাঁটা ধন্য করিয়া’ অর্জন করিয়াছেন স্বর্ণপদক। প্রিয়ার পাশাপাশি এসএ গেমস নারী ক্রিকেটাররা ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে হারাইয়া স্বর্ণ জিতিয়াছেন। একই সঙ্গে প্রথম নারী হিসাবে তিনটি সোনা জিতিয়া নূতন ইতিহাস গড়িয়াছেন ইতি খাতুন। রিকার্ভে মেয়েদের দলগত ও মিশ্র দলগত ইভেন্টে সোনা জিতিয়াছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এসএ গেমসের ৩৫ বত্সরের ইতিহাসে ইহার পূর্বে কোনো নারী খেলোয়াড় একই গেমসে তিনটি সোনা জিতিতে পারেন নাই। পোখারার অন্নপূর্ণার কোলে দাঁড়াইয়া সেই ইতিহাসই গড়িলেন ইতি। অথচ ইতির পিতা একজন সাধারণ হোটেলের কর্মচারী। অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা হইল, এসএ গেমসের আর্চারির সকল কয়টিতেই পদক জিতিয়াছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের ফুটবল হইতে শুরু করিয়া ক্রিকেট, ক্যারাটে—সকল ক্ষেত্রেই প্রান্তিক পর্যায়ের মেয়েরা অভাবিত সাফল্য অর্জন করিতেছে। সুতরাং আমরা যদি এই সোনার মেয়েদের জন্য উপযুক্ত হইয়া উঠিবার জন্য প্রয়োজনীয় ক্রীড়া প্রশিক্ষণের অবকাঠামো গড়িয়া তুলিতে পারি, তাহা হইলে পদক তালিকায় যে আরো অনেক বেশি স্বর্ণের ফলন ঘটিবে, তাহাতে সন্দেহ নাই। আশার কথা হইল—দেশ জুড়িয়া জেলা পর্যায়ে ক্রীড়া কমপ্লেক্স তৈরি হইতেছে। বিকেএসপির আদলে মেয়েদের জন্যও একটি বড়ো প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলা যাইতে পারে, যেইখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি সম্ভাবনাময় নারী খেলোয়াড়দের খেলাধুলাকেও প্রাধান্য দেওয়া হইবে। ইহাও গুরুত্বপূর্ণ যে, দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে খেলার সহিত তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত রাখিতে পারিলে তাহা উন্নত সমাজ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখিবে।
