শামীমা সুলতানা
বিশ্বের সব দেশে প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর পালিত হয় মানবাধিকার দিবস। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের উদ্যোগে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সর্বসম্মতিক্রমে সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ গৃহীত হয়। ১৯৫০ সালের এই দিনটিকে জাতিসংঘ বিশ্ব মানবাধিকার দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। সেই থেকে বিশ্বজুড়ে এ দিনটি পালিত হচ্ছে। এ ছাড়াও ‘সার্বজনীন মানব অধিকার সংক্রান্ত ঘোষণাকে’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ তারিখকে নির্ধারণ করা হয়। সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ছিল ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী নবরূপে সৃষ্ট জাতিসংঘের অন্যতম বৃহত্ অর্জন।
বাংলাদেশের সংবিধানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সব মানবাধিকার ও সুশাসনের নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে। সর্বস্তরে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯ প্রণয়ন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে আইনের দৃষ্টিতে সবার সমঅধিকারের (অনুচ্ছেদ-২৭) এবং ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে সবার আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে (অনুচ্ছেদ-৩১ এবং ৩৩)। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিসমূহে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, সুযোগের সমতা ও কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের কর্মের অধিকার লাভের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশে মানবাধিকারের সমর্থকদের কাজের অন্যতম প্রধান মূলনীতি হচ্ছে অধিকারের অবিভাজ্য বা অবিচ্ছেদ্য প্রয়োগ নিশ্চিত করা। নারীর অধিকার মানবাধিকারের একটি স্বীকৃত অধিকার হিসেবে বহুলাংশে গৃহীত হয়েছে। বর্তমানে মানবাধিকার কর্মীরা মানবাধিকারের আওতাধীন বিষয়বস্তুও আরো প্রসারিত করে যৌনকর্মী এবং যৌন ও লিঙ্গগত সংখ্যালঘুদের অধিকার মানবাধিকার কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।
৪ ডিসেম্বর, ১৯৫০ সালে জাতিসংঘ ৩১৭তম পূর্ণ অধিবেশনে ৪২৩ (৫) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সদস্যভুক্ত দেশসহ আগ্রহী সংস্থাগুলোকে দিনটি তাদের মতো করে উদ্যাপনের আহ্বান জানানো হয়। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৩০টি অনুচ্ছেদে মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা, মানুষের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার ঘোষণা রয়েছে। বলা হয়েছে, বন্ধনহীন অবস্থায় এবং সমমর্যাদা ও অধিকারাদি নিয়ে সব মানুষই জন্মগ্রহণ করে। বুদ্ধি ও বিবেক তাদের অর্পণ করা হয়েছে; অতএব ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব নিয়ে তাদের একে অন্যের প্রতি আচরণ করা উচিত। প্রত্যেকেরই জীবন ধারণ, স্বাধীনতা ও ব্যক্তি নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। কাউকে নির্যাতন অথবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক অথবা অবমাননাকর আচরণ অথবা শাস্তি ভোগে বাধ্য করা চলবে না। আইনের সমক্ষে প্রত্যেকেরই সর্বত্র ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভের অধিকার রয়েছে। আইনের কাছে সবাই সমান এবং কোনো রূপ বৈষম্য ব্যতিরেকে সবারই আইনের দ্বারা সমভাবে রক্ষিত হওয়ার অধিকার রয়েছে।
মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে সভা-সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন ধরনের তথ্যচিত্র কিংবা চলচ্চিত্র প্রদর্শনী প্রধানত এ দিনের সাধারণ ঘটনা। ঐতিহ্যগতভাবে ১০ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ‘জাতিসংঘের মানব অধিকার ক্ষেত্র পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। এ ছাড়া নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান কার্যক্রমও এ দিনেই হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষার কাজে নিয়োজিত বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরো কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য সরকারের নির্দেশনা রয়েছে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার আন্দোলন মূলত বিশ শতকের আশির দশকে স্থানীয় কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এই কাঠামো গড়ে উঠেছিল অনেকটা তত্কালীন বিশ্ব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে, বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি পরবর্তী মুক্তবাজার অর্থনীতির উত্থানের মধ্য দিয়ে। সাধারণভাবে বলা যায়, এনজিওসমূহের উত্থান, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কসমূহের কার্যক্রম এবং বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া দেশে মানবাধিকার আলোচনাকে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
১০ ডিসেম্বর সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানবাধিকার দিবসটি পালন করা হয়। এ উপলক্ষ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
n লেখক :প্রাবন্ধিক ও গবেষক
