আমার জীবন আমার সংগীত

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:২১

আজাদ রহমান বাংলা সংগীতের প্রবাদতুল্য পুরুষ। তাঁর আত্মজৈবনিক ধারাবাহিক রচনাটির প্রথম পর্ব ইত্তেফাক সাময়িকীতে প্রকাশিত হলো

আমার মায়ের কাছে বারবার জানতে চাইতাম, ‘মা আমি কখন থেকে গান গাই?’ তিনি বলতেন যখন থেকে আমি মুখ দিয়ে শব্দ উচ্চারণ করতে শুরু করেছি তখন থেকেই নাকি তা সুরে সুরে উচ্চারণ করতাম। তিনি মাতৃস্নেহে এ কথা বলেছেন কি না তা আজ জানার কোনো উপায় নেই। কারণ তিনি এবং আমার বাবা দুজনেই আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য না-ফেরার দেশে চলে গেছেন। তবে তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকা কয়েকটি কথা বলতে চাই। আমার বাবা অত্যন্ত নিষ্ঠা নিয়ে সংস্কৃতিচর্চা করতেন। আমার জন্মের বহু পূর্বেই আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে মুচি সম্প্রদায়ের একটি পরিবারকে তিন বিঘা চাষের জমি দেওয়া হয়েছিল একটি শর্তে, তাঁরা বংশ পরম্পরায় আমাদের গ্রামে এসে মহরমের সময় ঢোল বাজাবেন। বাজনার তালে তালে  গ্রামের শিশু-কিশোর-যুবকরা লাঠিখেলা এবং শারীরিক কসরত অভ্যাস করে—এই ব্যবস্থা আজো চলছে। আমার বয়স যখন তিন-চার বছর, সেই সময়েই গুয়ে মুচি নামে মধ্য বয়স্ক একজন গুণী ঢোল-বাদক আমাদের গ্রামে এসে মহরমের কয়েকদিন সন্ধ্যায় বিভিন্ন তালে আকর্ষণীয় বোল সহযোগে ঢোল বাজাতেন, তাঁর বাড়ি আমাদের গ্রাম থেকে একটু দূরে হওয়ার কারণে প্রতিদিনই ঢোলটি আমাদের বাড়ির বৈঠকখানায় রেখে যেতেন। আমার বাবা বাড়ির বাইরে গেলেই আমি ঐ ঢোলটি বাজাতে শুরু করতাম, এভাবে সেই বয়সেই আমি একজন তুখোর বাংলাঢোল বাদক হয়ে গেলাম। এজন্য আমাকে অনেক মার খেতে হয়েছে। আমার বাবা বিষয়টি জানতে পেরে আমাকে নির্মমভাবে বাঁশের লম্বা ছড়ি দিয়ে ‘এই ছেলেটা গুয়ে মুচি হবে’ বলতে বলতে প্রহার করেছিলেন। পিঠের চামড়া উঠে যাওয়ার কারণে আমার মা কলাপাতা বিছিয়ে আমাকে শুইয়ে রাখেন। আমার স্মৃতিতে সেই ঘটনা উজ্জ্বল হয়ে আছে। এই বাংলাঢোল বাজনা বাজিয়ে মার খাওয়া থেকেই আমার তাল বিদ্যা আয়ত্ত হয়।

তবে আমার বাবা প্রতিদিন সন্ধ্যায় বৈঠকখানায় লেটো কিংবা যাত্রার মহড়ার জন্য হারমোনিয়াম নিয়ে বসতেন। আমাদের গ্রাম ছাড়াও আশপাশের গ্রামের অনুরাগী মানুষ তা উপভোগ করতেন। আমি সেই সময়ে ছোটোদের ভূমিকায় অভিনয় করেছি, পায়ে নূপুর বেঁধে নেচেছি, যাত্রা-লেটোতে গানও গেয়েছি। ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, ঠুমরি, লেটো-গান, যাত্রা-গান, শ্রী কৃষ্ণ কীর্তন, সত্যপীরের গান, মারফতি, মুর্শিদি, কাওয়ালি, শ্যামা সংগীত শুনতে শুনতে, গাইতে গাইতে আমার শৈশব-কৈশোর পার হয়েছে। আর এইসব কারণেই আমি ছোটো বয়সেই বড়ো ওস্তাদ হয়ে গিয়েছিলাম! বিবেকের গান আমাকে বেশ আকর্ষণ করত। পরবর্তী জীবনে আমার সুর করা আমার গাওয়া ‘ডুমুরের ফুল’ চলচ্চিত্রে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ‘করো মন ভক্তি মায়ে থাকতে হাতে দিন’ গানটিতে বিবেকের গানের ছাপ পড়েছে। এই সবই আমাকে আজকের আমিতে টেনে নিয়ে এসেছে। এখন আমি সার্বক্ষণিকভাবে ‘বাংলা খেয়াল’ শিরোনামে বাংলা ধ্রুপদ, বাংলা খেয়াল, বাংলা লঘু উচ্চাঙ্গ সংগীত রচনা করছি, শেখাচ্ছি, প্রচারে সহায়তা করছি।

দেশ-বিদেশের যে সব প্রবীণ-নবীন শিল্পী এই কর্মধারায় অংশ নিচ্ছেন, তাঁদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমার বাংলা খেয়াল নিয়ে দু-একটি বিষয়ে বলব।

আমার বাংলা খেয়াল, বাংলা ধ্রুপদ, বাংলা ধামার এবং আমার রচিত লঘু উচ্চাঙ্গ সংগীত, অন্যান্য গান নিয়ে পর্যালোচনা করলে নিশ্চয়ই অনুরাগীদের নজরে পড়বে আমি যে দেশে বাস করি সে দেশের ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধে এই ভূখণ্ডের সকল মানুষ একাত্ম হয়ে যে লক্ষ্যে ধাবিত হয়েছেন সেই চেতনা, সেই আদর্শ, সেই ভাব আমার বাণী রচনার মধ্যে আছে। দেশ মাটি নিয়ে মানুষের আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্নের প্রতিফলন রয়েছে আমার গানে। আমার বন্দেশ রচনায় সব ধর্মের ভালোত্ব, মানবতার জয়গান আমার গানের গভীরতা এনে দিয়েছে। দেশ-বিদেশে আমার গানগুলো যখন গাইতাম বা কাউকে শিখিয়ে গাওয়াতাম বা এখনো গাওয়াচ্ছি, সব পরিবেশনাতেই সচেতন দর্শক-শ্রোতা উল্লিখিত গভীর উপলব্ধির কথা জানান। আমরা হঠাত্ করে অতি ব্যস্ত হয়ে গেছি। এই ব্যস্ততা নিয়ে কোথায় যাব? কী আমাদের লক্ষ্য? এ নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি দেখা দিচ্ছে।

কিন্তু আমাদের জাতীয় চেতনা, ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল যা বাংলাদেশের তত্কালীন পূর্ব বাংলার সকল মানুষ একাত্ম হয়ে, একসঙ্গে পথে নেমে যে কারণে সংগ্রাম করেছিলেন তা সবই গভীর অনুভূতির ফসল। সেই গভীর অনুভূতি উজ্জ্বলভাবে প্রকাশিত আমার বাংলা খেয়ালের ভাব এবং গীতিকবিতায়। বোল বাণী রচনার বিষয়ে এসব কথা বলা যায়।

উচ্চাঙ্গ সংগীতের বন্দেশ রচনার ক্ষেত্রে বন্দেশের সুর রচনা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আমি বন্দেশের সুরকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছি। পাশাপাশি বন্দেশের বাণীতে রাগের সুর সমন্বয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবের মাধ্যমে আমাদের দেশ, আমাদের মাটি, আমাদের আদর্শ, আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলায় প্রকাশ করার বিষয়ে সচেষ্ট রয়েছি। সেইজন্যই আমার বাংলা বন্দেশ বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল বাংলাভাষী এবং বাংলাদেশবাসীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আমার বন্দেশ রচনায় সুর রচনা পর্যালোচনা করার আগে সংগীতের আরো কিছু বিষয় আমার ভাবনায় ছিল।

সংগীত আন্তর্জাতিক ভাষা হলেও দেশভেদে, অঞ্চলভেদে মানুষের খাদ্যাভাস চাল-চলন আচার-ব্যবহার যেমন বদলে যায় এবং ভিন্ন ভিন্ন রূপ প্রকাশ পায়, একইভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে সংগীতের নানান রূপ পরিলক্ষিত হয়। আমাদের এই উপমহাদেশের প্রচলিত উচ্চাঙ্গ সংগীত বা রাগ সংগীতের রাগ-রাগিণী এক হলেও বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষায় সংগীতের নিজস্ব অবয়ব তৈরি হয়ে গেছে। মারাঠি খেয়াল গায়কদের গায়ন-বৈশিষ্ট্য পশ্চিম বাংলা কিংবা বাংলাদেশের শিল্পীদের গায়ন-ভঙ্গির সঙ্গে পার্থক্য রয়েছে। যেমন পশ্চিম বাংলা এবং বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় প্রচলন থাকলেও দুই দেশের ভাষা, শব্দ উচ্চারণ, প্রকাশভঙ্গি ভিন্নভাবে চেনা যায়। আধুনিক এবং অন্যান্য গানেও সেই ভিন্নতা শ্রোতারা বুঝতে পারেন। তবে কিছু কিছু গান নকল হচ্ছে এবং দু-একজন শিল্পীর গায়ন-ভঙ্গি অনুকরণ করতে গিয়ে অনেক শিল্পীর নিজস্ব রূপ বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হচ্ছে না।

বহু আগে থেকেই বাংলা ভাষায় যে সব গান গাওয়া হতো সেই সব গান নিজস্ব রূপ-বৈচিত্র্যে উজ্জ্বল। এমনকি রাগ সংগীতের প্রভাবে যে সব গান রূপায়িত হয়েছিল সে সব গানও বাংলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অলংকৃত। বাংলায় প্রচলিত গান, যন্ত্রসংগীত এবং সংগীত রচয়িতাদের সৃষ্টি, প্রাচীনকাল থেকে বাংলাভাষী এ অঞ্চলের সংগীতের ক্রমবিকাশ পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয়, বাংলা ভাষায় প্রচলিত বিশাল সংগীত ভাণ্ডারের সব গানই নিজ বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা নিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের সম্মুখে ভিন্ন ভিন্ন রূপে দৃশ্যমান। বাংলাভাষী দর্শক-শ্রোতাদের কাছে সব সংগীতধারার রূপ আজ সুস্পষ্টরূপে পরিচিত। রাগপ্রধান বাংলা টপ্পা, আমার বাংলা খেয়াল, জারিগান, ভাওয়াইয়া, পূর্ব বাংলার ভাটিয়ালি, পশ্চিম বাংলার ভাটিয়ালি, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান, সিলেটের আঞ্চলিক গান, শ্যামা সংগীত, ভজন, বাংলাদেশের বাউল, পশ্চিম বাংলার বাউল, কীর্তন, বাংলাদেশের আধুনিক গান, পশ্চিম বাংলার আধুনিক গান সব গানই নিজস্ব রূপে প্রকাশিত, নিজ নিজ ভিন্ন ভিন্ন রং-রূপ-সৌরভে আকর্ষণীয়। কিছু শিল্পী, শিক্ষকের অসচেতনতায় কিংবা না জানায় কিংবা হালকা বিনোদন প্রকাশের উচ্ছৃঙ্খলায় আমাদের

ঐতিহ্যবাহী গানের ধারা সম্পর্কে মানুষের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে করণীয় কাজ আমাদের সকলে মিলেই করতে হবে।

আলোচিত বিষয়সমূহ বিবেচনায় নিয়ে প্রচলিত অন্যান্য রাগপ্রধান, রাগাশ্রয়ী বাংলা গানের সঙ্গে পার্থক্য বজায় রেখে আমি আমার বাংলা খেয়াল, বাংলা ধ্রুপদ, বাংলা লঘু উচ্চাঙ্গ সংগীত সুর-বাণী রচনায় সর্বদা সজাগ থাকতে চেষ্টা করেছি। আমার বন্দেশ রচনায় আমি এই উপমহাদেশের প্রচলিত উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রতি যেমন সচেতন থেকেছি, রাগ-রাগিণীর শুদ্ধতার প্রতিও নিয়মনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করেছি। আবার আঞ্চলিকতার বিষয়টি আমাকে আগ্রহী করেছে। আমার রং-রূপকে আমি আপন মনে করে আমার দেশ-মাটি স্বকীয়তাকে উচ্চাঙ্গ সংগীতের পরিশীলিত বিশালতায় মিলিয়ে মিশিয়ে ব্যবহার করেছি। বিশ্বের বহু দেশে, অবিভক্ত ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ গুণীদের সম্মুখে আমার বাংলা খেয়াল উপস্থাপন করেছি। সব জ্ঞানী গুণী পণ্ডিত এবং শিল্পী এই বন্দেশের বাণী রচনা এবং সুর রচনার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই উপমহাদেশের উচ্চাঙ্গ সংগীত বা রাগ সংগীত নিয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা গ্রহণ করছেন। নানান বিষয়ে জানতে তাঁরা অনেকে আমার কাছে আসেন। বিএ, এমএ এবং উচ্চ পর্যায়ে যাঁরা গবেষণায় আগ্রহী তাঁদের প্রচণ্ড আগ্রহ রয়েছে, বাংলা ভাষায় উচ্চাঙ্গ সংগীত, বাংলা ধ্রুপদ, বাংলা খেয়াল, রাগপ্রধান, রাগাশ্রয়ী গানের পার্থক্য জানার জন্য।

আমার বাংলা খেয়াল, বাংলা ধ্রুপদ, বাংলা ধামার, লঘু উচ্চাঙ্গ সংগীত, প্রচলিত ধ্রুপদ-খেয়াল, বাংলা ‘রাগপ্রধান’ গান, বাংলা রাগাশ্রয়ী গান বাংলা ভাষায় বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত গানের রূপ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে চান তাঁরা, জানতে চান এই উপমহাদেশের বিভিন্ন সংগীতধারার গানের স্টাইলের পার্থক্য।

এক আঙ্গিকের সঙ্গে অন্য আঙ্গিকের মিল বা অমিল প্রসঙ্গে অনুরাগী শ্রোতারাও জানতে আগ্রহী। অধিকাংশ উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী আগ্রহ সহকারে আমার বাংলায় এই উচ্চাঙ্গ সংগীত বেতার, টেলিভিশন এবং মঞ্চে গাইছেন। দেশে-বিদেশে বহু আগ্রহীজন এগিয়ে আসছেন। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে বাংলা ভাষায় এই উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সংগীত সম্পদ বাংলা রাগ সংগীত।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদে রাগের উল্লেখ আছে। তাতে সেই সময়ের সংগীত কর্মীদের দৃষ্টিতে রাগ-সংগীতের গুরুত্বের বিষয়টি বোঝা যায়। তবে প্রাপ্ত এই পদগুলির সঙ্গে সুর-কাঠামো কিংবা স্বরলিপি না থাকায় উল্লিখিত রাগ এবং পদের সংগীতের রূপ উদ্ধার করা সম্ভব নয়। উল্লিখিত নিয়মবদ্ধ রাগ-রাগিণীর সঠিক ব্যবহার নিয়ে কিংবা উচ্চাঙ্গ সংগীতের আঙ্গিকে শুদ্ধতা অশুদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে গেছে।

বাংলা ভাষায় যে প্রাচীন বাংলা গানগুলো আমরা সুরসহ গত দেড়শো বছর ধরে শুনে আসছি, যদিও সব গানের স্বরলিপি পাওয়া যাবে না শুধুমাত্র সংগীত শিক্ষার্থী এবং অনুরাগী পরম্পরায় যা প্রচলিত রয়েছে তার থেকে একটি বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা যায়, তা হচ্ছে বাংলা ভাষায় প্রচলিত প্রায় সব ধরনের গানেই রাগ সংগীতের প্রভাব রয়েছে। প্রাচীন বাংলা গান পর্যালোচনা করলে এই সত্য সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

পঞ্চকবির গানসহ যাত্রা, লেটো, রামপ্রসাদি, কীর্তন, শ্যামা সংগীত, কৃষ্ণযাত্রা, সত্যপীর, মারফতি, মুর্শিদি, হামদ-নাত, ইসলামি গান বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় সংগীত বাউল এমনকি বাংলাভাষী অঞ্চলের নানান ধারার সংগীতে রাগ-রাগিণীর সুরের আভাস এবং উচ্চাঙ্গ সংগীতের গায়কীর ছায়ার আভাস পাওয়া যায়। আমি মনে করি সংগীতের ক্ষেত্রে বাংলাভাষী অঞ্চলের বাঙালিদের নিজস্বতা প্রকাশের ক্ষেত্রে শ্রী চৈতন্যদেব এই অঞ্চলের মানুষকে প্রথম নাড়া দিয়ে জাগিয়ে তুলেছিলেন। আমাদের স্বকীয়তা, আঞ্চলিকতা, নিজস্বতা কীর্তন গানে যেভাবে তত্কালে নব সৌরভে প্রকাশিত হয়েছিল তা মাইলফলকের মতো। সেই গানের তালের ঢং-সুরের আদল সবই ভিন্ন। প্রেম-অনুরাগের নিবেদিত ভাব তাও অসাধারণ। বিশেষভাবে বলা যায় প্রচলিত উচ্চাঙ্গ সংগীত, লোকসংগীত এবং অন্যান্য সংগীতের সঙ্গে বিশাল পার্থক্য। ভিন্ন অবয়বে নিজ রূপ নিয়ে প্রকাশিত এই সংগীতধারা নিয়ে তেমন করে কেন সংগীত গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়নি তা চিন্তার বিষয়। তবে আশা রাখি নতুন প্রজন্মের সংগীত শিক্ষার্থীরা, গবেষকরা এ নিয়ে নিশ্চয়ই কাজ করবেন। 

আমি নিজে কীর্তন শিখতাম শৈশবে কীর্তনিয়াদের কাছে, গান শিখেছি বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের আসরে বসে তাদের সঙ্গে মিলেমিশে গান শুনেছি। তাই আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে বাংলা সংগীতের ক্ষেত্রে কীর্তন গানের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা স্বীকার করি। শুধু সংগীত নয় বাঙালির নিজস্ব জীবনবোধ, স্বকীয়তা প্রকাশ করার আকাঙ্ক্ষা, ভাষার প্রতি আগ্রহ, মানুষের প্রতি মায়া-মমতা, প্রেম-ভালোবাসার স্বর্গীয় অনুভব সবকিছুতেই কীর্তনের প্রভাব বিদ্যমান। এ বিষয় নিয়ে নিষ্ঠা সহকারে তথ্য খুঁজে আলাপ-আলোচনায় এর সৌরভগাথা প্রকাশ করা দরকার।

ভাষা এবং সংগীত নিয়ে অনেকে উচ্চ পর্যায়ে শিক্ষা গ্রহণ করছেন। তাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গবেষকেরা এই বিষয়ে ভাবলে আমাদের ভাষা-সংগীতের নিজস্ব শিকড় খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।

এখন আমি ‘বাংলা খেয়াল’ নাম দিয়ে এই উপমহাদেশের যুগ যুগ ধরে প্রচলিত ধ্রুপদ এবং খেয়ালের অনুরূপ বাংলায় ধ্রুপদ রচনা এবং খেয়ালের বাণী-বন্দেশ বানাচ্ছি, শেখাচ্ছি এবং তা প্রচার হচ্ছে। সারা বছর অনুরাগীদের নিয়ে বাংলা উচ্চাঙ্গ সংগীত, বাংলা ধ্রুপদ, বাংলা খেয়াল এবং বাংলা লঘু উচ্চাঙ্গ সংগীত শেখানোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘সংস্কৃতি কেন্দ্র’ (সেন্টার ফর এডুকেশন ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস) এ নিয়ে কাজ করছে। মঞ্চভিত্তিক বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বেতার, টেলিভিশন বিভিন্ন মাধ্যমে তা প্রচারিত হচ্ছে। আমি সার্বক্ষণিকভাবে এই নিয়েই কাজ করছি। আমাদের সব থেকে বড়ো পাওয়া, প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারি সন্ধ্যা থেকে ১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা পর্যন্ত ‘বাংলা খেয়াল উত্সব’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রায় ১৫ ঘণ্টাব্যাপী এই অনুষ্ঠান সরাসরি দেশ-বিদেশের মানুষ দেখতে পারছে বাংলাদেশের জনপ্রিয় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল আইতে।

শৈশব থেকেই সুরের উপর বাংলা বাণী বসিয়ে গাইবার চেষ্টা করলে সবাই ‘হবে না হবে না’ বলে থামিয়ে দিতেন। তবে থেমে না গিয়ে ১৯৫৮ সাল থেকেই আমি ব্যক্তিগতভাবে গানগুলি নিজস্ব পরিমণ্ডলে এবং সুযোগমতো দেশে-বিদেশে উপস্থাপন করেছি। বাংলায় উচ্চাঙ্গ সংগীত ধারাবাহিকভাবে প্রচারের জন্য আমি এবং আমার শিষ্য-অনুরাগীরা একাত্ম হয়ে কাজ করছি। আমার বাংলা খেয়াল অনুরাগী নিবেদিতপ্রাণ দেশ-বিদেশের বহু শিল্পী আমার সঙ্গে রয়েছেন, তাদের কাছেও আমার অশেষ ঋণ স্বীকার করছি।

 

চলবে