মোজাম্মেল বৃত্তান্ত

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:২৬

কতই বা বয়স তখন। তেইশ চব্বিশ হবে। হঠাত্ই সুযোগ মিলে গেল। ইন্টারমিডিয়েট পাস করেই লন্ডন। মোজাম্মেলের মতো এমন ভাগ্য ক’জনের হয়! শুধু টোফেল স্কোর করলেই হলো। বাদবাকি কাজ মামার। গাঁয়ের লোক তো কোন ছার, খোদ শিক্ষিতরাও এসব বিষয়ে জ্ঞান রাখত না। টোফেল তো আর পাবলিক পরীক্ষা নয় যে,  কোনোমতে যা তা পড়ে বাড়ির ভাত খেয়ে পরীক্ষা দেওয়া যাবে। মোজাম্মেল ছাড়বার পাত্র নয়। লন্ডন যেতে তাকে হবেই। শুয়ে বসে বই পড়ে দিনরাত যায় তার। মাথায় গামছা বেঁধে টোফেল পড়তে লাগল মোজাম্মেল। আর কী আশ্চর্য! দু’মাসের প্রিপারেশনেই মনে হলো, এ কোনো ব্যাপার হলো! টোফেলে ভালো স্কোর করে ফেলল সে। আর পায় কে? একদিন ঠিক ইংল্যান্ডে গিয়ে মামার বাসায় উঠল সে। প্রথম দিন বুঝতেই পারেনি—এ কোন মুল্লুকে এসে পড়েছে সে। পাতাল থেকে আকাশে আসলে যা হয়। তিন-চার দিন ঘোরের মধ্যেই চলে গেল—এলোমেলো। চারদিকে কী অবাধ উত্তেজনা, উম্মাদনা! মনহীন পাথুরে শহরের অলিগলিতে ঘুরে একসময় কিছুই ভালো লাগে না আর। ব্যস্ত মানুষের অচেনা রংমহলে সে যেন খুব একা। কোথায় দয়ালু ছায়া বটের তলে, কোথায় ট্যাপারবিল, মাছের ঝিলিক, নয়াকাঁদার পাশে হলুদের ময়দান জুড়ে সরিষার আবাদ, ভ্রমরের গুনগুন মচ্ছব! কোথায় মতি মোল্লার চায়ের দোকান, নরম আলোতে গেঁয়ো ফুটবল, ভাবতে গিয়ে বুক থেকে বল্কে ওঠে কাজলির মুখ। আহা, কাজলি!—ক্লাস নাইনের কাজলি। তোমার নিপাট বেনীযুগল, তোমার কচুপাতা পাজামার নিচে শঙ্খ পা জোড়া, আহা তোমাকে আর পাব না—হাহাকার করে ওঠে মোজাম্মেল। কিন্তু চাইলেই তো আর ফেরা যাবে না। স্বপ্নপূরণের দেশে এসে কেউ ছিঁচকাঁদুনে হয়ে দেশে ফিরে যায় না। শহরবন্দি লেকের বাঁকে দাঁড়িয়ে কাজলির কথা মনে করে মোজাম্মেলের দু’চোখ জলে ভরে যায়। তার স্বপ্নগুলো আপাতত নটিংহাম শহরের পথে পথে আছড়ে পড়ে। তারপর ছুটন্ত তরুণী আর ভক্সওয়াগনের মচমচে টায়ারের তলায় চ্যাপ্টা হতে থাকে।

কীভাবে, কী করে হাওয়ার ছানি কেটে বুক থেকে উঠে আসা ছবিগুলো ক্রমে পকেটজাত হতে লাগল, বুঝতেই পারল না মোজাম্মেল। নির্মম শহরে টিকে থাকতে হলে পথ খুঁজতে হবে। ইংল্যান্ডের সুবাতাসে চাকরি দরকার। যেকোনো মাপের চাকরি। ওদিকে দু’বছর হতে বেশি বাকি নেই। ভিসার মেয়াদ শেষ হলে এই যন্ত্রের দেশটা উগরে বের করে দেবে তাকে। তাতেই বা সমস্যা কী! সে তো গ্রামেই ফিরতে চেয়েছিল, যেখানে তার কাজলি আছে। কিন্তু কী এক দুঃসংবাদের মতো ছোট্ট চিঠিতে সব জানতে পারে সে। কাজলির বিয়ে হয়ে গেছে। মোজাম্মেল চিঠিটাকে দুমড়ে মুচড়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। কাজলিহীন দুনিয়ার কোনোকিছুই আর কোনোকিছু নয় তার কাছে। কাজলিকেই বা কী বলা যেত। গাঁয়ের প্রেমিকা কতদিন আর নিজকে শিকেয় তুলে রাখতে পারত প্রবাসী প্রেমিকের জন্য। ...কাজলি একদিন হয়তো বাচ্চার মা হয়ে যায়।

আর সময়ের স্রোত বয়ে চলে। মামার মেয়ে নুরুন্নাহার যেন জলেভাসা ফুলের মতোই কাছে চলে আসে। কী করতে পারে মোজাম্মেল! সেও তো ভেসেই আছে। নুরুন্নাহারকে বলাই ছিল নাকি? মামার প্রস্তাবে ‘না’ বলার মতো সঙ্গতি থাকলে তো, ‘না’ করবে। তাছাড়া সাহেব-সুবেদারদের ইংল্যান্ডে আজীবন থাকতে চাইলে একটা ট্রামকার্ড লাগবেই।  নুরুন্নাহারকে বিয়ে করা মানে লালপাসপোর্ট হাতে পাওয়া। শরীরের টান আর মোদ্দা একটা ঠিকানা পেতেই রাজি হয় মোজাম্মেল। নুরুন্নাহার মেয়ে ভালো তবে সে কখনো কাজলি হয়ে উঠতে পারেনি মোজাম্মেলের বুকের মধ্যে। আর দশ জন বিলেতির মতো মোজাম্মেলও থাকতে লাগল। তারপর চাকরি হলো সরকারি অফিসে। বদলি নিয়ে বার্মিংহামে গেল। সেখানেই বাড়ি কিনে পঁচিশ বছরের সংসার। দুই ছেলে দুই মেয়ে। সকলেরই বিয়ে হয়ে গেছে। নুরুন্নাহার এখন বলতে গেলে বৃদ্ধা। অনেক আগেই তার শরীর থেকে যৌবন নেমে গেছে। সময় কাউকেই ক্ষমা করে না। মোজাম্মেলও বুড়ো হয়েছে। বেশিরভাগ দাঁত পড়ে গেছে। চুল-দাড়ি তো কত আগেই সাদা। এখন আনন্দ বলতে তেমন কিছুই তার কাছে নেই। বন্ধুদের কারো কারো বউ মরে গেলেও ইংরেজ বৃদ্ধরা ভালোই আছে। মদ খায়। মন চাইলে পয়সা দিয়ে রাতভর ফূর্তি করতে পারে। বাঙালি বুড়োদের মধ্যে যাদের বউ ইতিমধ্যেই গত হয়েছে তারাও স্বাধীন। সুযোগমতো সবই করে তারা। নুরুন্নাহার তো মরেনি! মোজাম্মেল কিছুই করতে পারে না। একটা বৃত্তের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকে সে। অবসরের অখণ্ড সময় হাতে নিয়ে তার মনে হলো—একবার হলেও পালানো দরকার। ইচ্ছেটা আসলে পরিস্থিতির চাপে চাপা পড়ে থাকে। মরে না। উপযুক্ত সময় পেলে সে আবার তরতরিয়ে গজিয়ে ওঠে। বার্মিংহামের ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো—আমার আর কোনো বাধা নেই! ছেলেমেয়েদের আলাদা সংসার হয়েছে। ওরা দেশমুখো হবে না। নুরুন্নাহারকে আঁকড়ে ধরে থাকারও কিছু নেই। সে আর কিছুই দিতে পারবে না তাকে। তাছাড়া সে এখন মেয়েদের ন্যাওটা হয়েছে। মোজাম্মেল কী করল, না করল—এ নিয়ে তার দুশ্চিন্তা হয় না। এবার তাহলে মোজাম্মেল ফিরতেই পারে। ভাবামাত্র মনে পোনামাছের ঝাঁক চলকে উঠল। মনে পড়ল—ত্রিশ বছর আগের ট্যাপারবিলে এরকমই এক পুঁটিমাছের ঝাঁক ভেসে উঠেছিল। ছেলেমানুষির মতো হেসে ফেলল মোজাম্মেল। 

কেউ যদি সিরিয়াসলি মনেপ্রাণে কিছু চায়, তবে সে পায় নাকি!  কিন্তু গ্রামে ফিরে মোজাম্মেল দৃশ্যগুলো মেলাতে পারল না। গ্রাম কেটে শহর বানিয়েছে মানুষ। জল-জংলা ফালা ফালা করে পদে পদে পিচপথ হয়েছে। অজগাঁয়েও ডিশের কানেকশন চলে গেছে। গাওয়ালিরা আর সাদামাটা নেই। তারা এখন পলিটিক্স করে। দলাদলি আছে। গ্রামে নেমে মোজাম্মেল বিরাম পেল না। গ্রুপ ধরে ছেলেরা আসতে লাগল। আর বিভিন্ন ক্লাব-অনুষ্ঠানের নাম করে চাঁদা নিতে লাগল। মোজাম্মেল প্রথমে বুঝতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত লোকাল স্কুলের হেডমাস্টাররাও লোভে পড়ে গেল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি, প্রধান অতিথি হিসেবে মোজাম্মেলের নাম ঘোষণা হতে থাকল। টাকার ক্ষতি হলেও শত মানুষের সামনে বক্তব্য দিতে ভালোই লাগছিল, কিন্তু নেতারা এটাকে ঠিক ভালো চোখে দেখতে পেল না। একদিন সরাসরি বলে দিল তারা—দয়া করে ভিলেজ পলিটিক্সে নামবেন না।

নদীর কোমরেই বাড়ি বানাল মোজাম্মেল। তার স্বপ্নের মতো। মিলেও গেল। সারাবছর স্রোত থাকে না। বর্ষাকালে ফুলে একাকার হয়ে যায়। সামনেই ব্রিজ। বিলবোর্ডের মতো বাড়িটা ব্রিজ থেকেও দেখা যায়। এরকম নির্মলা মনোরমা বাড়ি গ্রাম তো নয়, শহরেও হয় না। লন্ডনে দেখা যেসব ডিজাইন মোজাম্মেলের মনে লেগেছিল সেগুলোর ছবি তুলে নিয়ে এসেছে সে। সে মোতাবেক সবকিছু। চূড়ায় লাইটহাউজ। আর চিলেকোঠায় একটা সরাইখানার মতো করা আছে। সরাইখানা যে নিয়তে সে বানিয়েছিল তা সফল হয়নি। সেখানে বড়জোর তাসখেলা হয়, তাও তেমন ভালো কেউ পারে না। খেলে মজা নেই। ক্লাসিক্যাল সংগীত তো দূরের কথা, চা-নাস্তা ছাড়া অন্যকিছু নিয়ে মজা পাবার মতো লোক একটাও নেই গ্রামে। যে আশা নিয়ে গ্রামে ফিরেছিল মোজাম্মেল সেগুলোর কিছুই নেই। খালি খালি লাগল তার সবকিছু। দু’মাস পর নিজেকে তাই সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিল সে।

ঘোলাজলের বালি থিতিয়ে নামলে যেমন পরিষ্কার দেখা যায়। মোজাম্মেল তেমন করে সমাজের চেহারাটা দেখতে পেল। আশপাশে যারা তোয়াজ-তাছির করছে তারা আসলে সকলেই স্বার্থপর আর ধড়িবাজ। সরলতার কিছুই তাদের ভেতরে নেই। বরং সরলতার উল্টোপথে যেতেই অনবরত চেষ্টা করে যাচ্ছে তারা। কীভাবে সিস্টেম করে ক্ষমতা পাওয়া যায় আর গেঁয়োভাব দূর করে উঁচুদরের হওয়া যায় সেটাই তাদের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। ভাবতে ভাবতে নিরাশ হয়ে পড়ে মোজাম্মেল। ভাবে—নাহ্, এরচেয়ে সে লন্ডনেই ফেরত যাবে। আগেই ভালো ছিল। গ্রাম নিয়ে একটা নস্টালজিক ভালোলাগা ছিল। প্রাকটিক্যালি গ্রামকে দেখেই বরং হতাশা বাড়ছে। বান্ধবহীন শুয়ে-বসে-বই পড়ে দিনরাত যায় তার। বিলকিস ছাড়া সবাইকে ক্লোজড করে দিয়েছে সে। বিলকিসই নিয়ম করে দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে। রান্না থেকে শুরু করে সবকিছুর দায়ভার তার। মাসের শেষে যা পায় তাতেই বিরাট খুশি সে। বিলকিসের সরলতা মোজাম্মেলের ভালো লাগে।

মোজাম্মেল নিজের ভেতর ডুব দিয়ে থাকে আর বিলকিস সবকিছু ঠিক রাখে। দেয়ালঘড়ির কাঁটার মতো রুটিন করে ঘুরতে থাকে রাতদিন। কিন্তু হঠাত্ কী মনে করে একদিন বিলকিস কাছে আসে। কাতর স্বরে বলে, ভাইসাব, গায়ে জ্বর আইছে নাকি! মোজাম্মেল উত্তর করে না, কঁকিয়ে ওঠে। বিলকিস কপালে হাত দেয়। বলে, ভাইসাব, মাথায় পানি দিয়ে দেব। আরাম পাইবেন। বিলকিস উত্তরের অপেক্ষা করে না পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় মোজাম্মেলকে। মোজাম্মেল চমকে ওঠে। বহুদিন আগের একটা পুরনো অথচ চেনাগন্ধ পাগল করে দেয় তাকে। মেয়েলি গন্ধ—যা চিনে নিতে পুরুষের অসুবিধা হয় না। বিছানায় পড়ে থাকার দিনগুলোতে বিলকিস নিবিড়ভাবে সেবা করতে থাকে। আর প্রতিদিন মোজাম্মেল পাগল হতে থাকে। বিধবা বিলকিসকে কী বলবে সে! বুড়ো বয়সে মনের কথা কি বলা ঠিক হবে। মনে ষোলআনা ইচ্ছে থাকলেও কোনো উপায় নেই। বুড়ো বয়সে যাদের স্ত্রী মারা যায় তাদের দুঃখটা মোজাম্মেল পানির মতো বুঝতে পারে। ছেলেমেয়েরা বাবাকে নতুন করে বিয়ে দিতে চায় না। অথচ সত্যিকার অর্থেই তার একজন মেয়েমানুষের টান থাকে। এই নিয়ম ভাঙা দরকার। নুরুন্নাহার কোনো বিষয় নয়। সমাজ আর কি! দুনিয়াতে সে বাঁচবেই আর কতদিন! মুখে মাটি উঠলে সমাজই কী আর মানুষই কী! ছেলেমেয়েরা কখনোই বৃদ্ধ পিতার মনের অবস্থা জানতে পারে না। পুরুষমানুষ বৃদ্ধ হলেও তার মন পুরো মরে যায় না—এ কথা ছেলেমেয়েদের অনুধাবন করা উচিত। মরার আগে পিতা যদি নারীসঙ্গ পায়, তাহলে ক্ষতি কী। ভাবতে ভাবতে মোজাম্মেলের মনে পোনামাছের ঝাঁক চলকে ওঠে।