১৯৭১ সাল। সারাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। এমনিভাবে ঘাঁটি গেড়েছিল টাঙ্গাইলের মধুপুরে। আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢাকা থেকে ফেরার পথে তল্লাশি চালানোর সময় নাইবউদ্দিন আহমেদের পরিচয় জানতে চাইল। নাইবউদ্দিন আহমেদ একজন আলোকচিত্রী জানতে পেরে এগিয়ে এলেন বেলুচ রেজিমেন্টের মেজর কাইয়ুম। তিনি বললেন, ‘আমার একটি নতুন ক্যামেরা আছে, অথচ ক্যামেরায় ছবি তোলা যাচ্ছে না। ক্যামেরাটি তিনি পরীক্ষা করতে দেন নাইবউদ্দিন আহমেদকে। নাইবউদ্দিন ক্যামেরা নেড়েচেড়ে পরীক্ষা করে দেখেন, ক্যামেরার কোনো ত্রুটি নেই; তবে নতুন ক্যামেরায় একধরনের কাচের হালকা গোলক থাকায় ছবি তোলা যাচ্ছে না। সাধারণত নতুন ক্যামেরায় এরকম গোলক বসানো থাকে। গোলকটি ফেলে দিলেই ছবি তোলা যায়।
আলোকচিত্রী নাইবউদ্দিন বিষয়টি বুঝতে পেরেও কিছু বললেন না। বরং না বোঝার ভান করলেন। কেননা, চেকপোস্টের অনতিদূরে মধুপুর বাজারের দোকানপাট পাকিস্তানি সৈন্যরা কয়েকদিন আগে পুড়িয়ে দিয়েছে। মেজর কাইয়ুমের কাছে একটি নতুন ফিল্ম ছিল। নাইবউদ্দিন আহমেদ ক্যামেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ছলে ফিল্মটি ক্যামেরায় লোড করলেন। তারপর গোলকটি সরিয়ে কয়েকটি ছবি তুললেন বাজারের পোড়া দোকানপাটের। ছবি তোলার পর আবার গোলকটি যথাস্থানে বসিয়ে ক্যামেরা তুলে দেন কাইয়ুমের হাতে। তিনি হানাদার বাহিনীর জ্বালাও-পোড়াও ছবিগুলো দেশের বাইরের পত্র-পত্রিকায় পাঠিয়ে তুলে ধরবেন ওদের অপকীর্তি। এ ভাবনা থেকেই তিনি একটা কৌশল আঁটলেন, বললেন, ‘ক্যামেরা এখন ঠিক করা যাবে না। ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অফিসে এলে এটি ঠিক করে দেওয়া যাবে।’
দু’দিন পর মেজর কাইয়ুম ক্যামেরা নিয়ে আসেন নাইবউদ্দিন আহমেদের অফিসে। নাইবউদ্দিন ক্যামেরা নিয়ে ঢোকেন ডার্করুমে। ডার্করুমে গিয়ে তাঁর তোলা মধুপুরের বাজারের ধ্বংসস্তূপের ছবির নেগেটিভের অংশটুকু কেটে ডেভেলপ করে লুকিয়ে রাখলেন। গোলকটি সরিয়ে ক্যামেরাটি মেজরের হাতে দিয়ে বললেন, ‘সামান্য কারিগরি ত্রুটি ছিল, তা ঠিক করে দিয়েছি।’ ক্যামেরাটি ঠিক হওয়ায় মেজর কাইয়ুম খুশি মনে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
মেজর কাইয়ুমের সঙ্গে পরিচয়সূত্রে নাইবউদ্দিনের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার সুযোগ হয়। এতে তিনি যুদ্ধকালীন বিভিন্ন ছবি তুলতে সক্ষম হন।
সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখ সকাল ১০টার দিকে ড. আমির হোসেন তালুকদার, ড. এস এ কাদের—এঁদের সঙ্গে কোয়ার্টারের বাসায় বসে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করছেন নাইবউদ্দিন আহমেদ। এ সময় এসে উপস্থিত হন মেজর কাইয়ুম। সবাই মিলে একসঙ্গে চা পান করছেন। এমন সময় নাইবউদ্দিনের ছয় বছরের ছেলে নিপুন উত্সুক দৃষ্টিতে মেজর কাইয়ুমকে দেখতে উঁকিঝুঁকি মারতে থাকে। উঁকি দিয়ে ভেতরে চলে যেতে উদ্যত হলেই মেজর কাইয়ুম নিপুনকে কাছে ডাকলেন। ডাক শুনে নিপুন পাশে এসে দাঁড়ায় মেজরের। মেজর কাইয়ুম বাংলা জানতেন। তিনি নিপুনকে জিজ্ঞেস করেলেন, ‘কী নাম তোমার?’ নিপুন চটপট উত্তর দেয়, ‘আমার নাম নিপুন।’
মেজর কাইয়ুম জানতে চান, ‘তুমি ভয় পেয়েছ?’ নিপুন সাহসের সঙ্গে জবাব দেয়, ‘না।’ মেজর কাইয়ুম বলেন, ‘ভয়ের কিছু নেই, এই নাও পিস্তল।’ তিনি পিস্তলটি নিপুনের হাতে দেন। কথায় কথায় বলেন, ‘তুমি পিস্তল দিয়ে কী করবে?’ নিপুন বুক ফুলিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে বলে, ‘পিস্তল দিয়ে আমি পাঞ্জাবি মারব।’
নিপুন ‘পাঞ্জাবি মারব’ বলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বেলুচ রেজিমেন্টের মেজর কাইয়ুমকে যে হুমকি দিয়েছিল, মেজর কাইয়ুম সে হুমকিতে চমকে উঠেছিলেন। একাত্তরের ছোট্ট নিপুনের সাহসী এই উচ্চারণ যুগ যুগ ধরে বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করবে।
