পিছিয়ে পড়াদের পেছনে রেখে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:০৫

সমাজে যতদিন ধর্মীয় গোড়ামি বহাল থাকবে এবং আইনের বাস্তবায়ন হবে না, ততদিন বৈষম্য চলতেই থাকবে। এজন্য বৈষম্য বিলোপ আইনের পাশাপাশি মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। আইনটি পাশ না হলে উন্নয়নের বিভিন্ন স্তরে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বৈষম্যের শিকার হতেই থাকবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সরকার এসডিজি অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, তা এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে কোনোভাবেই অর্জন সম্ভব হবে না। ফলে আইনটি দ্রুত পাশ করা এখন সময়ের দাবি। গতকাল বৃহস্পতিবার ডেইলি স্টার ভবন মিলনায়তনে ‘কেন বৈষম্য বিলোপ আইন দ্রুত পাশ করা দরকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন—বিডিইআরএম ও নাগরিক উদ্যোগ যৌথভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করে।

বৈষম্যের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে ভুক্তভোগীরা বলেন, দলিত-হরিজন সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের স্কুলের প্রথম বেঞ্চে বসতে দেওয়া হয় না। তাদের জন্য থাকে পানি পানের আলাদা গ্লাস। স্কুলে অনেক সময় শিক্ষকরাও ওই শিশুদের দিয়ে টয়লেটে পানি ঢালিয়ে নেয়। স্কুলে ভর্তির বিষয়ে তারা বাড়ির ঠিকানার কারণে বৈষম্যে শিকার হয়। এ ধরনের নানা বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। তারা দলিত ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি অস্পৃশ্যতা ও বৈষম্য নিরসনে বৈষম্য বিলোপ আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।

নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, ২০১৩ সালে সর্ব প্রথম নাগরিক উদ্যোগ অস্পৃশ্যতাবিরোধী আইনের একটি খসড়া আইন কমিশনে জমা দেন। বৈষম্য বিলোপ আইনের প্রক্রিয়া গত সাত বছর ধরে চলমান আছে। কিন্তু এখনো এই আইনটি প্রণয়নে কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এ প্রেক্ষিতে অস্পৃশ্যতা ও বৈষম্যের শিকার সব জনগোষ্ঠীর দাবি—এখনই আইনটি প্রণয়ন করা হোক এবং সেই সঙ্গে এই আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া হোক।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মো. ইসরাফিল আলম বলেন, আমাদের দেশে বহু ধরনের মানুষের বাস। তবে বৈষম্যে শিকার সবচেয়ে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ। তবে আমাদের দেশের চাইতেও ভারতে বৈষম্যের হার অনেক বেশি। আশার কথা হলো দলিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের বিষয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডায় রয়েছে। আওয়ামীলীগ নির্বাচনী ইশতেহারে দলিত শব্দটি উল্লেখ করে। বর্তমান বাংলাদেশ সরকার দলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তাদের জন্য বাজেটে বরাদ্দ প্রদান করা হচ্ছে। এখন তাদের জন্যে শিক্ষা, ভাতা, আবাসন ব্যবস্থা হচ্ছে। এই জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী বিশেষ পরিপত্রের মাধ্যমে ৮০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। এই পরিপত্রের যদি ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয় তাহলেও এই জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হবে। আমাদের দেশের আইনগুলোতেও যে, বৈষম্য আছে তা চিহ্নিত করার কথা বলেন তিনি।

বৈঠকে সম্মানিত বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, সংসদ সদস্য লুত্ফুন নেসা খান, সংসদ সদস্য রুবিনা আক্তার মিরা। আলোচক ছিলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাসুম বিল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রভাষক গোলাম সারোয়ার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য সালেহ আহমেদ, বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক কে এম মাকসুদ। সভা-প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন ‘বিডিইআরএম’-এর সভাপতি মনি রাণী দাস।                         

বৈঠকে অংশ নেন, ‘জাতীয় আদিবাসী পরিষদ’-এর প্রতিনিধি মানিক সরেণ, জেন্ডার ডাইভারসিটি কমিউনিটির প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম টুটুল, চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা উপজেলার দলিত প্রতিনিধি জিতেন বাঁশফোর, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার চাতলাপুর চা-বাগানের প্রতিনিধি লক্ষীন্দ্রর রবিদাস, যশোর জেলা সদর থেকে আগত দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি জয় দাস, যশোর জেলার বাঘারপাড়া থেকে আগত দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি সুজল বিশ্বাস, উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি আলী ইমরান, বাংলাদেশ সেক্স ওয়ার্কার্স নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি আলেয়া বেগম. বেদে কমিউনিটির প্রতিনিধি সৌদ খান, গ্রামবাংলা উন্নয়ন কমিটির নির্বাহী পরিচালক কে এম মাকসুদ, আল্ট্রা পুওর জনগোষ্ঠী নিয়ে কর্মরত জাহিদ হোসেন, পিপলস্ হেলথ্ মুভমেন্ট বাংলাদেশের সমন্বয়কারী আমিনুর রসুল, বিডিইআরএম এর সহ-সভাপতি বিভূতোষ রায় প্রমুখ।