আগামী দুই দশক পর যেমন বাংলাদেশ দেখব

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:২৫

প্রফেসর ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ

বিশ্বে এখন হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৭৭ কোটি, যাদের দৈনিক আয় এক দশমিক ৯০ ডলারের কম। তাদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বা ৩৯ কোটির বসবাস সাহারা অঞ্চলে। আর ৩৪ শতাংশের বসবাস দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। ঠিক এর বিপরীত অবস্থানে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও ভুটানের চেয়েও এগিয়ে বাংলাদেশ। বিশ্বের বহু দেশের চেয়ে নিম্ন আয় সত্ত্বেও বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাসে বেশ সাফল্য অর্জন করেছে।

ফিরে তাকালে দেখা যাবে, গত দুই দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের যে কোনো সূচকের বিচারে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। পিপিপির ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩০তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ এবং উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আউটলুক ২০১৯ উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ। এইচএসবিসি তাদের ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। এবং বিশ্বের তিনটি দ্রুততম অর্থনীতির একটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশ। ১৯৯০-এর পর সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধিতে উন্নয়নশীল দেশের গড় হারের তুলনায় অনেক এগিয়েছে। দারিদ্র্যের হার অর্ধেক হয়ে গেছে। জাতিসংঘ মনে করে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছে। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক দশকে বৃহত্ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের ব্যাপক বিনিয়োগ বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়ে ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

দারিদ্র্য ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যেখানেই যান দারিদ্র্য দূরীকরণে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান। সরকারের শুরু থেকেই একটা পরিকল্পনা ছিল তা হলো—দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা যাবে না। গ্রামীণ সামাজিক ও জলবায়ুগত স্থিতিশীলতার উন্নয়নে একটি ব্যাপকভিত্তিক টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের মূলও দারিদ্র্য ও ক্ষুধারই বিরুদ্ধে। কারণ, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হলে অবশ্যই দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল সম্ভব। এ কথা অনস্বীকার্য যে, ক্ষুধা-দারিদ্র্য উন্নয়নশীল বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো অভিশাপ। 

অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের বিচারে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নিয়ে গবেষকদের গুরুত্ব দিচ্ছেন নোবেল কমিটির বিচারকরাও। এ বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন অভিজিত্ ব্যানার্জি, এস্থার ডাফলো, মাইকেল ক্রেমার। এই ত্রয়ীর মধ্যে অভিজিত্ বাঙালি। নিঃসন্দেহে একজন বাঙালি হিসেবে এটা আমাদের জন্য গর্বের। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, তাদের পরীক্ষামূলক গবেষণা আগামী দশকে বিশ্বের দারিদ্র্য দূরীকরণে ব্যাপকভাবে সহায়ক হবে। আমাদের গর্বের আরেকজন হচ্ছেন অমর্ত্য সেন, যিনি ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন। বাঙালি অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি ছিলেন প্রথম নোবেলজয়ী। মানুষের ‘ক্ষুধা’ ছিল তারও ভাবনার বিষয়। অর্থাত্ দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নিয়ে গবেষণাই এই দুজন বাঙালির নোবেলজয়ী হওয়ার কারণ। এ বিষয়টির যদি প্রধানমন্ত্রী দারিদ্র্য ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি, তাহলে দেখতে পাই এই দুই নোবেলজয়ী যে বিষয়টিতে উত্তরণের জন্য ভাবছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে বিষয়টি নিরসনে প্রতিদিন যুদ্ধ করে চলেছেন। জনগণের সঙ্গে কাজ করে, জনগণের মঙ্গলই শেখ হাসিনার স্বপ্ন ও সাধনা।

প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যত্ নিয়ে কতখানি ভাবছেন সেই দিকটাতে একটু দৃষ্টি ফেরানো যাক। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা ৯ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে এবং এর অর্ধেক হবে মধ্যবিত্ত। এর ফলে বিশ্বের আবাদি জমি, বনভূমি ও পানির ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে। আবার সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বৃদ্ধিতে অনেক দেশের আবাদি জমি ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের এই উচ্চতা বৃদ্ধিতে আমরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হব। ২০৫০ সালে বিশ্বের খাদ্যের চাহিদাও আগের অবস্থান থেকে অন্তত ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে এবং বেড়ে যাবে খাদ্যমূল্য। কীভাবে এ ধরনের বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে, সেটা মাথায় রেখে প্রধানমন্ত্রী এখন থেকেই তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তৈরিতে ব্যস্ত। প্রধানমন্ত্রীর ডেলটা প্ল্যান জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশকে পুনর্নির্মাণ ও পুনর্গঠন নিয়ে। তিনি ইংল্যান্ড-নেদারল্যান্ডস সফরে গিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা, উপকূলে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত হয়ে তাদের প্রকৌশল দক্ষতা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করেছেন। কেবল ভাবনা আর গবেষণা নয়, ২০৫০ সালকে মোকাবিলার রসদ এখনই গুছিয়ে দিচ্ছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ফোরামে যখনই কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন, তিনি এসব নিয়ে বলছেন।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বাংলাদেশ উর্বর ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিত, যেখানে সব ধরনের কৃষিপণ্য উত্পাদিত হয় সহজেই। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর দেশ কঠিন খাদ্য খাটতির মুখে পড়ে। তখন দেশে ৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের জন্য খাদ্য উত্পাদন হতো মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন। স্বাধীনতার পরপরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির ওপর সবিশেষ জোর দেন এবং দেশে সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন। উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য বঙ্গবন্ধু ভূমি সংস্কার, খাজনা কমানো, গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সেচপাম্প স্থাপন, কৃষি উপকরণ বিনা মূল্যে বিতরণসহ কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও জাতির পিতার সেই ধারা অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়াসে লড়ে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, গ্রামাঞ্চলে কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না—এই চ্যালেঞ্জই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের মধ্যে দারিদ্র্য নির্মূল এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত করতে চান প্রাধানমন্ত্রী। টেকসই গ্রামীণ রূপান্তর ঘটাতে পারলেই দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা দূর করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। এজন্য সপ্তম পঞ্জবার্ষিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের উন্নয়নে এবং অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলোর চিহ্নিতকরণ, যেমন স্থানীয় ফসলের উত্পাদন বাড়ানো, জ্বালানি সমস্যার সমাধান, কৃষি কর্মসূচি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাসের বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, চলমান গ্রামীণ রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, অকৃষি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি গ্রামীণ গতিশীলতা এবং গ্রামীণ অর্থব্যবস্থাকে সহযোগিতায় এসব গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোও পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে।

 স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে বাংলাদেশের। এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের জন্য মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক—এ তিনটি সূচকের যে কোনো দুটি অর্জনের শর্ত থাকলেও বাংলাদেশ তিনটি সূচকের মানদণ্ডই উন্নীত হয়েছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসন) মানদণ্ডই এক্ষেত্রে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার। সেখানে বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দশমিক ৯। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক হতে হবে ৩২ ভাগ বা এর কম। সেখানে বাংলাদেশের রয়েছে ২৪ দশমিক ৮ ভাগ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকেই উত্তরণ—এমন একটি বড়ো অর্জন সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও অগ্রগতিশীল উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের জন্যই। সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কাঠামোগত রূপান্তর ও উল্লেখযোগ্য সামাজিক অগ্রগতি বাংলাদেশকে দ্রুত উন্নয়নের পথে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভোরের সূর্য দেখে দিনটি কেমন যাবে বলা যায়, তেমনি এই সরকার তার লক্ষ্য অর্জনে যে সফল হবেন, বর্তমানের সাফল্যই তা বলে দেয় আমাদের।

বিশ্বের সামনে দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশ যে এক অনুকরণীয় অবস্থানে পৌঁছেছে, সম্প্রতি এই সাফল্যের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছে বিশ্বব্যাংক। তারা বলছে, বিশ্বের অন্য উন্নয়নশীল দেশের উচিত কীভাবে দারিদ্র্য দূর করতে হয়, তা বাংলাদেশের কাছ থেকে শেখা। টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশটি অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের কাছে অনুকরণীয় হতে পারে। দেশের ৩ কোটি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এর মধ্যে ১ কোটি মানুষ অতি দরিদ্র। দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এলেও দারিদ্র্য দূরীকরণ এখনো সরকারের মূল লক্ষ্য।

লেখক :শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষক