মায়ের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল ‘শহীদ বদি’

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৭:২৯

তাসনুভা রাইসা

‘মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের নিয়ে গাঁয়ের মেয়েদের অনেক কৌতূহল। ওরা জানতে চায়, ‘ওরা দেখতে কেমন, বুবু? শুনতে পাই, ওরা নাকি আসে। আমরা দেখি না কেন? ওরা দেখতে কেমন? ওরা কি বাতাসে ভর দিয়ে চলে, জ্বীন কি ওদের আড়াল করে রাখে? এই যে ওরা এক জায়গায় মিলিটারি খতম করে নিমিষে অন্য জায়গায় চলে যায়, না-জানি ওদের বুকের পাটা কত বড়! কত না জানি বুদ্ধি!’

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের কোনো এক রক্তঝরা দিন, কথাগুলো শুনে রওশন আরা খানমের বুক একদিকে গর্বে ফুলে ওঠে আরেকদিকে অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। রওশন আরা খানমের আদরের বড় ছেলে তখন যুদ্ধের ময়দানে, মুক্তিযোদ্ধা বদিউল আলম, ক্র্যাক প্লাটুন-এর অকুতোভয় গেরিলা। যুদ্ধপরবর্তী রওশন আরা খানমের পরিচয় একজন শহীদ জননী—আমরণ দেশের জন্য লড়াই করে শহীদ হওয়া বদির জননী।

শহীদ জননী রওশন আরা খানম, পুত্র বদিউল আলম, এবং সেইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকালীন নিজের স্মৃতিচারণা লিখে গেছেন। তাঁর স্মৃতিচারণমূলক লেখা বই আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেন শহীদ বদির সর্বকনিষ্ঠ ভাই সাইফুল আলম। ২০১৯ সালে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রথমা প্রকাশনী থেকে বের হয় রওশন আরা খানম-এর ‘শহীদ বদি এবং আমার স্মৃতিতে একাত্তর’ ।

এর আগে শহিদ জননী জাহানারা ইমামের লেখা ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইয়ের স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ ও শহিদ মুক্তিযোদ্ধা রুমীর বীরত্বগাথা আজও দেশের তরুণদের উদ্দীপ্ত করে। শহিদ আজাদের ‘মা’-কে আমরা ভুলতে পারি না—যেমন পারি না শহিদ আজাদের আত্মত্যাগ। একজন মা যখন দেশের জন্য নিজ আত্মজকে কোরবানি করে দেন; সেই মা-ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথার অংশীদার। সন্তানকে দেশের জন্য উত্সর্গ করে সকল মুক্তিপ্রাণ অন্তরকে ধারণ করেন তিনি। শহিদ রুমী, শহিদ আজাদ, শহিদ বদি ছিলেন ঢাকার গেরিলা আক্রমণের সব জ্বলজ্বলে নক্ষত্র। শহিদ জননী রওশন আরা খানমের বইটি পড়ে শহিদ বদির বেড়ে ওঠা এবং একজন মুক্তিযোদ্ধার অকুতোভয় মানসিকতা, অদম্য সাহসিকতার নানা রোমাঞ্চকর সাবলীল বর্ণনা পাওয়া যায়।

রওশন আরা খানমের স্মৃতিচারণে তাঁর পুত্রের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, এক মেধাবী অনুসন্ধিত্সু ও সংবেদনশীল তরুণ হিসেবে তার নানামুখী কর্মকাণ্ডের বিবরণের পাশাপাশি ঢাকায় ও কিশোরগঞ্জে নিজের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোরও স্মৃতিচারণ করেছেন।

ময়মসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলায় নানাবাড়িতে জন্ম নেওয়া বড়ো সন্তানের পুরো নাম রেখেছিলেন বদিউল আলম তপন। তপন মানে সূর্য। তপনের বাবা আবদুল বারী ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট, মানে বদলির চাকরি। বাবা-মা’র পাশাপাশি নানাবাড়ি এবং দাদাবাড়ির আদরে বেড়ে ওঠা তপনকে সুশৃঙ্খল পরিবেশে ভালো মানের পড়াশোনার জন্য ক্যাডেট কলেজে পাঠানো হয়। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি ও এইচএসসিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর এয়ারফোর্সে যোগদানের ইচ্ছে প্রকাশ করে তপন; করাচিতে পরীক্ষা দিয়ে এয়ারফোর্সে টিকে যায়। ছেলের বিমানবাহিনীতে যোগদানে মা-বাবার সায় ছিল না। তপনও কারো অধীনে চাকরি করার উত্সাহ হারিয়ে ফেলে। বই সংগ্রহ এবং বই পড়ার তুমুল আগ্রহ তার। ইংরেজি ম্যাগাজিন ‘রিডার্স ডাইজেস্ট’-এর নিয়মিত গ্রাহক তপনের লেখার অভ্যাস ছিল এবং রেডিও আর পত্রিকায় নিয়মিত লেখাও পাঠাত। সাংবাদিক হবার বাসনা ছিল প্রবল। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স শেষের পর দেশের অস্থিতিশীল পরিবেশের কথা ভেবে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বদির অনুসন্ধিত্সু মন পরীক্ষা শেষে করাচি শহর দেখতে বের হয়, শহর দেখে এসে ক্ষোভ নিয়ে দেশে ফেরে সে।

‘প্রতিটি শহর সেখানে কত উন্নত। সেখানকার রুদ্র প্রকৃতিকে বশ করে গড়ে উঠেছে অনেক বড় বড় শিল্পকারখানা, ব্যাংক, পাঁচতারা হোটেল, সুদৃশ্য দোকানপাট, অত্যাধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে গড়া আধুনিক সব দালানকোঠা।’ মায়ের কথা থেকে জানা যায়, পশ্চিম পাকিস্তানের জৌলুশের কাছে দেশের পূর্বাংশ কত ম্লান, বিবর্ণ—আরো সব বৈষম্যের কথা বলতে বলতে রাগে-ক্ষোভে বদির চোখ-মুখ লাল হয়ে যায়।

এর মধ্যে উত্তাল মার্চে অনেক ঘটনা ঘটে গেল, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ২৫ মার্চ গণহত্যার আদেশ দিয়ে দেশ ত্যাগ করেন। ২৫ মার্চ কালরাতে কাপুরুষ হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালি হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠের পর পর শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে সৃষ্টি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ। গড়ে উঠেছিল স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ। ছোটবেলা থেকেই তেজি, চঞ্চল, জেদি, পরোপকারী রওশন আরা খানমের তপনকে আর দাবিয়ে রাখা যায়নি।

২৫, ২৬, ২৭ তারিখ পর্যন্ত ঢাকায় কারফিউ জারি করা হয়, ২৭ তারিখ রাতে স্বল্প সময়ের জন্য কারফিউ তোলার ঘোষণা শোনামাত্রই বদি তার মোটরবাইক নিয়ে নিউ মার্কেট, বিশ্ববিদ্যালয় ও মতিঝিল ঘুরে এসে ধ্বংসযজ্ঞ দেখে আর নিজেকে থামিয়ে রাখতে পারে না—দেশের এরূপ পরিস্থিতিতে পুরো পরিবার যখন ঢাকা ছেড়ে কিশোরগঞ্জে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তখন বদি স্থির করে সে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবে। যে মা প্লেন দুর্ঘটনার আশঙ্কায় ছেলেকে এয়ারফোর্সে যোগদান করতে দেননি, সেই মাকে যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে কী বুঝিয়েছিল ছেলে? রওশন আরা খানমের ‘শহীদ বদি এবং স্মৃতিতে একাত্তর’ বই থেকে জানা যায়, বদিউল আলম তপন মায়ের গলা জড়িয়ে বলেছিল—‘সব মা-ই চায় তার ছেলেকে কাছে ধরে রাখতে... কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী যেভাবে আমাদের ওপর জুলুম করছে, যেভাবে নিরস্ত্র ও অসহায় মানুষকে হত্যা করে চলেছে—এ অন্যায়ের প্রতিরোধ তবে কারা করবে? কারা তাদের সমুচিত শাস্তি দেবে? এ দেশে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামের সূত্রপাত করেছে তরুণ সমাজ। এবারের এই অত্যাচার তারা কি নীরবে সহ্য করবে? তারা কি মুখ বুজে শুধু মার খাবে? দেশের মানুষকে মার খেতে দেখবে? রাস্তায় দেখে এলাম, হলের মেয়েদের ট্রাকে করে ক্যান্টনমেন্টে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তুমি যদি দেখতে মেয়েদের সেই অসহায় করুণ অবস্থা, আতঙ্কে তাদের মুখগুলো শুকিয়ে গেছে, তাহলে আজ কিছুতেই আমাকে মানা করতে পারতে না। তোমার ছয় ছেলে, এক ছেলেকে দেশের জন্য উত্সর্গ করতে পারবে না?... আমাদের যুদ্ধ করতে হবে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। ওরা অন্যায়ভাবে আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। ওদেরকে আমাদের হটাতেই হবে। এ দেশকে, দেশের মানুষকে পাকিস্তানের অধীনতা থেকে মুক্ত করতেই হবে।’

সেদিন তার চোখে মুখে প্রতিশোধের যে আগুন ঝরে পড়ছিল, হানাদারদের বিরুদ্ধে যে আক্রোশ, ঘৃণা ফুটে উঠেছিল, তা দেখে তাকে বাধা দেওয়ার শক্তি মা রওশন আরা খানমের ছিল না। ২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাতের পরপরই যেসব তরুণের হূদয়ে প্রতিরোধের চেতনা জেগে উঠেছিল, স্বদেশকে মুক্ত করার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে যারা পশ্চিমা শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল—তাদেরই প্রথম একটি শিক্ষিত গেরিলা দলের সদস্য ছিল বদিউল আলম তপন। তাঁর দলে আরো ছিলেন আশফাকুস সামাদ (আশফি), শহীদুল্লাহ খান (বাদল), মাসুদ ওমর প্রমুখ। যুদ্ধের জন্য অস্ত্র জোগাড় করতে তাঁরা মুক্তাঞ্চল কিশোরগঞ্জে চলে যান। সেখানে বদির খালু ডাক্তার আবদুল হাই সাহেবের বাড়ি শোলাকিয়ার ‘প্রান্তিকে’ ওঠেন তাঁরা। বদিউল আলম তপন ও তাঁর সঙ্গীদের এ সময়ের তত্পরতার বিবরণ দিতে গিয়ে বদিউল আলমের সহযোদ্ধা হাবিবুল আলম লিখেছেন :‘বাংলাদেশের অসামরিক লোকদের উপর রক্তপিপাসু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত হামলা শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাতে এবং তা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে ২৭ মার্চের সকাল পর্যন্ত। মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য সান্ধ্য আইন তুলে নিয়ে তা আবার সন্ধ্যায় বলবত্ করা হয়। ওই ২৭ মার্চেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন ছাত্র তাদের ভাগ্য ভবিতব্যের ওপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শহীদুল্লাহ খান (বাদল), মাসুদ ওমর, আশফাকুস সামাদ (আশফি) এবং বদিউল আলম (তপন) ছিলেন প্রথম চার যুবক, যারা কিশোরগঞ্জে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই চার যুবক প্রথমে ময়মনসিংহে যান এবং সেখান থেকে কিশোরগঞ্জ। প্রক্রিয়াটি শুরু করেন বদি। সান্ধ্য আইন শিথিল থাকার স্বল্প সময়ের মধ্যে পাওয়া এই খবরটা খুব নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছিল যে, গাজীপুর দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট তখন আর গাজীপুরে ছিল না। তারা সেখান থেকে ময়মনসিংহের দিকে চলে যায়।’

বদি ঢাকায় ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য হিসেবে গেরিলা আক্রমণের পাশাপাশি মামা এনামুল হকের সঙ্গে কেন্দুয়া, মদন, ইটনা, তাড়াইল প্রভৃতি স্থানে কতগুলো সফল অপারেশন পরিচালনা করেন। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের ছোট ছোট দুই মেয়েকে সামরিক কর্তৃপক্ষ অগ্রণী বিদ্যালয়ের হেডমিস্ট্রেসের হেফাজতে রেখে দিলে সেখান থেকে দুজনকে উদ্ধারের সাহসী অভিযানেও অংশ নিয়েছিলেন বদি।

শহিদ জননী রওশন আরা খানমের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ৮ আগস্ট, ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে  ‘অপারেশন ফার্মগেট’ নামে অভিহিত লড়াই করতে একমত ও শামিল হওয়ার নেপথ্যের নায়কও বদি। ফার্মগেটে অবস্থিত ত্রিকোণ সড়কদ্বীপটির গুরুত্ব ছিল এর অবস্থানের কারণে। ফার্মগেটের এই ত্রিকোণ সড়কদ্বীপ তাই পাকিস্তানি সেনাদের জন্য একটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ তল্লাশি চৌকিতে পরিণত হয়। এখান থেকে তারা যানবাহনে তল্লাশি চালাত এবং অসামরিক লোকদের হয়রানি করতে পারত। এই হয়রানির অবসান করতে হবে এবং তল্লাশি চৌকিটি উড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন বদি। অত্যন্ত সফল এই অপারেশনে হতবাক হয়ে যায় আশপাশের সবাই। ঘটনাটি ছিল বাঙালি স্বপ্নপূরণের ঘটনা। ক্র্যাক প্লাটুন সদস্যদের সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন অভিযানের আগে রেকি করতে গিয়ে মিলিটারি বোঝাই নৌকা ও রাজাকার মাঝির সামনে পড়ে ক্র্যাক প্লাটুনের নৌকা। সদস্যদের পূর্ব পরিকল্পনায় স্টেনগান লুকিয়ে রাখার কথা থাকলেও বদি নিজের কাছেই রেখেছিলেন। আসন্ন বিপদ আঁচ করতে পেরে অদম্য সাহসী বদি মুহূর্তেই পুরো ম্যাগাজিন খালি করে ব্রাশ ফায়ারে মিলিটারিদের ঝাঁঝরা করে দেন। এই রেকির সময়েই দুর্দান্ত ক্রিকেটার জুয়েলের আঙুলে গুলি লাগে (পরবর্তী সময়ে শহীদ জুয়েল )।

কিশোরগঞ্জে বোনের বাসায় ছেলের সঙ্গে দেখা হলে খুব আদর-যত্নে ভাত-মাছ খাওয়াতে চাইতেন রওশন আরা খানম—গরুর মাংসের কালিয়া, কাবাব, বড়ো মাছ ভাজা—সব সময় ভালো ভালো খাবার খেতে চাওয়া বদিউল আলম তপন নদীতে লাশ দেখে দেখে ক্ষুব্ধ, মাছ মুখে নিতে নিতে পারতেন না, মা জোর করতেন না, চুপ করে থাকতেন, ‘তপন’ রওশন আরা খানমের একার সন্তান না, মুক্তির আশায় উন্মুখ পুরো দেশের সূর্য-সন্তান।

শেষবার দেখায় মায়ের নিঃশ্চুপ মুখ দেখে বদি হেসে বলেছিলেন—‘আম্মা তোমার এক ছেলে মরে গেলে হাজার হাজার তপন তোমাকে আম্মা বলে ডাকবে...’।

‘স্বাধীনতা চাইবেন অথচ রক্ত দিতে পারবেন না’—এ কথা সবাই কে বলে বেড়াতেন বদি... যেকোনো সময় মৃত্যু আসতে পারে সামনে, মিলিটারি বা রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ার নিয়তি জেনে নিয়ে পকেটে পটাশিয়াম সায়ানাইড থাকত, প্রত্যেক সদস্যেরই। বদিকে ধরিয়ে দেয় তারই এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যার আস্তানায় তিনি থাকতেন, তার পাকিসতানপ্রীতির কথা টের পাননি বদি। পালানোর সময় বদির পকেটের পটাশিয়াম সায়ানাইডটা পড়ে যায়, বন্দি আস্তানায় তাকে সহযোদ্ধার হাত-পায়ের সাথে একই ক্ল্যাম্প দিয়ে বেঁধে রেখেছিল। টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে বাঁধনমুক্ত হওয়া বদির শরীরে কোনো শক্তি অবশিষ্ট ছিল না, ওই অবস্থাতেই পাহারারত পাকিস্তানি সৈন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, কিন্তু  সুবিধে করতে পারেননি, অন্য সৈন্যরা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে বদির ওপর। তার বন্ধুটি বেঁচে ছিল, সে বদির খবর জানতে চাইলে তাকে বলা হয় ‘বদিকো বাংলাদেশ ভেজ দিয়া’...পরিবার বদির লাশ খুঁজে পায়নি।

অবশেষে লাখো প্রাণের বিনিময়ে এল বহু প্রতীক্ষিত ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধ চলেছিল ৪ দিন কম ৯ মাস, ৯৯ দিন কম ১ বছর, ৩৮ সপ্তাহ বা ২৬৬ দিন বা ৬ হাজার ৩৮৪ ঘণ্টা। ২৫ মার্চের কালরাতে সংঘটিত বিশ্বের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধকে অপরিহার্য করে তুলেছিল। কী দুর্বিষহ, কী মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অবরুদ্ধ নয়টি মাস কেটেছে। একদিকে নিপীড়ন-অত্যচার, অন্যদিকে একটি জাতির নবজন্ম—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুল গৌরবের স্মৃতি, আত্মত্যাগ, বীরত্বের কাহিনি আর সাহসিকতার স্বর্ণোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে আছে লোভ কপটতা আর বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনাও।

বিজয়ী বাংলাদেশের শ্যামল মাটির প্রতিটি কণা স্বাধীনতার জন্য আত্মদানকারী শহিদদের এই পবিত্র রক্তে স্নাত, পরিশুদ্ধ। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা তোমাদের ভুলব না।

 

লেখক :প্রকৌশলী