অভিশংসন প্রক্রিয়া ক্লিনটন, জনসনের পথে ট্রাম্পও

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৩৩

তালেব রানা

 

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিতর্ক তাড়া করে ফিরছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। তার বক্তব্য, নীতি, পদক্ষেপ সবকিছু ঘিরেই বিতর্ক আর সমালোচনা। নির্বাচনে জিততে তার প্রচারণা টিম রাশিয়ার সঙ্গে যোগসাজশ করেছিল এমন অভিযোগের তদন্তে প্রায় দুই বছর কেটেছে। ওই তদন্তের ভিত্তিতে ট্রাম্পকে বেকায়দায় ফেলতে পারেনি বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। কিন্তু তিনি ফেঁসে গেছেন আরেক অভিযোগে। ঘটনার সূত্রপাত গত জুলাইয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের এক ফোনালাপ থেকে। গত সেপ্টেম্বর মাসে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি মার্কিন কংগ্রেসের কাছে অভিযোগ করেন যে, সামরিক সহযোগিতা স্থগিত রাখার প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি টেলিফোন আলাপ তিনি নিজে শুনেছেন। যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে চাপ দিয়েছেন তার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেন ও তার ছেলের বিরুদ্ধে তথাকথিত দুর্নীতির তদন্ত করতে। এর মাধ্যমে অভিযোগ ওঠে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০২০ সালের নির্বাচনে তার পক্ষে বিদেশি সহায়তা পাওয়ার জন্য দফতরকে ব্যবহার করেছেন। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং প্রেসিডেন্ট পদে পুন-নির্বাচনের প্রচারণায় সহায়ক হতো, এমন দুইটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের স্বার্থে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষতি করেছেন। এমনকি তিনি ইউক্রেনকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাকে ঘুষ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন।

এই অভিযোগ সামনে আসার পর ট্রাম্পকে ইমপিচ (অভিশংসন) করতে তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। কয়েক মাসের তদন্তের পর গত সপ্তাহে ট্রাম্পকে অভিশংসন করতে দুইটি অভিযোগ (আর্টিকেলস অব ইমপিচমেন্ট) প্রকাশ করে প্রতিনিধি পরিষদের জুডিশিয়ারি ও ইন্টেলিজেন্স কমিটি। তার প্রথমটিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের এবং দ্বিতীয়টিতে তার বিরুদ্ধে সংসদের কাজে বাধা দানের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এরপর গত শুক্রবার ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আর্টিকেলস অব ইমপিচমেন্ট অনুমোদন করেছে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের জুডিশিয়ারি কমিটি। ওই কমিটিতে ২৩-১৭ ভোটে আর্টিকেলস অব ইমপিচমেন্ট পাস হয়েছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট নেতাদের ম্যারাথন বিতর্কের পর এটি পাস হয়। ভোটের ক্ষেত্রে দলীয় বিভক্তি দেখা গেছে। কমিটির রিপাবলিকান সদস্যরা এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।

জুডিশিয়ারি কমিটি আর্টিকেলস অব ইমপিচমেন্ট অনুমোদন করার পর আগামী বুধবার এই প্রস্তাবের ওপর প্রতিনিধি পরিষদে পূর্ণাঙ্গ ভোটাভুটি হতে পারে। ৪৩৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে এটি পাস হতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট লাগবে। এই হাউজের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হাতে। কোনো ডেমোক্র্যাট সদস্য এর বিরুদ্ধে যাবে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। এ কারণে ট্রাম্প অভিশংসিত হচ্ছেন ধরেই নেওয়া যায়। আর এটা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিশংসিত হবেন ট্রাম্প। এর আগে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও অ্যান্ড্রু জনসন অভিশংসিত হয়েছিলেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো প্রেসিডেন্ট মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেই পদ হারান না। বিল ক্লিনটন ও অ্যান্ড্রু জনসনও পদ হারাননি। এর কারণ কোনো প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরাতে হলে তাকে সিনেটে দোষী সাব্যস্ত হতে হয়। আর এক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ সিনেটরের ভোট জরুরি।

প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনা আর্টিকেলস অব ইমপিচমেন্ট পাস হলে আগামী জানুয়ারির মধ্যে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত সিনেটে সংসদীয় বিচার শুরু হবে। আল জাজিরার এক খবরে বলা হয়েছে, জানুয়ারিতে সিনেটে সংসদীয় বিচার শুরু হবে। তবে এখনো কোনো দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। সিনেট মেজরিটি লিডার মিচ ম্যাককোনেল বলেছেন, প্রতিনিধি পরিষদে ইমপিচমেন্টের পক্ষে ভোট পড়লে সিনেটে সংসদীয় বিচার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। সিনেটে সংসদীয় বিচারে সভাপতিত্ব করবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি। তথ্য-প্রমাণ বিবেচনা করবেন সিনেটররা এবং প্রেসিডেন্টকে অব্যাহতি বা দোষী সাব্যস্ত করে ভোট দেবেন তারা। ১০০ আসনের সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরাতে। এখন সিনেটে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাকে সরাতে গেলে ৪৫ ডেমোক্র্যাট, দুই স্বতন্ত্র সদস্যের বাইরে ২০ জন রিপাবলিকান সিনেটরের ভোট লাগবে। জুডিশিয়ারি কমিটিতে রিপাবলিকান সদস্যদের ভূমিকার পর বলা যায়, সিনেটে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রায় হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে কম।

যদি কোনোভাবে ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পক্ষে ভোট পড়ে তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স হবেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট এবং তিনি ট্রাম্পের মেয়াদ পূর্ণ করবেন। এই মেয়াদ শেষ হবে ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি। তবে এতো কিছুর পরও ট্রাম্প নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। সব অভিযোগ অস্বীকার করে বারবার বলে আসছেন ডেমোক্র্যাটদের এই পুরো প্রক্রিয়া একটি ‘উইচ হান্ট’, ‘ধোঁকাবাজি’ আর ‘চালাকি’। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের ভাগ্যে কী হয়—সেটার দিকেই এখন চোখ সবার।