গাজীপুরে ফ্যান তৈরির ফ্যাক্টরিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়নের কেশরিতা এলাকায় লাক্সারি ফ্যান লিমিটেডের কারখানায় এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে পাঁচ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন রংপুরের মো. ফরিদুল ইসলাম (১৮), গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মারতা এলাকার রাশেদ (২৫), কেশরিতা এলাকার খলিল (২২) ও উত্তম (২৫)। এ ঘটনায় আহতরা হলেন কেশরিতা এলাকার আনোয়ার হোসেন ও সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়নের জামুনা গ্রামের মো. হাসান মিয়া। তাদের গাজীপুর শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মামুনুর রশিদ জানান, সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে ফায়ার স্টেশনের চারটি ইউনিটের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তারা পুরোপুরি আগুন নেভান। পরে দ্বিতীয় তলার ওপর নির্মিত টিনশেডের অভ্যন্তরে ১০ জন শ্রমিকের লাশ দেখতে পান তারা।
তিনি আরো জানান, প্রথমে দোতলার ছাদে তৈরি করা টিনশেডের ঘরের দরজার কাছে আগুনের সূত্রপাত হলে শ্রমিকেরা আত্মরক্ষায় ভেতরের দিকে চলে যান। পরেমুহূর্তে আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে শ্রমিকেরা আটকা পড়েন। আগুনের সঠিক কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাত্ক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানার দোতলার ছাদে তৈরি করা টিনশেডে ১৯ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। প্রাথমিক আলামত দেখে মনে হচ্ছে ১০ জনই ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ ও অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন।
এলাকাবাসী জানায়, ২০১৬ সালে কারখানাটি একটি ফ্ল্যাট বাসার মধ্যে ঐ এলাকায় গড়ে ওঠে। দোতলা ভবনের ছাদে একটি টিনশেড রয়েছে। ঐ শেডে কারখানার আর্মেচার সেকশন। সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে ঐ সেকশন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।
ঐ সেকশনের শ্রমিক ফয়সাল জানান, পুরো কারখানায় ৮০ জনের মতো শ্রমিক ছিলেন। আর কারখানার যে সেকশনে আগুন লাগে, সেখানে ১৯ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন।
লাক্সারি ফ্যান কাখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদ হাসান ঢালী জানান, সরকারি বিধি মোতাবেক নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া নিহত শ্রমিকেরা কারখানা থেকে যে বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাস পেতেন, তাদের পোষ্যদের আজীবন সেই সব সুবিধা প্রদান করা হবে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার সামসুন্নাহার জানান, কারখানাটিতে অব্যবস্থাপনা ও কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ছিল। কারখানাটিতে একটি মাত্র সিঁড়ি থাকায় শ্রমিকেরা বের হতে পারেননি। তারা আগুন থেকে বাঁচার জন্য টিনশেড ঘরের এক কোনায় গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানে তারা ধোঁয়ায় শ্বাসরোধে ও অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান।
ঘটনার পর পর গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম ও পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার, সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রীনা পারভীন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জাকি, র্যাব গাজীপুর পোড়াবাড়ী ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার লে. কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল মামুন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের জানান, ঘটনা তদন্তে গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. শাহিনুর ইসলামকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় দেওয়া হয়েছে সাত কার্যদিবস। এছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেকের লাশ দাফন ও পরিবহনের জন্য ২৫ হাজার টাকা প্রদানের ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক।
এদিকে রাত ১০টার দিকে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। নিহতদের স্বজনেরা লাশ শনাক্তের জন্য হাসপাতালে ভিড় করেন। লাশের মুখমণ্ডল ও দেহ আগুনে পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় লাশগুলো শনাক্ত করতে সমস্যা হয়।
