প্রকৃতির মাঝে সুইস ভ্যালি রিসোর্টে

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৯:৪৮

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৯টা হবে, আমি আছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে। এর মধ্যে মোবাইল ফোন ডেকে চলছে। মোবাইল ফোনে তাকিয়ে দেখি জাহাঙ্গীর স্যার ফোন দিচ্ছেন। আমি ফোন ধরতেই স্যার বলে উঠলেন, ‘কেমন আছ? আসছে ছুটির দিনে কোথাও যাচ্ছ নাকি?’ বললাম, ‘এখনো কোনো পরিকল্পনা করিনি, তবে নতুন কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা আছে।’ স্যার বললেন, ‘চলো সিলেটের মৌলভীবাজারের শমশের নগরের সুইস ভ্যালি রিসোর্ট থেকে ঘুরে আসি। শুনেছি জায়গাটা খুব সুন্দর।’ মনে মনে ভাবলাম, স্যারের অফারটা মন্দ নয়। যেই ভাবা সেই কাজ। যাওয়ার জন্য দিনক্ষণ ঠিক করে ফেললাম। দিবা প্রথম প্রহরে আমরা বের হলাম গন্তব্যের উদ্দেশে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছুটে চললাম গন্তব্য পানে। আমরা চলছি বিমানবন্দর স্টেশন, ভৈরব স্টেশন পেরিয়ে। সময়ে সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ভানুগাছ স্টেশনে। এবার এখান থেকে সুইস ভ্যালি রিসোর্টে পৌঁছাতে হলে সাত কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে হবে। আগের থেকেই গাড়ি ঠিক করে রাখা ছিল। আমরা চললাম সুইস ভ্যালি রিসোর্টের দিকে। সূর্যদেবের প্রখরতা এখনো বাড়েনি। যেতে যেতে আশপাশের গ্রামীণ পরিবেশ দেখতে ভালোই লাগছিল। দেখা পেলাম বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি ঘাঁটির। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা এসে পৌঁছালাম সুইস ভ্যালি রিসোর্টের প্রবেশ দ্বারে। গাড়ি থেকে নামতেই হাসি মুখে এসে উপস্থিত হলেন একজন। জাহাঙ্গীর স্যার পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘উনি রাকিব সাহেব সমগ্র রিসোর্টটির দায়িত্বে আছেন।’ আমরা এগিয়ে চললাম। অসাধারণ পরিবেশ, নেই কোনো কোলাহল, চারদিকে পাখির মিষ্টি ডাক। গাছের ডাল আর কাঠের তৈরি অসাধারণ ডিজানের আসবাবপত্রসমৃদ্ধ একটি কক্ষে প্রবেশ করলাম। রাকিব সাহেব বললেন, ‘এই হলো আপনাদের রুম। কোনো কিছু লাগলে বলবেন। আপনাদের জন্য আমাদের কর্মী বাহিনী সদা প্রস্তুত।’ বেশ পরিপাটি করে সাজানো রুম। যা স্বকীয়তার প্রমাণ দিয়ে যায় বারবার। গরমের দিন, তাই একটু ক্লান্তই লাগছিল। তবে রিসোর্টে প্রবেশ পর দেখা পেয়েছিলাম আঁকাবাঁকা সুইমিং পুলের। তাই ভাবলাম ক্লান্তি দূর করতে সুইমিং পুলের জলে ঝাঁপাঝাঁপি করতে পারলে মন্দ হয় না। যেই ভাবা সেই কাজ , দিলাম ঝাপ সুইমিং পুলে। সুইমিং পুলের গভীরতা এতো বেশী না তাই সাঁতার না জানলেও নিশ্চিন্তে নেমে পরা যায়। সুইমিং পুলে ঝাঁপাঝাঁপি পর এবার তো পেটপূজা করতে হয়, সেই কখন দানাপানি দিয়েছিলাম পেটে। আমার ঝাঁপাঝাঁপির ফাঁকে জাহাঙ্গীর স্যার আগের থেকেই লাঞ্চের মেন্যু কনফার্ম করে রেখেছিলেন, তাই খাবারের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়নি। সাদা ভাত, মুরগির মাংস, সবজি, দুই রকমের ভর্তা (টমেটো ও ধনেপাতা) এবং ডাল। প্রতিটি রান্নার অসাধারণ স্বাদ! রকিব ভাই বললেন, ‘সবকিছুই মাটির চুলায় রান্না।’ বললাম, ‘রান্নার স্বাদ অসাধারণ! এর কারণ তাহলে এটাই। খুবই তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছি।’ খাওয়া প্রসঙ্গে একটি কথাই বলব, দুদিনে আমরা মোটামুটি যা যা খেয়েছি, সবগুলোই খুব মজা লেগেছে। ডাইনিং রুমের আসবাবপত্র গাছের ডাল আর কাঠের তৈরি। অসাধারণ ডিজাইন। ও বলে রাখা ভালো, এখানে সকালে কমপ্লিমেন্টারি নাস্তা, আর দুপুর ও রাতে সেট মেন্যু, বিকেলের নাস্তা ওদের মেন্যু থেকে পছন্দ করে অর্ডার করা যায়। বিকেলে রিসোর্টের ভেতরেই ঘোরাঘুরি করে কাটালাম। এর মধ্যে দোলনায় চড়লাম। সেই ছোটবেলায় স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে দোলনায় খেলার কথা মনে পড়ে গেল। নাস্তা ও চা পর্বও চলল। ভেতরে ট্রি হাউস টাইপ কিছু জিনিস আছে, দোলনা, বাচ্চাদের স্লাইড, দূরে দূরে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের বসার জায়গা, পুলের পাশে ছাউনি, সেখানে আবার গদি দিয়ে আড্ডা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। রিসোর্টে বেশ কিছু পাকা, আধা পাকা ও কাঠের কটেজ আছে; যা আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রতিটি কটেজেই আছে ক্যাবল কানেকশনসহ টিভির ব্যবস্থা আর অত্যাধুনিক ফিটিংস-সমৃদ্ধ ঝাঁ-চকচকে বাথরুম। সুইসভেলির ডাইনিংটার চারপাশে খোলা। তাই ঠান্ডা বাতাসে আড্ডাটা বেশ জমে ছিল। রাতের বেলা আমাদের জন্য বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা হলো। আজকাল বারবিকিউ পার্টি ছাড়া ভ্রমণের স্বাদই পূর্ণ হয় না। পরদিন ঘুম থেকে উঠেই বেরিয়ে পড়লাম আশপাশের জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে। ঘুরে দেখলাম সুইসভেলির পাশের পাহাড়, ডানকানের চা-বাগান, কৃষি খামারের মাঝে দেখলাম ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত বিমানবন্দরের, নাম দিলজান্দ বিমানবন্দর। পাশে কয়েকটি প্রাকৃতিক হ্রদও আছে। শমশেরনগর চা-বাগানের কাছেই দেখলাম গলফ কোর্স। সব মিলিয়ে বেশ ভালো লাগল।

যে ভা বে  যা বে ন

 

ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের যেকোনো স্থান থেকে ট্রেনে বা সড়কপথে সরাসরি শমশেরনগর আসা যায়। ঢাকা থেকে আন্তনগর উপবন ট্রেনে সরাসরি শমশেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে নামা যাবে। এ ছাড়া আন্তনগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনে সাত কিলোমিটার দূরের ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনে নেমেও আসতে পারেন শমশেরনগর। আন্তনগর পারাবত ট্রেনে শ্রীমঙ্গল অথবা কুলাউড়া স্টেশনে নেমেও আসা যাবে।