স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনা করে প্রথম ধাপে ১০ হাজার ৭৮৯ রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। গত রবিবার প্রকাশিত ঐ তালিকায় অনেক ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়েছে বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজন ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। তারা প্রকাশিত তালিকা যাচাই-বাছাই করে পুনরায় প্রকাশ এবং জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
রাজশাহী থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, রাজাকারের তালিকায় জেলার পাঁচ বিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের নাম রয়েছে। এরা হলেন—আহমেদ আব্দুর রউফ, মো. মহসিন, আব্দুস সালাম, মো. গোলাম আরিফ ও এসএস আবু তালেব। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, অ্যাডভোকেট মহসিন আলী আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তানোর-গোদাগাড়ী আসনের সাবেক এমপি। অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু বর্তমানে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর। অ্যাডভোকেট আব্দুস সালামের এক ছেলেসহ পরিবারের পাঁচ জন পাকহানাদার বাহিনীর হাতে শহিদ হন। এছাড়া তালিকার অপর দুই জন হচ্ছেন—রাজশাহীর তত্কালীন জেলা প্রশাসক আব্দুর রউফ ও পুলিশ সুপার এসএস আবু তালেব।
এ প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু ইত্তেফাককে বলেন, ‘তালিকাটি যেভাবেই হোক না কেন এটির দায়-দায়িত্ব মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের। আমি তাদের বলেছি এটি সংশোধন করতে, নইলে আমি মামলা করব।’ তিনি আরো বলেন, ‘একটি ভালো উদ্যোগকে নষ্ট করা হচ্ছে। যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র জ্ঞান বা ধারণা নেই।’
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালামের মেয়ের জামাই ও বঙ্গবন্ধু পরিষদ রাজশাহী মহানগর শাখার বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আরিফুল হক কুমার ক্ষোভ প্রকাশ করে ইত্তেফাককে বলেন, ‘এ তালিকা তৈরিতে হয়তো রাজাকাররা কাজ করেছেন।’ এ ব্যাপারে স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ওয়ালিউর রহমান বাবু বলেন, ‘এটি মেনে নেওয়া যায় না।’
বরিশাল অফিস জানায়, ঐ তালিকায় জেলার নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতাপ্রাপ্ত অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তী এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও ভাষা সৈনিক মৃত মিহির লাল দত্তের নাম রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা তপন কুমার চক্রবর্তীর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তার মেয়ে বাসদ নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটিকে ‘রাজনৈতিক খেসারত’ আখ্যা দিয়ে লিখেছেন, ‘মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ কাজ করার পুরস্কার পেলাম আজ। ধন্যবাদ আওয়ামী লীগকে। আমার ঠাকুরদা সুধির কুমার চক্রবর্তীকে পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। তিনিও ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত। তার সহধর্মিণী আমার ঠাকুমা উষা রানী চক্রবর্তীকেও রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
মিহির লাল দত্তের ছেলে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) বরিশাল জেলা প্রতিনিধি শুভব্রত দত্ত জানান, তার পিতার ক্রমিক নং ২৮৯, মুক্তিভাতা নং ০৬০১০১১০৬০ এবং সনদ নং ম২৮৬১০৬। তিনি ভাষাসৈনিক ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং শরীরে বুলেট নিয়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০০৫ সালে মারা যান। তালিকায় প্রকৃত রাজাকারের নাম না এসে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার নাম আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুক্তিযোদ্ধার এই সন্তান।
আদমদীঘি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, রাজাকারের তালিকায় বগুড়ার থানা এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যসহ এক ডজনের বেশি শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম ছাপা হয়েছে। বিষয়টি রবিবার রাতে জানাজানি হবার পর সকল মুক্তিযোদ্ধা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিভ্রান্তিকর তালিকা তৈরির সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করা হয়েছে।
