সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স, সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (সিডা)
এবং দৈনিক ইত্তেফাক আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠক
মঙ্গলবার, ৩ ডিসেম্বর ২০১৯; মজিদা বেগম মিলনায়তন, ইত্তেফাক ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা।
প্রধান অতিথি: মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, উপমন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়
বিশেষ অতিথি: জুয়েনা আজিজ, সিনিয়র সচিব, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়
সভাপতি: তাসমিমা হোসেন, সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
বিষয় : ‘শিশু সুরক্ষা এবং শিশুর প্রতি শারীরিক ও
মানসিক শাস্তি নিরসনে করণীয়’।
সু পা রি শ
n শিশুর ওপর নির্যাতন বন্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। n শিশুদের সুরক্ষায় সরকার, বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। n মানসিক নির্যাতনের শুরুটা হয় ঘর থেকে। তাই মা-বাবা ও অভিভাবকদের সচেতনতা
সবচেয়ে আগে জরুরি। n আইনি কাঠামোয় শিশু নির্যাতনের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করা, শিশুকে শাস্তি না দিয়ে কীভাবে তাদের বিকাশ ঘটানো যায় তা মা-বাবা ও শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। n তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের মনোভাব বদলাতে
দেশজুড়ে সামগ্রিক সচেতনতা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। n শিশুদের ওপর সহিংস নির্যাতন সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধ এবং তা বন্ধ করার পথ খুঁজে বের করতে হবে। n শিশু নির্যাতন বন্ধে সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য পৃথক
মন্ত্রণালয় গঠন। n সরকারের জাতীয় পরিকল্পনায় শিশু নির্যাতনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা। n শিশুর ওপর শারীরিক ও
মানসিক নির্যাতন বন্ধ করার বিষয়টি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী মেনিফেস্টো ও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল
উপমন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়
শাসন না করেও শিশুদের সুশৃঙ্খল করার অনেক পন্থা রয়েছে। সেজন্য শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া অন্যায়, অপরাধও। শিশুর ওপরে নির্যাতন বন্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। শিশুদের প্রতি নির্যাতন করাটা আমাদের মজ্জায় মিশে রয়েছে। এটা মানুষের মানসিকতার এতটা গভীরে প্রোথিত যে, একে দূর করতে সমাজে ব্যাপক সংস্কার এবং শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। মা-বাবা, শিক্ষক এবং আত্মীয়স্বজনদের মানসিকতা পরিবর্তনের বিকল্প নেই। শিশুর বিকাশে কী করতে হবে— এ বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকরা অজ্ঞ। এ বিষয়ে আমাদের গবেষণা ক্ষেত্রেও বড়ো দুর্বলতা রয়েছে।
তাসমিমা হোসেন
সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
শিশু সুরক্ষায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ধারণার বদল ঘটেছে। মানসিকতারও পরিবর্তন ঘটছে। আমরা বুঝতে শিখেছি, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা অপরাধ। শিশুর স্বাভাবিক ও সুস্থ বিকাশ তার সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য, সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, তা আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু সেই সচেতনতা সমাজের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের মাঝে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং পরিবারের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। শিশুদের নির্যাতনকে ঘিরে সমাজে যে নীরবতার কঠিন বৃত্ত গড়ে উঠেছে, তা ভাঙতে হবে। শিশুদের সুরক্ষায় সরকার, বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
জুয়েনা আজিজ
সিনিয়র সচিব, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়
আইনে শাস্তির বিধান রাখতে হবে। তিনি শিক্ষক, মা-বাবা যে-ই হোন না কেন। মা-বাবা অবশ্যই শাসন করবেন। কিন্তু কঠোর নির্যাতন করা হলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। শিশুদের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এর পাশাপাশি আগামীতে শিশুর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন প্রতিরোধে সমন্বিত কার্যক্রম হাতে নেওয়া হচ্ছে।
একরামুল কবীর
ম্যানেজার, চাইল্ড রাইটস গভর্নেন্স ও চাইল্ড প্রটেকশন সেক্টর,
সেভ দ্য চিলড্রেন
মূল প্রবন্ধ সারসংক্ষেপ: ৭০টি দেশের ১৫০টি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, শিশুদের ওপর নির্যাতনে শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনে ক্ষতির মাত্রা বেশি হয়, যা তাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক গবেষনায় দেখা যায়, সাক্ষাত্কার গ্রহণের আগের এক মাসের মধ্যে এক থেকে ১৪ বছর বয়সের প্রায় ৮৯ শতাংশ শিশু মা-বাবা অভিভাবকদের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক শাস্তির শিকার হয়েছেন। এ বছরের গত ১০ মাসে ৪৩ শিক্ষার্থী শিক্ষকদের নির্যাতনের কারণে আহত হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একজন ফোকাল পারসন নিয়োগ অত্যন্ত প্রয়োজন। যিনি শিশু নির্যাতনের সব বিষয় সামগ্রিকভাবে তদারকি করবেন। এর পাশাপাশি, শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনে একটি পৃথক আইন প্রনয়ন করা। তৃণমূল পর্যায়ে শিশু নির্যাতন বন্ধে যেসব স্কুল নির্যাতন বন্ধ করেছে তাদের পুরস্কৃত করা, শিশুকে শাস্তি না দিয়ে কীভাবে তাদের বিকাশ ঘটানো যায়, তার জন্য মা-বাবা ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
উম্মে কুলসুম
যুগ্ম সচিব, আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়
আইন আছে। তার প্রয়োগও হচ্ছে। কিন্তু শুধু আইন থাকলেই হবে না। মানুষের মনোভাবও বদলাতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের সহিংস নির্যাতন সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধ এবং তা বন্ধ করার পথ খুঁজে বের করতে হবে। মানসিক নির্যাতনের শুরুটা হয় ঘর থেকে। মা-বাবাই সেটা শুরু করেন। পরিবারের মানুষের মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক সন্তান আত্মহত্যা করে। তাই শিক্ষক, মা-বাবা এদের শিশু বিকাশ ও লালন পালনের জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
আহনাফ আনাম অর্ক
শিশু প্রতিনিধি, ন্যাশনাল চিলড্রেন টাস্ক ফোর্স
শিশুদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে। সেই সঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের মতো পৃথক ‘শিশু কমিশন’ গঠন করাও জরুরি। পাশাপাশি প্রতিটি থানায় কমিশনের প্রতিনিধি রাখতে হবে। এই একবিংশ শতাব্দীতেও শিক্ষকরা এখনো ক্লাসরুমে ‘বেত’ নিয়ে আসে। আর পরিবারের মানুষরাই সবচেয়ে বেশি শিশু নির্যাতন করে থাকে। একইভাবে দেখা যায়, একজন মেয়ে শিশুকে বাল্যবিয়ের জন্য পরিবারের মানুষরাই বাধ্য করে।
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল
পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট
বড়োরা যদি শিশুদের প্রতি দয়া, সুবিবেচনা ও ভালোবাসা দেখায় তবে শিশুরাও এসব দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে। বড়োরা যদি নির্যাতন করে তবে শিশুরাও ক্রোধ, অন্যের কথা না মানা, সহিংস আচরণ রপ্ত করতে থাকবে। শিশুর আবেগ অনুভূতি বা আচরণ অনেক সময় বড়োদের কাছে অযৌক্তিক বা বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে, কিন্তু শিশুর জন্য এটা স্বাভাবিক ও বাস্তব। তাই এ ব্যাপারে পিতামাতা ও বড়োদের যথেষ্ট সহানুভূতিশীল হতে হবে। এর পাশাপািশ শিক্ষকদের অতি মাত্রায় বাণিজ্যিক না হয়ে, শিশুদের প্রতি সহিংস না হয়ে, মানবিক হতে হবে। শিশু নতুন কিছু শিখলে, তা যতই সামান্য হোক, তার সামনে সম্মতি, উত্সাহ ও আনন্দ প্রকাশ করা উচিত। সুস্বাস্থ্য, সুশিক্ষা, নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও ভালোবাসার দাবি পূরণ করে প্রতিটি শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিকশিত করে তোলা সম্ভব। যেটা শাস্তি দিয়ে সম্ভব নয়। তবে পিইসি জেএসসি পরীক্ষা শিশুদের জন্য মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।
অধ্যাপক কাজী ফারুক আহমেদ
চেয়ারপারসন, ইনিশিয়েটিভ ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট
সরকারের জাতীয় পরিকল্পনায় শিশু নির্যাতনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেই সঙ্গে শিশুর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করার বিষয়টি দলীয় নির্বাচনী মেনিফেস্টো ও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর পাশাপাশি শিক্ষক সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষকদের ক্লাসরুমে শিশু নির্যাতন বন্ধ করার প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে অন্যান্য সংস্থার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ।
অধ্যাপক তানিয়া হক
উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমাদের শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য পরিবারগুলোর ভূমিকা কী হবে, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কী হবে— এ রূপরেখা প্রণয়নে গবেষণা প্রয়োজন। লিঙ্গবৈষম্যের সবচেয়ে বড়ো কারখানা হচ্ছে পরিবার। সেখানেই লিঙ্গবৈষম্য সম্পর্কে একটা শিশু শেখে। সেখানেই শিশুটি শেখে ছেলে হিসেবে সুবিধা পেতে এবং মেয়ে হিসেবে সব অনাচার মেনে নিতে। ফলে শিশুদের নিরাপদ সুন্দর শৈশব দিতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। আমাদের শিশুরা ‘কেয়ার ক্রাইসিস’-এর শিকার। শিশু নির্যাতন বাড়ছে, বাড়ছে ধর্ষণ। মোবাইলে গেম খেলে শিশুদের আত্মহত্যা করার খবর আমরা পাচ্ছি। এতে শিশুদের ওপর যে খারাপ প্রভাব পড়ছে সেটা নিয়ে আমরা বড়োরা চিন্তা করছি না। শিশুদের ওপর প্রকৃত নজর রাখছি না।
আবদুল্লা আল মামুন
পরিচালক, চাইল্ড রাইটস গভর্নেন্স ও চাইল্ড প্রটেকশন সেক্টর,
সেভ দ্য চিলড্রেন
শিশুর প্রতি নির্যাতন বন্ধে পরিবারের দায়িত্বই প্রধান। উপদেশ দেওয়া খুব সহজ কিন্তু শিশুদের বিকাশে তাদের প্রতি মানবিক হয়ে তাদের বড়ো করে তোলা খুব কঠিন। তাই শিশুদের উপদেশ ও শাস্তি না দিয়ে তাদের প্রতি আমাদের মানবিক হতে হবে। শিশুদের সুরক্ষার জন্য সার্বিক গবেষণা খুব একটা নেই। সেভ দ্য চিলড্রেন একটা সামিগ্রক গবেষণা করছে; যা আগামীদিনে শিশু নির্যাতন বন্ধে করণীয় ঠিক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পথ দেখাবে।
মিথিলা ফারজানা
গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব
শিশুদের শাসন করা, শারীরিক শাস্তি দেওয়াটা আমরা স্বাভাবিক বলে মনে করি। অনেকেই মনে করেন এভাবেই শিশুর শিক্ষা হবে, তাকে ভুল পথ থেকে ঠিক পথে ফেরাতে হলে। কিন্তু ধারণাটা ভুল। বরং আমরা দেখি, যারা সবল কিংবা বড়ো তারাই ছোটো ও দুর্বলের ওপর সহিংস আচরণ করে। আমরা দেখি, পরিবারে বাবা মাকে নির্যাতন করে, গাড়ির ড্রাইভার রিকশাওয়ালাকে মারে, শিক্ষক ছাত্রকে মারে—এটাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিই। দরিদ্রদের আবাসিক শিক্ষা দেওয়া হয় যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সেখানে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের চিত্র ভয়াবহ। কিন্তু আমরা তা প্রতিরোধ করতে পারছি না। শিশুর ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে তাই আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন, প্রয়োজন সামগ্রিক সচেতনতার।
সাবিনা সুলতানা
সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম
আমাদের শিশুদের জন্য ভয়ভীতিহীন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমালোচনা থাকবে না। শিশুদের ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠতে দিতে হবে। আমার পাঠদান প্রক্রিয়ায় শিশুরা যাতে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
নাসিমা আক্তার জলি
সম্পাদক, জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি শিশুর ভুলকে বড়োদের দোষের সঙ্গে তুলনা করে তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। সরকারি বেসরকারি সব স্কুলকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। এজন্য সরকারের সদিচ্ছা এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষত সরকারের এসডিজি অর্জনের পথে শিশু নির্যাতনের এই বাধা কাটিয়ে উঠতে কার্যকরী উদ্যোগ জরুরি। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, শিশুদের শৃঙ্খলা শিক্ষা মানে তাদের শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দেওয়া নয়।
এস এম রেজাউল করিম
আইন উপদেষ্টা, ব্লাস্ট
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বাংলাদেশে আইন রয়েছে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন খুব একটা দেখা যায় না। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে যে আইনগুলো রয়েছে তার বিধিমালা এখন পর্যন্ত প্রণয়ন করা হয়নি। ফলে শিশু নির্যাতনের বিপরীতে আমরা কোনো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারছি না। এ কারণে শিশু নির্যাতন কমছে না। দিন দিন বাড়ছে।
তৌহিদুল হক
সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমরা দেখতে পাই মা-বাবা ও শিক্ষকদের বাল্যকালও এ ধরনের নির্যাতনের মধ্য দিয়েই কেটেছে। ফলে তাদের মনেও শাসনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হচ্ছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া। তাই আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আমাদের আগে বুঝতে হবে, যে প্রক্রিয়ায় আমরা সন্তানদের শাসন করি, সেটা তাদের মানসিক বিকাশ ও তাদের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর। তা না হলে এটা বন্ধ করা যাবে না। তাই সবকিছুর আগে বড়োদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।
শামীম ফেরদৌস
নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন
শিশুকে শাসন করা মানে তাদের আঘাত করা নয়; সাধারণ মানুষ জানেও না যে, এটা ভুল পন্থা। ফলে তারা শিশুদের শাস্তি দিয়ে শোধরানোর প্রাচীন শিক্ষা পদ্ধতিকে অনুসরণ করে। কিন্তু এটা যে শিশুদের সারাজীবনের জন্য ক্ষতি ডেকে আনছে সে সম্পর্কে তারা একেবারেই অজ্ঞ। তাই সাধারণ মানুষকে অর্থাত্ প্রান্তিক পর্যায়ে কীভাবে মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন করে তোলা যায়, সেই পথ খুঁজে বের করতে হবে আমাদের।
রাফেজা আক্তার শাহীন
সমন্বয়ক, শিশু সুরক্ষা, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
এ সমস্যা দূর করতে হলে আমাদের বুঝতে হবে, শিশুর সঙ্গে মা-বাবা শিক্ষকের দূরত্বটা কোথায়। শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন দিয়ে শাস্তি দিয়ে মানসিকতা পরিবর্তন করা যায় না। শারীরিক শিশু নির্যাতনের কারণে এটা একটা উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু আমাদের মাঝে নৈতিকতা, সহনশীলতার বোধ গড়ে তুলতে হবে। নির্যাতন কেন হচ্ছে, সেই কারণ খুঁজতে গবেষণা জরুরি। কারণ খুঁজে পেলেই আমার তা সমাধানের পথ তৈরি করে নিতে পারব।
ফারজানা ফাতেমা
প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর, ব্লাস্ট
প্রান্তিক পর্যায়ে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতের ক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবকদের উপলব্ধির ঘাটতি রয়েছে। একটি শিশু যখন কোনো দোষ করছে, সেটা দূর করতে তাকে কঠিন শারীরিক শাস্তি দেওয়া সমাজে খুব স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে এবং সঠিক পন্থা বলেই প্রচলিত। এই রকম অমানবিক কঠিন শাস্তি প্রদান করা হলে এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। আর তা মিডিয়ার ফলাও করে প্রচার করা হলে তা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে। এজন্য শিশু নির্যাতন আইনের বিধিমালা দ্রুত করা প্রয়োজন। কেননা আইনে শাস্তি দেয়ার কথা বলা আছে কিন্তু কোন অপরাধে কি শাস্তি দিতে হবে সেই বিধিমালা থাকতে হবে।
আবদুস শহিদ মাহমুদ
পরিচালক, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিশু নির্যাতন কমেনি বরং বেড়েছে। সেই সঙ্গে পাল্টেছে এর ধরন। এর মধ্যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন রয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে মাদ্রাসার শিক্ষকদের যৌন নির্যাতন। তাই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের প্রতি আচরণ কী হবে— সেটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী দুজনেই তাদের সীমারেখা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে। মা-বাবা ও শিক্ষকদের মানসিকতার বদল ঘটাতে হবে। তাদের বুঝতে হবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন না করেও একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করা সম্ভব। আমি বলবো নির্যাতন না হলে শিশুর মানসিক বৃদ্ধি সুস্থ ও স্বাভাবিক হবে। যা আমাদের একটি সুন্দর ও সুস্থ নাগরিক উপহার দেবে। এর পাশাপাশি শিশুদের উপরে নির্যাতনের ক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এটা করা সম্ভব হলে শিশুদের প্রতি নির্যাতন কমে আসবে।
এ কে এম মুসতাক আলী
নির্বাহী পরিচালক, ইনসিডিন বাংলাদেশ
সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক অনৈক্য দেশের জনগণকে মানসিক চাপে রেখেছে। শিশুদের প্রতি সহিংস আচরণের পেছনে অর্থনৈতিক অনৈক্য খুব বড়ো কারণ। উন্নয়ন চিন্তার মূল বিষয় সামগ্রিক উন্নয়ন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু নয় এর পাশাপাশি দেশের জনগণ, শিশু, নারীসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নও সমানভাবে প্রয়োজনীয়। সেটা না হলেই সমাজে অনাচার বাড়ে। আমাদের দেশে বর্তমানে উন্নয়নের জোয়ার চলছে তবে সেই উন্নয়নের নিচে রয়েছে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে শিশুদের বিকাশ আটকে রয়েছে।
মো. আনোয়ারুল ইসলাম শিকদার
সাবেক সচিব
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের অনেক আইন রয়েছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের সচেতনতা বাড়নোর বিকল্প নেই। একটি শিশুকে লাঠি দিয়ে পেটালে যে তার মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি হবে, এটা আমরা জানি না, বোঝার মতো মানসিক বিকাশ অভিভাবকদেরও নেই। তাই শিশু নির্যাতন বন্ধের জন্য স্কুলের পাঠ্যক্রমে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
আমিরুল হক
আইনজীবী
দেশে শিশু নির্যাতন বন্ধে আইন থাকলেও আমাদের প্রধান সমস্যা সাংস্কৃতিক। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক শাস্তি বন্ধে সরকার এবং বেসরকারি পর্যায়ের সংস্থাগুলো কাজ করছে। তাদের লক্ষ্যও এক। কিন্তু এ সমস্যা দূর করতে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
জামাল উদ্দীন
সঞ্চালক, বিশেষ প্রতিনিধি, ইত্তেফাক
এ আলোচনা থেকে প্রাপ্ত সুপারিশ শিশু নির্যাতন বন্ধে সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে পথনির্দেশনা দিতে সক্ষম হবে। যা শিশুদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যত্ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে। আমরা দেখছি সরকার বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শিশু নির্যাতন বন্ধে কাজ করছে। আমাদের আজকের এই আলোচনা তাদের সেই পথচলাকে বেগবান করবে— এটাই প্রত্যাশা।
