নূর কামরুন নাহার
চলমান সমাজ বাস্তবতা আর প্রথাগত সুন্দরের সংজ্ঞাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে মিস ইউনিভার্স ২০১৯-এর মুকুট মাথায় পরেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মেয়ে জোজিবিনি তুনজি। আটলান্টায় গত ৯ ডিসেম্বর বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতার আসরে ৯০ জন সুন্দরীকে পেছনে ফেলে তিনি জিতে নেন এই মুকুট।
সৌন্দর্য মানে যে সাদা চামড়া নয়, বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, সৌন্দর্য যে আরো অনেক ব্যাপক ও বড়ো বিষয়, সেটিই প্রমাণিত হলো এবারের বিশ্বসুন্দরীর এই জমকালো আসরে। শিরোপা বিজয়ের জন্য তুনজির সৌন্দর্যকে বিচার করা হয়েছে তার বুদ্ধিমত্তার মাপকাঠিতে। বিশ্বসুন্দরীর আসরে তুনজি দেখিয়েছেন তার চমত্কার বুদ্ধিমত্তা। বুদ্ধিমত্তা আর মেধার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল সৌন্দর্য, সেটি খুব ভালোভাবেই জানেন এই আত্মবিশ্বাসী নারী। তাই বিচারকেরা যখন প্রশ্ন রাখেন, এমন কী জিনিস আধুনিক মেয়েদের শেখানো উচিত? এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘নেতৃত্বের ক্ষমতা।’ তারপর উচ্চারণ করেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো শক্তি নারী শক্তি। তাই প্রত্যেক নারীকে সুযোগ দেওয়া উচিত, যাতে সে তার বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটাতে পারে। জোজিবিনি তুনজির এই উত্তরের পর আলোড়ন পড়ে যায় দর্শক সারি আর বিচারকদের মধ্যে।
তুনজি মনে করেন, নারী পিছিয়ে আছে আর এই পিছিয়ে থাকার পেছনে দায়ী হচ্ছে সমাজ। তুনজির মতে, ‘নেতৃত্বের ক্ষমতা না থাকার কারণেই পিছিয়ে রয়েছে নারীরা। তবে এর জন্য কোনোভাবেই নারীরা দায়ী নয়। দায়ী সমাজ। তারাই নারীদের জন্য এমন ব্যবস্থা করে রেখেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের সুযোগ দেওয়া দরকার। কিশোরী বা যুবতিদের তাই শেখানো উচিত কীভাবে নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে হবে।’
বর্ণবাদী সৌন্দর্য চিন্তায় ‘গায়ের রং’কে অতিমাত্রায় প্রাধান্য দেওয়ায় বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির একটি বড়ো স্থান দখল করে আছেন প্রসাধন ব্যবসায়ীরা। গায়ের রংকে উজ্জ্বল করার জন্য তৈরি করা হচ্ছে হাজারো প্রসাধনী। এসব প্রসাধনী গিলে খাওয়াতে জুড়ে দেওয়া হয়েছে চটকদার বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনী ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, সাদা ত্বক হচ্ছে সৌন্দর্যের অন্যতম মাপকাঠি। ২০১৭ সালে মধ্যপ্রাচ্যে বিপণন করা জার্মানির বিখ্যাত এক প্রসাধনী প্রতিষ্ঠানের পণ্যের বিজ্ঞাপনের স্লোগান ছিল ‘সাদাই বিশুদ্ধতার প্রতীক’। বিজ্ঞাপনটি প্রচারের সঙ্গে সঙ্গেই মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, অভিযোগ ওঠে এটি বর্ণবৈষম্যকে প্ররোচিত করছে। ব্যাপক প্রতিবাদ আর পণ্য বর্জনের কারণে বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
নারীর স্বপ্ন, ভাবনা আর মেধার জগতে দৃঢ় স্থান নিয়েছে এই ‘ফর্সা ত্বক’। আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোতে প্রাত্যহিক জীবনের অংশ ‘গায়ের রং’। বিশেষ করে নারীর চিন্তার ও শ্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্যয় হয় ঘষেমেজে চামড়ার রংকে উজ্জ্বল করায়। ফিলিপাইনের নারী এমা ত্রিনিদাদ ভারতের বেঙ্গালোরে বিউটি সেলুন ও স্পা পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি ভারতে এসে গায়ের রঙের ওপর নির্ভর করে বিয়ের সম্ভাবনা দেখে অবাক হয়ে যাই।’
বাজার বিশেষজ্ঞ ও গবেষক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রি এনালিস্ট ২০১৭ সালের জুনে এক প্রতিবেদনে পূর্বাভাষ দেয়, আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে ত্বকের রং ফর্সাকারী প্রসাধনীর বাজার তিনগুণ বেড়ে ৩১.২ বিলিয়ন ডলারে পরিণত হবে। রং ফর্সাকারী বিভিন্ন পণ্যের সবচেয়ে বড়ো ও দ্রুত বর্ধণশীল বাজার হচ্ছে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো। ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কায় রং ফর্সাকারী পণ্যের বড়ো বড়ো বিলর্বোডে ঝুলতে দেখা যায় ফর্সা ত্বকের মোহ আর জাদুকরী আকর্ষণের কথা। ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, ভালো চাকরির নিয়ামক হচ্ছে এই ত্বক ফর্সার ক্রিম। ফেয়ারনেস ক্রিম মেখে চাকরি হয়ে যাচ্ছে এক তরুণীর আর বলা হচ্ছে জীবন পালটে দেব এই ক্রিম। বিজ্ঞাপনের এই ঘোরে পড়ে নারী মেধা ও বুদ্ধিকে শানিত করার চেয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছে সৌন্দর্য বাড়াতে। সৌন্দর্যের এই ধারণা আরো মজবুত এবং এর বাজার আরো বিস্তৃত করার জন্য এখন নারীর সঙ্গে যোগ করা হয়েছে পুরুষকে। বাজারে নিয়ে আসা হয়েছে মেনস ফেয়ারনেস ক্রিম।
সৌন্দর্যের ধারণা গড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের বিজ্ঞাপন ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এতে যেমন সৃষ্টি হচ্ছে বর্ণবাদ, তেমনি লুটের নেওয়া হচ্ছে ব্যাবসায়িক ফায়দা। বর্ণবৈষম্য আর সৌন্দর্যের এই বাজারি ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ২০০৯ সালে কবিতা ইমানুয়েল ভারতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘Women of Worth’ নামে এনজিও এবং শুরু করেন Dark is Beautiful আন্দোলন।
সৌন্দর্যের এই সামাজিক ও বাণিজ্যিক সূচক কালো মানুষের আত্মবিশ্বাসকে নানাভাবে প্রভাবিত করে, চিন্তায় বৈকল্য আনে এবং নিজের প্রতি একধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে, আর সাদা চামড়ার মানুষগুলোকে নিজেকে উঁচু ভাবার অহমিকায় ভোগায়। সৌন্দর্যের এই প্রথাগত ধারণা বিশ্বকে ভাগ করে দেয় বৈষম্যে আর দুটি বর্ণে। বিশ্বব্যাপী বর্ণবাদী এই সৌন্দর্য ধারণার বিপরীতে জোজিবিনি তুনজির ‘মিস ইউনিভার্স’ শিরোপা লাভ সৌন্দর্যকে নতুনভাবে দেখার চমত্কার সম্ভাবনাকে উজ্জীবিত করে। একটি মানবিক পৃথিবী গড়ার পক্ষে এই রায় আশাবাদ সৃষ্টি করে। সৌন্দর্য যে শুধু দৈহিক বিষয় বা সাদা চামড়া নয়, সৌন্দর্যের সঙ্গে যে বুদ্ধিমত্তা ও মেধা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত, এই সত্য যত বেশি অনুধাবন করা যাবে, ততই পৃথিবী এগিয়ে যাবে সংহতি আর সমৃদ্ধির দিকে।
n লেখক :কথাশিল্পী
