স্কুলে স্কুলে ভর্তিযুদ্ধ

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৪০

বত্সর শেষে বিদ্যালয়গুলিতে শুরু হইতেছে শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম। ইতোমধ্যে নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হইয়াছে রাজধানীর ৪২টিসহ সারাদেশের ৩৫৮টি সরকারি স্কুলে নূতন শিক্ষাবর্ষে অনলাইনে ভর্তির আবেদন প্রক্রিয়া। স্কুলে প্রথম হইতে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির জন্য আবেদন করিয়াছে ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার শিশু। অথচ আসন আছে মাত্র ৭১ হাজার ২৬৩টি। কেবল প্রথম শ্রেণিতেই ২ হাজার ৩২৮টি আসনের জন্য আবেদন করিয়াছে ৩৬ হাজার ২৪২টি শিশু। রাজধানীর প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতা হইবে আরো কয়েক গুণ বেশি, যেইখানে ১১ হাজার ৯২০টি আসনের জন্য আবেদন করিয়াছে ৭৭ হাজার ৪৩৫ শিশু। বস্তুত, আবেদনকারী শিশুদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাইতেছে, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় শহরে অবস্থিত ৩৫৮টি নামিদামি স্কুলের প্রতিটি শ্রেণিতেই ভর্তির জন্য ব্যাপক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হইতে হইবে শিশুদের। উল্লখ্য, এইবারও দ্বিতীয় হইতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি করা হইবে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে; প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হইবে লটারির মাধ্যমে। তবে এইবার ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হইয়াছে। সৃজনশীল বা রচনামূলক প্রশ্নের পরিবর্তে অল্প কথায় বা এককথায় উত্তরদানের মতো প্রশ্ন থাকিতেছে। অধিদপ্তর বলিতেছে, শিক্ষার্থী মূল্যায়নে অধিকতর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করিতে প্রশ্ন পদ্ধতিতে এই পরিবর্তন আনার পদক্ষেপ নেওয়া হইয়াছে।

মানসম্পন্ন স্কুলের স্বল্পতায় ভালো মানের প্রতিষ্ঠানগুলিকে ভর্তির সর্বোচ্চ চাপ সামলাইতে হয়। আর এই চাপ স্বাভাবিকভাবেই বেশি পড়ে রাজধানীর প্রতিষ্ঠানগুলিতে। নামি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি বাদ দিলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রধান আকর্ষণের জায়গা হইল সরকারি সংযুক্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলি। খুব আহামরি না হইলেও এইগুলিতে তুলনামূলক ভালো মানের শিক্ষা দেওয়া হয়। মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করা হয়। আছে ভালো অবকাঠামোও। সকল দিক চিন্তা করিলে এই সকল প্রতিষ্ঠানে শিশুরা লেখাপড়ার জন্য আগ্রহী থাকে। কিন্তু আমরা এখনো এই ধরনের প্রতিষ্ঠান খুব বেশি গড়িয়া  তুলিতে পারি নাই। গত কয়েক বত্সরে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান কিছুটা বাড়িলেও তাহা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে ভর্তির সংকটকে পুঁজি করিয়া নগরের নামিদামি বেসরকারি স্কুলে চলে ডোনেশন বাণিজ্য। তাহারা অভিভাবকদের নিকট হইতে মোটা অঙ্কের টাকা হাতাইয়া নেয় স্কুল ভবন উন্নয়নসহ বিভিন্ন ফির নামে। উপরস্তু, বাণিজ্য চলে শিক্ষার্থীদের শার্ট-প্যান্ট বানানো, বই-খাতা-পেনসিলসহ শিক্ষাসহায়ক সরঞ্জামের নামে। নির্দিষ্ট দোকান হইতে ঐ সকল কিনিতে তাহারা শিক্ষার্থীদের বাধ্য করেন।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, দেশে পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকিলেও সরকারি-বেসরকারি স্কুলগুলি ভালো মানের শিক্ষা প্রদান করিতে না পারায় অভিভাবকেরা বাধ্য হইয়া নিজের  ছোট্ট সন্তানকে শিক্ষাজীবনের শুরুতেই অসম একটি প্রতিযোগিতায় ঠেলিয়া দিতে বাধ্য হন। পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর জন্য শিক্ষাবর্ষ লস, স্কুল দেখার আগেই কোচিংয়ে নামাইয়া দিয়া শিশু শিক্ষার্থীর জীবন বিষাইয়া তোলার মতো ন্যক্কারজনক বিষয় তো আছেই। শিক্ষার্থী ভর্তিতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও পাওয়া যায় প্রতি বত্সরই। অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে এবং শিক্ষার্থীদের অহেতুক হয়রানি হইতে বাঁচাইতে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলিতে মানসম্মত শিক্ষা ও উন্নত ভবিষ্যত্ গড়িবার উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নাই। আমরা মনে করি, ‘ভর্তিযুদ্ধ’ নামের হয়রানি হইতে শিশুদের রক্ষা করিতে সরকারি-বেসরকারি স্কুলগুলির শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সকল স্কুলের শিক্ষার মান কাছাকাছি হইলে শিক্ষার্থীদের ইঁদুর দৌড় দৌড়াইতে হইবে না; অভিভাবকেরাও অহেতুক হয়রানির মুখে পড়িবেন না।