অথির চক্রবর্তী
টোকন, স্যার আশুতোষ পাইলট বয়েজ স্কুলে ভর্তি হয়েছে। সবাই অবশ্য এত বড়ো করে স্কুলের নামটা বলে না। কেউ যখন জানতে চায়, তুমি কোন স্কুলে পড়ো খোকা? স্কুলের অনেককেই টোকন দেখেছে—আশুতোষ পাইলট বয়েজ স্কুলকে ছোট করে বলতে—এপি স্কুল। সে এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারে এটাই নাকি সবচেয়ে পুরনো স্কুল এই মফস্বল শহরে এবং এই স্কুলের চারদিকে অনেক সুনাম। প্রতি বছর এই স্কুল থেকেই কম করেও ডজনখানেক জিপিএ ফাইভ থাকে। স্কুলের শিক্ষকদের সবাই মোটামুটি বয়স্ক। দু-একজন তরুণ শিক্ষক অবশ্য আছেন।
আগের স্কুল থেকে টিসি নিয়ে এসে বাবা ভর্তি করিয়ে দিলেন তাকে এই স্কুলে। টোকনের মনে হয়েছে—এই মফস্বলে আসার জন্যই বাবার এতকিছু প্ল্যান! বাবা তার নিজের বদলিটাও করিয়েছেন, আর টোকনের নতুন করে সব শুরু হলো। তিনি এরকম জায়গাই বরাবর পছন্দ করেন কিনা! মাঝে মাঝে পত্রিকাতেও কী সব গল্প, কবিতা লেখেন। এগুলো আবার সুন্দর ইলাস্ট্রেশনে বের হয়।
টোকনদের স্কুলটা নতুন রং করা হয়েছে। সাদা রঙের এই স্কুলটার একজন এখন টোকন। অন্য স্কুলে সে ক্যাপ্টেন ছিল। এ স্কুলটাও কি তাকে ক্যাপ্টেন করে নেবে? কিন্তু ক্লাসের ছেলেরা কয়দিন হয়ে গেল, এই স্কুলে আসার পর থেকে তার সঙ্গে এখনো ভালোমতো কথা পর্যন্ত বলছে না! কী কঠিন অবস্থা! সবাই যদি ঠিকমতো কথা না বলে, সে ক্যাপ্টেন হবে কী করে? টোকন প্রচুর ভূতের গল্পের বই পড়েছে। বাবা তাকে কত রকম গল্পের বই কিনে দেন। সে কারণে তার স্টকে অনেক অনেক ভূত! ভাব জমানোর জন্য সে ক্লাসের দু-একজনের সঙ্গে ভূতের গল্প বলার চেষ্টা করে। এরমধ্যে একজন ইঁচড়েপাকা আঙুলে তুড়ি মেরে বলে উঠল, এখানে নয়, সাহস থাকলে আজ রাতে স্কুলের ছাদে আয়, তারপর ভূতের গল্প বল! অনেকের মধ্যে হাসাহাসির রোল পড়ে গেল। ব্যাপারটা চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে এখন টোকনের জন্য!
টোকন বাবা ও মাকে ফাঁকি দিয়ে স্কুলে চলে আসে ঠিক ঠিক। সময় রাত আটটা ছুঁই ছুঁই। সে ছাড়াও আরো কয়েকজন শ্রোতা আছে। কিন্তু যে চ্যালেঞ্জ করেছিল সে আসেনি। টোকন গল্প শুরু করবে, ঠিক সে মুহূর্তে একজন লোককে আসতে দেখা যাচ্ছে চাঁদের আলোয়। লোকটাকে একটু অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে পা টেনে টেনে আসছেন। একজন টোকনকে হিসস্ ধরনের শব্দ করে চুপ করিয়ে দেয়। টোকন ঠিক বুঝতে পারে না, কী হলো। তখন ছেলেদের একজন ফিসফিস করে তাকে বলল, আরে চিনিস না? উনিই আশুতোষ স্যার! এই স্কুলের জমিটা তার দেওয়া। পাইলট ছিলেন একসময়। কিন্তু সবাই তাকে ভালোবেসে স্যারই ডাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় চাকরি ছেড়ে পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। যুদ্ধে অবশ্য ধরাও পড়ে গিয়েছিলেন। পরে এই স্কুলের ওদিকের একটা রুমে নিয়ে রাতের বেলা তাকে নির্মমভাবে টর্চার করে ওই হারামিরা। এরপর থেকেই তিনি খোঁড়া, মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। হঠাত্ হঠাত্ রাতের বেলা ওই রুমে ঢুকে বসে থাকেন। কখনো আবোল-তাবোল বকতে থাকেন!
হঠাত্ টোকনসহ সবাই নিচ থেকে একটা চিত্কার শোনে, ‘আমি কিছু জানি না, আমাকে মেরে ফেলো, আমি কিছু বলব না’
টোকন ও বাকিরা ছাদ থেকে তাড়াহুড়ো করে নামে। আশুতোষ স্যারকে দেখার জন্য সবাই একটা আড়াল বেছে নেয়। দেখে, ওই রুমে তখনো তিনি সমানে চিত্কার করে যাচ্ছেন। তারপর হঠাত্ ঝরঝর করে কেঁদে ফেলছেন! পেছনে ভূতের গল্প শুনতে আসা বন্ধুরা। ওদের মুখ দেখে মনে হলো, কারো আর ভূতের গল্প শোনার আগ্রহ নেই।
