বাদল বিহারী চক্রবর্তী
বাংলার লোককথা, লোককড়চা তথা লোকসাহিত্যের আলোচনা করতে গেলে আমরা জেনে আসছি যে, লোকসংস্কৃতিই বঙ্গসংস্কৃতির প্রধান ধারা। আবহমান বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় নিঃসন্দেহে প্রোথিত রয়েছে এই ধারার মর্মমূলে। একটা সময় ছিল, এদেশে তখনো নগরায়ণ হয়ে ওঠেনি, তখন থেকে আজ অব্দিও সংস্কৃতির শেকড় যে পল্লিতেই নিহিত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কাজেই দেশজুড়ে যত জেলা-উপজেলার ব্যাপ্তি রয়েছে, সেগুলো মূলত গ্রামীণ জীবন-চেতনারই নামান্তর। প্রসঙ্গত প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী তার ‘লোক সংস্কৃতি বিবেচনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘জীবন-জীবিকা, আচার-প্রথা ও প্রকৃতিই সংস্কৃতির নিয়ামক। মূলত কৃষি-জীবন ও নদ-নদী বাংলার সংস্কৃতিকে নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করছে। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামই ছিল বাংলার প্রাণকেন্দ্র এবং সংস্কৃতির উত্স, লালন ও বিকাশ ক্ষেত্র। এই গ্রামকেন্দ্রিক সংস্কৃতির মধ্যেই বাংলা ও বাঙালির আত্মপরিচয় প্রচ্ছন্ন আছে’।
শত নদীর জালবোনা বাংলাদেশ। বলা হয়ে থাকে—ধানের দেশ, পাটের দেশ, মাছের দেশ আর পললভূমি সম্বলিত উর্বর এক ভাটির দেশ আমাদের এই মাতৃভূমি। এখানকার পল্লিনির্ভর মানুষগুলোর সর্বাঙ্গে একদিন মাটির গন্ধ আর মাছে-ভাতে বাঙালিয়ানার রূপ পরিলক্ষিত ছিল। সে সময় পল্লির অজ স্থানে আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন সমাজ জীবন ও এর সংস্কৃতিকে যুগ যুগ ধরে শহুরে আধুনিক সমাজ প্রগতির বিবেচনায় পশ্চাত্পদ মনে করা হলেও এই হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতি, তথা লোককড়চার অনুসন্ধান ও সংগ্রহ ছিল চোখে লাগার মতো এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। আমরা মৈমনসিংহ গীতিকার কথা জানি, জানি পূর্ববঙ্গ গীতিকার কথাও। পাশাপাশি গর্ব জাগে আমার ঐতিহ্যবাহী এ জেলার একজন ভূমিপুত্র হিসেবে। নিবন্ধে সেই গীতিকার মতো বিশাল সমুদ্রে অবগাহন না করলেও বাংলার নদীবহুল স্রোতধারার কিছুটা ঢেউ দু’হাত ভরে তুলে নিয়ে এদের ছলাত্ ছলাত্ শব্দসদৃশ লোক-কড়চা হেঁয়ালি ও ছন্দের পরিমুগ্ধতা উত্সাহী পাঠকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের এমন কিছু পুঁথি, প্রবাদ, কড়চা, হেঁয়ালি ও ক্ষেত্রবিশেষে লোকগান আমার সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এসবের মধ্যে কোনোটার পটভূমিও বেশ মজার, কিশোরগঞ্জের তেমনি একটি পুঁথি, যার পটভূমিটা আমার স্বর্গীয়া মাতা—সুনীতি বালা দেবীর মুখ থেকে শোনা। কিশোরগঞ্জের গচিহাটা বনগ্রামের বিখ্যাত সর্দারবাড়ি মায়ের জন্মস্থান। পারিবারিক পদবি ব্রাহ্মণ—‘রায়’ ছিলেন বিধায় অলিখিত কিংবদন্তি পুঁথিটাতে এ পদবি ব্যবহার করা হয়েছে, যার পটভূমির ছোট্ট গল্পটি পুঁথির মর্মার্থকে বোঝাতে সাহায্য করে। গল্পটি হলো... একদিন এক রাজার ইচ্ছে হলো তিনি খুদের (টুকরো চাল) চালের ফেনভাত খাবেন। তাই রাঁধুনি পরিচারিকাকে তিনি আদেশ দিয়ে গেলেন যে, ফেনভাত তৈরি হলে সভাসদদের সামনে যেন সবিস্তারে এ খবর না জানায়। কিন্তু যথাসময়ে রান্না সম্পন্ন হলেও রাজা বৈঠকখানা থেকে খাবার ঘরে আসতে দেরি করছিলেন। তাই পরিচারিকা সভাসদদের সামনেই বুদ্ধি খাটিয়ে মহারাজকে ফেনভাত তৈরির যে ছন্দোবদ্ধ বার্তা পুঁথি আকারে শুধালো, তা নিম্নরূপ—
‘রাজা মশয়, রাজা মশয়,
খুদিমণি রায় আপনের সঙ্গে দেখা করতে চায়।
সঙ্গে কে? লবণ-মরিচ সর্দার, আমলি কিশোর রায়।
ঢালছেন কিসে? পাথরকাটা মোকামে,
কাঠিলাড়া তাড়নে।’
অর্থাত্ খুদের চালের (খুদিমণি রায়) সাথে লবণ, মরিচ এবং তেঁতুল (আমলি কিশোর রায়) একটা পাথরের থালায় সাজিয়ে রাজা একটি কাঠির সাহায্যে যাতে গরম ফেনভাত নাড়া দিয়ে খেতে পারেন, সে ব্যবস্থা। মজার ব্যাপার হলো, পুঁথিটার পটভূমি কিশোরগঞ্জ অঞ্চল থেকে তৈরি হলেও বেচারি নিরক্ষর রাঁধুনি অনেকটা পাণ্ডিত্য জাহির করার প্রয়াসে ওখানকার আঞ্চলিক ভাষার পরিবর্তে যথাসাধ্য শুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছে।
বাংলার লোকসাহিত্যে ধাঁধা ও হেয়াঁলি এক বিশাল ব্যাপ্তি লাভ করে আছে। প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী তার ‘পূর্ব বাংলার লোক-সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন—
‘লোক-সাহিত্যে ধাঁধা ও হেঁয়ালীসমূহ প্রাচীনকাল হইতে চলিয়া আসিতেছে। এগুলো বিশেষ বুদ্ধি ও
মনোবিকাশের পরিচায়ক। ধাঁধা ও হেঁয়ালীর উত্পত্তিকালে মানব সমাজ বুদ্ধিসম্পন্ন হইয়া উঠিয়াছিল
বলিয়া বিশ্বাস করিবার নানা কারণ আছে; বুদ্ধিমান মাত্রই ইহা উপলব্ধি করিতে পারিবেন। মানবের
মনোবিকাশ ও জ্ঞান বুদ্ধির পক্ষে ধাঁধা ও হেঁয়লীসমূহ অমোঘ অস্ত্র। ধাঁধার পূর্ব নির্দিষ্ট উত্তর থাকে;
হেঁয়ালীগুলোর উত্তর না-ও দিতে পারে।’
যেমন—কাজে কর্মে প্রকাশ না দেখিয়ে যারা শুধু কথায় পটু, তাদের উদ্দেশে যে হেঁয়ালি, তার একটি উদাহরণ—
‘কতায় বার্তায় সুবারিশ, মাডা নিস্ তো পল (পলো) আনিস’।
বিবদমান দু’পক্ষের মধ্যে যদি মধ্যস্থতাকারীকে আড়াল করে দু’পক্ষ পরস্পর মিলে গিয়ে উল্টো মধ্যস্থতাকারীকে শত্রুবত্ ভাবা হয়, তখন বেচারা মধ্যস্থতাকারীর মুখ থেকে আক্ষেপের সুরে যে অশালীন হেঁয়ালি বের হয়, তা—
‘হেই মামা, হেই মামী, তেঁতই তলে ঘর;/মইদ্যে থাইক্যা চুতমারানি, আমারে করলে পর।’
বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও পার্শ্ববর্তী জেলার কারো শারীরিক, মানসিক কিংবা পারিপার্শ্বিক কোনো ছোট সমস্যা নিরসনকল্পে সেই ব্যক্তি বা অন্য কেউ যদি তা আরো বিগড়ে দেয়, অর্থাত্ সমস্যার সমাধান না হয়ে জটিলতা আরো বৃদ্ধি পায়, তখন বলা হয়—
‘যা-ও আছলাম হুইত্যা-বইয়া,/আরো মরছি বৈদ লাগাইয়া।’
তেমনি সংসার বা সমাজ জীবনে কোনো ভুল সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের যে নাজুক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তার প্রকাশ—
‘আক্কলে খাইয়া মাডি, / বাপে-পুতে কামলা খাডি।’
এখানে ‘আক্কল’ আঞ্চলিক শব্দ। প্রমিত বাংলা—আক্কেল বা জ্ঞান-বুদ্ধি।
ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা থানাধীন বিরুণীয়া-কেন্দ্রী চারপাশের গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে পারস্পরিক ভাববিনিময় অত্যন্ত দৃঢ়। বিশেষ করে বিরুণীয়ার সাথে কংশেরকুল গাঁয়ের সখ্য ছিল শতাব্দীকালেরও অধিক; আত্মীয়তা ও সহমর্মিতার বন্ধনে এ দুটি গ্রাম ছিল অনুসরণযোগ্য। এ দু’গাঁয়ের ভূমিপুত্র হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছেন ধনে, মানে, জ্ঞানে বেশ সমৃদ্ধ কতিপয় প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। তাদেরই কংশেরকুল গাঁয়ের জনৈক ধনাঢ্য ব্যক্তির দুহিতার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন আমার প্রয়াত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। বিবাহোত্তর প্রথম প্রথম বর ও কনের ছোট ভাইবোনদের মধ্যে সাধারণত নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। তখন আমার শৈশবকাল; একের পর এক যখন দাদার শ্যালিকারা বিরুণীয়ার ঐতিহ্যকে হাসি-ঠাট্টার ছলে ম্লান করে যাচ্ছিল, তখন আমাদেরই পক্ষ হয়ে ভালুকা থেকে আসা দাদার জনৈক প্রয়াত রসিক বন্ধু বরযাত্রী এমনই এক ছন্দোবদ্ধ হেঁয়ালি তৈরি করে ফেললেন, যা আমার বেয়াইনদেরকে তখনকার মতো একপ্রকার ভেবাচেকা খাইয়ে থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়। তবে ছন্দের মিল করার নিমিত্তে হেঁয়ালিতে গাঁয়ের নাম—‘কংশেরকুল’-এর পরিবর্তে ‘কংশেরকুর’ ব্যবহার করেছিলেন তিনি। আর সেই হেঁয়ালিটি—
‘চান্দরাটি-মামুদপুর, দিঘা-ধিত্পুর,
টেহায় টেহায় কইন্যা জোড়;
তার চাইয়া হস্তা চাইলে—
চইল্যা যাও কংশেরকুর।
প্রকৃতপক্ষে ছন্দে ব্যবহূত কোনো গাঁয়েই টাকায় টাকায় কন্যাজোড় কোনোকালে তো ছিলই না, বরং বিরুণীয়ার মতোই বনেদি ও প্রাগ্রসর পরিবার ছিল সকল গাঁয়েই।
বিরুণীয়া ও কংশেরকুলের ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ বাড়ির ঐতিহ্য ব্রিটিশ পিরিয়ড থেকেই। প্রতিটি বাড়িতে ছিল গোয়াল ভরা গরু। গাভীগুলোর যখন কোনো কারণে ঘাস খেতে অনীহা, অপ্রতুল দুগ্ধদান ও দুধ দোহানো কষ্টসাধ্য হতো, তখন গোয়ালা এসে তার ব্যবহূত শিক পুড়িয়ে গাভীর গায়ে দাগ দিতেন; তাতে গবাদিপশুর মুখের রুচি বৃদ্ধি পেত। প্রায় দীর্ঘকাল ধরে নড়াইলের জনৈক ঘোষ মহাশয় এ অঞ্চলের বাড়ি বাড়ি ঘুরে গরু দাগাতেন। প্রচণ্ড অগ্নিরাঙা শিকপোড়া হাতে নিয়ে তিনি যখন গরুকে দাগাতেন, তখন সাড়ম্বরে তার সুরেলা কণ্ঠে তিনি যে ছন্দ আউড়াতেন, তা হলো—
‘হেঁই ঠাঁকুরবাড়ির গাই, পাছা করে ঠাঁই ঠাঁই;
নাচতে নাচতে বন্দে যাবি, দোনা ভরি দুধ দিবি।’
মজার ব্যাপার হলো, ঘোষ মশাইয়ের কথা ও পুঁথিপাঠের কণ্ঠটা একটু নাকি নাকি সুর শোনাতো বিধায় হেঁয়ালিটিতে অপ্রয়োজনীয় চন্দ্রবিন্দু (ঁ)-র আধিক্য ব্যবহূত হলো। কালের প্রগতির চাকায় হাতের কাছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ এসে যাওয়ায় ঘোষবাবুদের পেশা এখন বিলুপ্তপ্রায়।
মানবদেহের চিকিত্সা শাস্ত্রে গাছ-গাছান্ত, ডাল-পালা বা পত্র-পুষ্পের যেমন অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে, এদের সংস্পর্শে বা ছোঁয়ায়ও কোনো কোনো প্রতিকার পাওয়ার লোকজ রেওয়াজ চালু আছে। আবার ক্ষেত্রবিশেষে এসবের আড়ালে অজ্ঞতার সুযোগে একধরনের ফাঁকিবাজিও রয়েছে। যেমন—শৈশব অতিক্রান্ত যুবা বা কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েদের কেউ যদি রাতে ঘুমের স্বপ্নাবেশে বিছানায় মূত্রত্যাগ করার মতো অঘটন ঘটিয়ে দেয়, তখন বেচারা সন্তানের মায়ের চিন্তার শেষ থাকে না। ফকিরের শরণাপন্ন মা তার সন্তানের জন্য ফকিরের কাছ থেকে যে বীরুত্সদৃশ ছোট্ট উদ্ভিদ সংগ্রহ করেন, আর সেটা প্রতি রাতে শোবার আগে গায়ে মৃদু মৃদু আঘাত করে মুখে যে পুঁথি বলে থাকে, তা—
ঘরো (ঘরে) হুতা, বাইরে মুতা
ঘরো হুতা, বাইরে মুতা।
অর্থাত্, ঘরের অভ্যন্তরের বিছানায় শোয়াতে এবং ঘরের বাইরে প্রস্রাব করানোর কথা বলা হচ্ছে। কার্যক্ষেত্রে বীরুত্ স্পর্শ করা এহেন ঝাড়ফুঁক কোনোদিন ফলপ্রসূ হয়েছে বলে জানা নেই। তেমনি দ্রব্য ছাড়াই ছেলে ভোলানো আরেকটি ঝাড়ফুঁকের পুঁথি, যা শুধুমাত্র শিশুরা যদি কখনো হোঁচট খেলে কিংবা হালকা ব্যথা পেলে পাঠ করা হয় যেমন--
হেই মস্কঝাড়া, কস্কঝাড়া,
বিলাইয়ের গু ছড়া ছড়া,
কুত্তা হাগে দই;
এমন কইরা ঝাইড়া দিয়াম,
সোনাচান্দের পাছা অতি সই।
এখানে আদুরে শিশুকে ‘সোনাচান্দ’ বোঝানো হয়েছে আর ‘অতি’ মানে—পর্যন্ত বা অব্দি।
ময়মনসিংহ অঞ্চলে ন্যাড়ামুণ্ডুকে নাইরা মাথা বলে জানে। শৈশবে বা কৈশোরে কারো মাথা ন্যাড়া করলে রসিক বন্ধুরা সব দল বেঁধে ন্যাড়ামুণ্ডু সম্বলিত গোবেচারাকে ঘিরে যে হেঁয়ালি আউড়িয়ে ফূর্তি করে, তা—
নাইরা মাথা পিয়ারি,
ডিম পাড়ে অরড়ি,
একটা ডিম নষ্ট,
পিয়ারির বড় কষ্ট।
আবার এ হেঁয়ালিকে অন্য যে শব্দ ব্যবহার করে বলা হয়, সেটা—
নাইরা মাথা টিনিটন্,
আধা পইসার চেপা কিন্,
চেপা দিয়া খাইলো ভাত;
পাছা করে ফাত্ ফাত্।
এবার চেপার পরিবর্তে পান্তাভাতের একটি লোক গান; গানটির গীতিকার ও সুরকার আমার স্বর্গীয় পিতা—বিনোদ বিহারী চক্রবর্তী। সাহিত্য, সংস্কৃতি তথা, খ্যাতিমান যাত্রাপালাকার এ ব্যক্তিত্ব, ভূতপূর্ব পরিচালকও ছিলেন, অপেরার বিভিন্ন পালার; তাই, পিতার লেখা একটি মজাদার বিরহের লোকসংগীতের কথাগুলো একবার দেখি—
খসম, তুমি বাড়িত আইলা না। (২)
কত পানি-পান্তা পইড়া রইছে,
খাইবার চাইয়া খাইলা না।
খসম, ... ... ... ... আইলা না।।
কইয়া গেছলা, ‘বাজারো যাই’;
এক দিন, দুই দিন, তিন দিন চইলা যায়, তুমার দেহা নাই।
তুমার পুলাডায় কয়, ‘ও বাজান, বাজান গো,
যাইবার কালে ছালুন খাইয়া গেলা না’।।
অবলা প্রায় অক্ষরবিহীন সেই পল্লিবধূর মর্মস্পর্শী কথা তার খসমের কর্ণকুহরে পৌঁছেছিল কি না, কে জানে। তবে গাঁয়ের বাড়িতে আজো বসত ঘরের পেছনের গাছের ডালে বসে ‘বউ কথা কও’ পাখির ডাক যে ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রকাশ করা হয়, তা হলো—
চৈতার বউ লো, টাকা দে লো,
যদু গেলো, আমারে নিলো।
বড়ই মিষ্টি এই পাখির বুলি। পরিশেষে পুরনো দিনের লোকগীতির বই থেকে কোনো এক বৃদ্ধশ্চ তরুণী ভার্যার উদ্দেশে বৃদ্ধের একটি মজার গান দিয়ে অত্র স্থানিক লোকসাহিত্যের লোকরস বিলিয়ে দিয়ে আমার আজকের লেখার পরিসমাপ্তি টানতে চাই। গানটি—
বাজার হুদ্দা কিইন্যা আইন্যা
ঢাইল্যা দিছি পায়।
আরশি দিছি, কাহই দিছি,
গাও মাজনের হাপান দিছি,
মজা কইরা দিবার লাগছো গায়।
বাজার হুদ্দা... ... ... ...পায়।।
চুল বান্ধনের ফিতা দিছি,
ফাছা পাইড়া কাপড় দিছি,
আর কি দেওন যায়?
বাজার হুদ্দা... ... ... পায়।।
বুড়া বুড়া কইয়া কেবল,
মনডারে কেন্ করছো পাগল,
তুমার লগে ক্যামতে পারুম,
হইয়া উঠেছ দায়।
বাজার হুদ্দা... ... ... পায়।।
গান দুটোতে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় ‘তুমার’ শব্দটি শুদ্ধ শব্দ—‘তোমার’ পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে। লেখায় বর্ণিত স্থান-কাল-পাত্র কারো প্রতি বিদ্বেষ নয়, কেবল রসোপকরণ সঞ্জনন মাত্র।
গ্রন্থসূত্র : লোকসংস্কৃতি— বিবেচনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, আবুল আহসান চৌধুরী
বাংলাদেশের লোকঐতিহ্য, সম্পাদনায় শামসুজ্জামান খান
