/ শিমুল শাহীন
তন্ময় ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করতে করতে রাস্তায় হাঁটছিলাম। হঠাত্ তন্ময় ভাইয়ের চোখ পড়ল রাস্তায় পড়ে থাকা একটা চকচকে কয়েনে। আমি হলেই হয়তো এড়িয়ে যেতাম, কিন্তু তন্ময় ভাই তেমন পাত্র নন! নিজেকে তিনি দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তুলে ধরেন একটু সুযোগ পেলেই। আর দেশের সম্পদ এমন রাস্তায় পড়ে থেকে নষ্ট হবে, তা মানার মতো লোক তিনি নন মোটেও। সঙ্গে সঙ্গেই একটু নীচু হয়ে কয়েনটা তুলে নিলেন তিনি। হাতে তুলতেই দেখলাম চকচকে একটা পাঁচ টাকার কয়েন। তন্ময় ভাই এবং আমি আশপাশে তাকালাম ভিক্ষুকের খোঁজে, কিন্তু একজনকেও পেলাম না। বাধ্য হয়ে হাঁটা ধরলাম আবারও। ঘণ্টাখানেক ধরে আমরা হাঁটলাম, গল্প করলাম, ততক্ষণ ধরেই তন্ময় ভাই পয়সাটা মুঠোবন্দী করে নিয়েই ঘুরছেন! কিন্তু কোনো ভিক্ষুক পাচ্ছেন না যাকে পয়সাটা দিয়ে তিনি মুক্তি পাবেন। ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে বেশ বিরক্ত হয়েই বললাম, ‘ভাই, পয়সাটা আপাতত পকেটে রেখে দেন, কোনো ভিক্ষুক সামনে আসলে তখন তাকে দিয়ে দেবেন নাহয়!’
ভাই আমার দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘কী বলো শফিক, এসব টাকা কখনোই পকেটে ঢোকানো উচিত নয়! পাঁচ টাকাই হোক বা পাঁচ লক্ষ!’
কী আর করা, ভাইকে বোঝাতে ব্যর্থ হলাম। এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় কাজ করতে করতে আরো ঘণ্টা দুয়েক সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু ভিক্ষুকের দেখা তখনো পাইনি। ভাইও পয়সাটা মুঠোয় নিয়ে থাকত থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন অনেকটা!
অগত্যা রাস্তার পাশের টং দোকানের দোকানদারকে দু কাপ চা দিতে বলে ভিক্ষুকের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। হঠাত্ তন্ময় ভাই ‘পাইসি’ বলে লাফ মেরে উঠে দাঁড়ালেন! চেয়ে দেখলাম আমাদের সামনে দিয়ে একটা মাঝবয়সী মহিলা হেঁটে যাচ্ছেন। গায়ে ময়লা ও ছেঁড়া শাড়ি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো তিনি নিশ্চয়ই অভাবগ্রস্ত ও ভিক্ষাবৃত্তি করেন! বড়োভাই কোনো কিছু না জিজ্ঞাসা করে চট করে তার সামনে মুঠোয় ধরা কয়েনটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই নিন চাচি!’
মুঠোয় থাকা পয়সাটার দিকে তাকিয়ে অনেকটা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন মহিলা। আমাদের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘অ্যাই মিয়া, মশকরা করেন? আমারে কোন অ্যাঙ্গেল থিক্যা আফনের ফকিন্নি মনে অয়? দূর অন সামনে থিক্যা!’
মহিলার এমন কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি! তন্ময় ভাইয়ের দিকে তাকালাম, তিনিও রীতিমত থ মেরে গেছেন। আমি ফিরে আসার জন্য উদ্যত হতেই তন্ময় ভাই আমাকে থামালেন! মহিলার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘চাচি, তাইলে এক কাজ করেন। আপনিই আমারে পাঁচটা টাকা দেন! দশটা টাকা দিয়ে চায়ের বিলটা মেটাই!’
মহিলা চোখ কপালে তুলে বলল, ‘আপনেরে ট্যাকা দিমু ক্যা? মজা লন! আফনের কাছে ট্যাকা নাই?’
তন্ময় ভাই এককাঠি সরেস! মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, ‘আপনিই এবার বলেন, আমারে কোন অ্যাঙ্গেল থেকে টাকাওয়ালা মনে হয়!’
রাজশাহী
