গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীতে হামলা, বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভাংচুর ও তিনজন সাঁওতাল হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বাপ-দাদার জমি ফেরতের দাবিতে শনিবার দুপুরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে সাঁওতাল ও বাঙ্গালীরা। সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম ভূমি পুনরুদ্ধার সংগ্রাম কমিটি ও আদিবাসী বাঙালি সংহতি পরিষদ যৌথভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের কাটামোড়ে এলাকায় মানববন্ধন চলাকালে সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম ভূমি পুনরুদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ডা. ফিলিমন বাস্কের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন, সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাফরুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক স্বপন শেখ, কোষাধ্যক্ষ সুফল হেমব্রম, সাঁওতাল হত্যা মামলার বাদি থমাস হেমব্রম প্রমুখ।
বক্তারা গাইবান্ধা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) প্রভাবিত হয়ে সাঁওতাল হত্যা মামলার ঘটনায় জড়িত মূল আসামিদের বাদ দিয়ে যে চার্জশিট দিয়েছেন তা প্রত্যাহার করে পুনরায় মূল আসামিদের নাম অন্তর্ভূক্ত করে চার্জশিট দেওয়ার দাবি জানান। তারা আরও বলেন, সাওঁতালদের নামে যে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে তা প্রত্যাহার, হত্যার বিচার ও ক্ষতিপূরণসহ বাপ-দাদার জমি ফেরত দিতে হবে।
আরও পড়ুন: গণধর্ষণের শিকার ২ নারী, কৌশলে ৭ ধর্ষক আটক
এর আগে হিমেল হাওয়া ও কনকনে শীত উপেক্ষা করে সাঁওতাল পল্লী মাদারপুর ও জয়পুরপাড়া থেকে কয়েকশ সাঁওতাল ও বাঙ্গালী নারী-পুরুষ ব্যানার, ফেস্টুন ও লাল পতাকা হাতে নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রদক্ষিণ করে কাটামোড়ে এই মানববন্ধন কর্মসূচিতে যোগ দেয়।
প্রসঙ্গত, সাঁওতাল ও বাঙালিদের ১ হাজার ৮৪০ দশমিক ৩০ একর জমি ১৯৬২ সালে অধিগ্রহণ করে গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জস্থ রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার গড়ে তোলে। কিন্তু চিনিকল কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহনের চুক্তি ভঙ্গ করে ওইসব জমি লিজ দিলে তাতে ধান-পাটসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়। ফলে গত ২০১৫ সালে সাঁওতাল ও স্থানীয় কিছু বাঙ্গালী অধিগ্রহনের চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে তাদের পূর্বপুরুদের জমি ফেরত পেতে আন্দোলন শুরু করে। এক পর্যায়ে গত ২০১৬ সালের ১ জুলাই ওই খামারের কিছু এলাকায় তারা চারটি বড় বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীতে গত ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর ওই খামারের বাকী জমিতে চাষ করা আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের দফায় দফায় সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ৯ জন পুলিশ সদস্য তীরবিদ্ধ ও চার জন সাঁওতাল গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে তিন সাঁওতাল শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ মারা যান। পরবর্তীতে পুলিশ এক অভিযানে ওই বসতি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে। এইসব ঘটনায় সাঁওতালদের পক্ষে স্বপন মুরমু বাদি হয়ে গত ২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর ৬০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে মামলা করেন। পরে ২৬ নভেম্বর থোমাস হেমরম বাদি হয়ে সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ, সাপমারা ইউপি চেয়ারম্যান বুলবুল আহম্মেদসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে আরেকটি মামলা করেন।
অপরদিকে পুলিশি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে গোবিন্দগঞ্জ থানার তৎকালীন এসআই কল্যাণ চন্দ বাদি হয়ে ৪২ জন নামিয় ও আজ্ঞাত ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে আসামি করে গোবিন্দগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
গত ২৮ জুলাই তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) গাইবান্ধা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ইনর্চাজ) সহকারি পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হাই সরকার সাঁওতাল হত্যা মামলার চুড়ান্ত অভিযোগ পত্র গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে জমা দিয়েছেন। কিন্তু তারা (ভূমি পূনরুদ্ধার সংগ্রাম কমিটির লোকজন) এই চার্জশিট প্রত্যাখ্যান করে অন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন এবং ওই অভিযোগপত্রের (চার্জশীট) বিরুদ্ধে নারাজি পিটিশন আদালতে দাখিল করেছেন। বিজ্ঞ আদালত আগামি ২৩ ডিসেম্বর ওই আবেদনের আদেশের দিন তারিখ ধার্য করেছেন।
অপরদিকে একই সময়ের ঘটনায় দায়িত্ব পালনকালে হামলায় পুলিশ সদস্য আহত হওয়ায় পুলিশ বাদি মামলায় একই দিন ৩৯ জন সাঁওতালকে অভিযুক্ত করে একই আদালতে আরেকটি চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই’র পরিদর্শক মোহাম্মদ জুলফিকার আলী ভুট্টু এই চার্জশিট দাখিল করেন।
ইত্তেফাক/এসি
