স্বপ্নদ্রষ্টা ফজলে হাসান আবেদের জীবনাবসান

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:০৯

 ‘অদৃষ্টের হাতে লেখা সূক্ষ্ম এক রেখা/ সেই পথ বয়ে সবে হয় অগ্রসর।’ কবির এই বাক্য চিরন্তন, সকলের জন্যই কঠিন সত্য; কিন্তু এই জগতে কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করেন যাহারা কেবল অগ্রসর হইয়া শেষ গন্তব্যে চলিয়াই যান না, নিজের জীবনকে সার্থক করিয়া, ইহার সহিত দেশ ও মানুষের মধ্যে এক অম্লান দাগ ফেলিয়া যান। ২০ ডিসেম্বর শুক্রবার ঢাকার একটি হাসপাতালে ফজলে হাসান আবেদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়াছেন বটে; কিন্তু দেশের মানুষকে কাঁদাইয়া গিয়াছেন, দেশের মাটিতে তাহার নিজ বলিষ্ঠ পায়ের ছাপ রাখিয়া গিয়াছেন। আত্মনিবেদিত এই মানুষটি দেশ স্বাধীনের পর সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল শাল্লায় বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করিয়া মানুষের জীবন উন্নয়নে যে যাত্রা শুরু করিয়াছিলেন, তাহাই দেশের গণ্ডি পার হইয়া ছড়াইয়া পড়িয়াছে বিশ্বব্যাপী। বিশ্বের ১১টি দেশে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখিতেছে তাহার এই প্রতিষ্ঠান। আমরা জানি তাহার প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক বিশ্বের বৃহত্তর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা হিসাবে পরিগণিত হইয়া আসিতেছে।

কেবল দারিদ্র্য বিমোচনই নহে, লিঙ্গ সমতা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নগর উন্নয়ন, মানবিকতা—সর্বক্ষেত্রেই দেশের অগ্রযাত্রায় তিনি এবং তাহার প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক বিশেষ অবদান রাখিয়াছে। যতই তিনি  আত্মপ্রচারবিমুখ হউন না কেন, তাহার অবদান, তাহার নিষ্ঠা, তাহার পরিশ্রম বিচ্ছুরিত হইয়াছে মানুষ চিনিবার জহুরিদের নিকট। তাই তো মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যু সংবাদে শোক বার্তায় বলিয়াছেন, ‘ফজলে হাসান আবেদ প্রমাণ করিয়া গিয়াছেন, স্বপ্ন দেখিলে তাহা বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে বিশ্বকে বদলানো যায়।’ মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস তাহার শোকবার্তায় বলিয়াছেন, ‘স্যার আবেদ বিশ্বের অল্প কিছু মানুষের একজন, যাহার প্রচেষ্টা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনিয়াছে।’ উল্লেখ্য, অসংখ্য সম্মানসূচক ডিগ্রি ও উপাধিতে ভূষিত হইয়াছেন এই নিষ্ঠাবান, নীতিপরায়ণ মানুষটি। ২০০৯ সালে ব্রিটেনের রানি তাহাকে দেশটির সর্বোচ্চ সম্মানিত অর্ডার অব সেন্ট মাইকেল অ্যান্ড সেন্ট জর্জ নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় তাহাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট অব হিউমেন লেটার্স, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ডক্টর অব লজ, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ডক্টর অব লেটার্স এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় ডক্টর অব লজ ডিগ্রি প্রদান করে। ইহা ছাড়াও সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখিবার জন্য র্যামন ম্যাগসাসে পুরস্কার, স্প্যানিশ অর্ডার অব সিভিল মেরিট এবং শিক্ষাক্ষেত্রে নোবেলখ্যাত ইয়াইদান পুরস্কার লাভ করেন। 

ফজলে হাসান আবেদ দেহত্যাগ করিয়াছেন বটে; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের জন্য তিনি অনুকরণীয় এবং অনুপ্রেরণা হইয়া থাকিবেন। তিনি আসিয়াছিলেন তিমির যাত্রীর মশাল হইয়া। তাহার সেই মশালের আলো যেন ছড়াইয়া থাকে আমাদের মাটিতে তাহাই আমাদের প্রত্যাশা। স্যার ফজলে হাসান আবেদের শোকসন্তপ্ত পরিবার এবং তাহার প্রতিষ্ঠানের সকলের প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকের পক্ষ হইতে আমরা সমবেদনা জানাইতেছি।