ভূরাজনীতির আবর্তে শ্রীলঙ্কা

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৪৯

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

‘ভূরাজনীতি’র বিষয়টি সম্পর্কে কিয়ত্ আলোচনা না করলে এ বিষয়ক যে কোনো অধ্যয়নে অপূর্ণতা থেকে যাবে। একটি দেশ, জাতি বা রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান কিভাবে সে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায় সেটি ভূ-রাজনীতির প্রতিপাদ্য বিষয়। এফ. রাটজেল নামে একজন সুইডিশ তার ‘পলিটিক্যাল জিওগ্রাফি’ (১৮৯৭) নামক গ্রন্থে সর্বপ্রথম টার্মটি ব্যবহার করেন। বিশ শতকের গোড়ার দিকে ভূ-রাজনীতি নিয়ে নানা ধরনের তথ্য ও তত্ত্ব প্রকাশিত হতে দেখা যায়। এ সময়ে ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষণে মনোযোগী হন এসব তাত্ত্বিক। বিভিন্ন আঞ্চলিক আধিপত্যের কারণ হিসেবে এ তত্ত্ব হাজির করা হয়। এই তত্ত্ব জনপ্রিয় হয়ে উঠলে এর একটি প্রাণিবিদ্যাবিষয়ক ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়। তাদের দৃষ্টিতে বিভিন্ন জাতি বা রাষ্ট্র ‘জীবসদৃশ জীবনসংগ্রাম’-এ নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখতে সদা ব্যস্ত। যেসব ভূখণ্ডে পৃথিবী বিভক্ত, মানুষের ইচ্ছা থাক বা না থাক ঐসব ভূখণ্ডই তাদের জীবনসংগ্রামের পরিধি নিরূপণ করে। এ তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯২৩ সালে মিউনিখে জেনারেল কে. হসকের ‘ইনস্টিটিউট অব জিওপলিটিক্স’ স্থাপন করেন। জার্মানির হিটলার এবং পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরবিরোধী আদর্শের ধারক হওয়া সত্ত্বেও স্ব স্ব আধিপত্য বিস্তারে এই তত্ত্ব কাজে লাগায়। ১৯৪৮ সালে ঘোষিত মন্ড্র ড্রকট্রেইন এবং লেলিন স্ট্যালিনের পূর্ব ইউরোপে কর্তৃত্ব সম্প্রসারণে  ভূ-রাজনীতি তত্ত্বের প্রকাশ ঘটে। পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষকরা প্রায়ই বলে থাকেন:‘রাষ্ট্র তার প্রতিবেশী পরিবর্তন করতে পারে না’। আসলে এটাই হচ্ছে বাস্তবতা যে, দেশ ও জাতির বসবাস যে ভূখণ্ডে বা যে অবস্থানে তার দ্বারাই তাদের ইতিহাস ও ভূগোল নির্ণীত হয়। রাজা বা রাষ্ট্রনায়ক তার রাজত্বের বা কর্তৃত্বের সুবিধা নির্ণয়ে ভূ-রাজনীতিকে ব্যবহার করেন। ভূ-রাজনীতি এমন একটি বিষয় যা রাষ্ট্রটি ছোটো না বড়ো তার ওপর নির্ভর করে না। কৌশলগতভাবে রাষ্ট্রটির অবস্থান যদি গুরুত্বপূর্ণ স্থল বা পানিপথের মধ্যে হয়ে থাকে তাহলে তা রাষ্ট্রটির জন্য তাত্পর্যপূর্ণ মর্যাদা বয়ে আনে। যেমন: মিশরের সুয়েজ খাল, মধ্য আমেরিকার পানামা খাল, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগকারী মালাক্কা প্রণালিতে অবস্থিত সিঙ্গাপুর, ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি, কৃষ্ণসাগর এবং ভূমধ্যসাগরের সংযোগকারী বসফরাস প্রণালি ইত্যাদি অবস্থানগুলো ভৌগোলিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পার্ল হারবারে জাপানের বোমাবর্ষণ ব্যতিরেকে আমেরিকার মূল মাটিতে একটি পটকাও ফোটেনি। তার কারণ অতলান্তিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল জলরাশি আমেরিকার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। এটিও ভূ-রাজনীতির আরেকটি উদাহরণ। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পূর্ব গোলার্ধের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় ভারত মহাসাগরের প্রাণকেন্দ্রে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার অবস্থান। ভারতের দক্ষিণ প্রান্তের কুমারিকা অন্তরীপ থেকে জাফনা উপদ্বীপের মধ্যে মাত্র ১২ কিলোমিটার এর দূরত্ব। পৃথিবীব্যাপী বাণিজ্যপথ এবং নিরাপদ পোতাশ্রয় হিসেবে কলম্বোর গুরুত্ব সমধিক। ভ্রমণপিপাসু মানুষের অন্যতম আকর্ষণীয় দেশ শ্রীলঙ্কা। আমাদের মতো তারাও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশ ছিল। ১৯৪৮ সালে সেদিনের সিংহল স্বাধীনতা লাভ করে। একপর্যায়ে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর স্বপ্নাদেশের প্রেক্ষিতে দেশটির নাম হয় শ্রীলঙ্কা।

 ছোটো দেশ হলেও প্রথম থেকেই দেশের উত্তরাংশ অবস্থিত তামিল সংখ্যালঘিষ্ঠ জনগণের বৈরিতার সম্মুখীন হয় কেন্দ্রীয় সরকার। দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের পর ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে। এরপর গোষ্ঠীগত রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব শ্রীলঙ্কাকে অস্থির করে তোলে। গেল দুই বছর ধরে প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা ও প্রধানমন্ত্রী অরনিল বিক্রমসিংহের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। এর মধ্যেই ঘটে যায় দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো ধরনের জঙ্গি হামলা। গত এপ্রিলের স্টার সানডের দিনে একযোগে গির্জা ও হোটেলে চালানো হামলায় নিহত হন আড়াই শতাধিক মানুষ। স্টার সানডের হামলার পর শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি ও সংখ্যালঘু মুসলমানদের মধ্যে তুমুল উত্তেজনার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয় এ নির্বাচন। এছাড়া চির বৈরী তামিল জনগোষ্ঠী তো রয়েছেই। সেই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ২৬ বছর ধরে তাদের ওপর শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর চালানো নৃশংসতার ঘটনায় বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছে। শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলী জনগোষ্ঠী সমর্থিত সরকারের নৃশংসতায় বিচলিত হয় বিশ্ব। অধিকাংশ রাষ্ট্রসমূহ সেখানে গণহত্যার প্রতিকার চায়। জাতিসংঘের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তামিল-বিরোধী যুদ্ধে সেখানে ৪০ হাজারের মতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। শ্রীলঙ্কার জনসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ হলেও মোট ভোটের সংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখ। ১৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মূলত ভোটযুদ্ধ হয় সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোতাবায়া রাজপক্ষে ও সাবেক আবাসনমন্ত্রী সাজিদ প্রেমাদাসার মধ্যে। দৃশ্যত নির্বাচনটি ‘একেবারে ভারসাম্যপূর্ণ’ বা ‘তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ মনে হলেও ভোটযুদ্ধের পর দেখা যায় গোতাবায়া রাজাপক্ষে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা গোতাবায়া রাজাপক্ষে তামিল নির্মূূল অভিযানের নেতৃত্ব সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহেন্দ্র রাজাপক্ষের ছোটো ভাই। মাহেন্দ্র রাজাপক্ষে যখন প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে ছিলেন তখন গোতাবায়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেন। তিনি শ্রীলঙ্কা ‘পেদুজানা প্যারামুনা’ দল থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। আর তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাজিদ শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসার একমাত্র সন্তান। তিনি ছিলেন ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির প্রার্থী। গোতাবায়া রাজাপক্ষের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলের বৌদ্ধদের নিরঙ্কুশ সমর্থন লক্ষ্য করা যায়। উল্লেখ্য যে, শ্রীলঙ্কার জনসংখ্যার ৭০ ভাগ বৌদ্ধ, ১২.৬ ভাগ তামিল এবং ৯.৭ ভাগ মুসলিম। গোতাবায়া সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের সমর্থন পেতে চরম সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নেন। অপরদিকে সাজিদকে সমর্থন দিয়েছিলেন তামিল ও মুসলমানরা। সাজিদ জনকল্যাণমুখী গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সিংহলীদের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হন। ৫২.৫ ভাগ ভোট পেয়ে গোতাবায়া রাজাপক্ষে নির্বাচিত হন। ভূ-রাজনৈতিক কারণে শ্রীলঙ্কা সকল বিশ্বশক্তির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দুই এশীয় শক্তি চীন ও ভারত শ্রীলঙ্কাকে পক্ষে নেয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। স্বাভাবিকভাবেই বিগত নির্বাচনে দুই পক্ষের সমর্থন ও বিরোধিতার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। যদিও দুজন প্রার্থী দুই শক্তির মধ্যে ‘রাজনৈতিক ভারসাম্য’ রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। মূলত নির্বাচিত রাজাপক্ষের ও তার পরিবারের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে তথ্যাভিজ্ঞমহল সূত্রে জানা গেছে। তামিলদের গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযানে চীনের নিরঙ্কুশ সমর্থন পেয়েছিল তত্কালীন রাজাপক্ষের সরকার। রাজাপক্ষে নির্বাচিত হওয়ায় চীনা পক্ষের পাল্লা ভারি হয়েছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। তবে নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উষ্ণ অভিনন্দন ও সমর্থন ভারতের পক্ষে পাল্লা ভারি করার প্রায়শই বলছেন কূটনীতিকরা। এরই মধ্যে গোতাবায়া ভারত সফর করেছেন এবং শক্ত সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গোতাবায়ার এটাই ছিল প্রথম বিদেশ সফর। ভারতের আস্থা অর্জনের জন্য এবং ভারতের পক্ষ থেকে গোতাবায়ার প্রতি আস্থা জ্ঞাপনের জন্য সফরটি তাত্পর্যপূর্ণ ছিল বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। গত নির্বাচনটি ছিল দুই এশীয় প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভারতের প্রভাব বলয়ের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। উভয়পক্ষ তাদের স্ব স্ব কূটনৈতিক ও কৌশলগত ভূমিকার মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। রাজাপক্ষের পরিবারের চীনা ঘনিষ্ঠতা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে আনুষ্ঠানিক ও উষ্ণ শব্দাবলি দ্বারা তা কতটা মেরামত হবে তা বিবেচনার বিষয়। উল্লেখ্য যে, মাহেন্দ্র রাজাপক্ষে যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন ভারতকে জানানো ছাড়াই চীনের দুটি সাবমেরিন নোঙ্গর করে শ্রীলঙ্কার জলসীমায়। বন্দর ও সড়ক নির্মাণে সহজশর্তে ঋণ দিয়ে শ্রীলঙ্কা সরকারকে প্রলুব্ধ করতে সক্ষম হয় চীন। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর হামবানটোটা চীনের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। এই ইজারার বিরুদ্ধে ভারতের অভিযোগ থাকা স্বাভাবিক। সার্বভৌমত্বের বিষয়টি বিবেচনা করে শ্রীলঙ্কার সুশীল সমাজ এর বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছে। ভারতের আর একটি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে তামিল সংখ্যালঘুদের প্রতি বল প্রয়োগের আশঙ্কা। গোতাবায়া সরকার চরম তামিল-বিরোধী। গোটা বিশ্ব যখন তামিলদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলছে তখন গোতাবায়া স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন এ রকম কোনো তদন্ত করবেন না তিনি। জাতিসংঘসহ ভারত ও অন্যান্য দেশ তামিলদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়ে আসছে। গোতাবায়া রাজাপক্ষে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ধর্মীয় ও গোষ্ঠীগত সন্ত্রাসবাদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন নির্বাচনকালে। জনগণ রাজাপক্ষে পরিবারের আধিপত্যের কথাও বলছে। আগামী সংসদীয় নির্বাচন শেষে গোতাবায়ার বড়ো ভাই মাহেন্দ্র রাজাপক্ষে প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। গোতাবায়ার এ রকম প্রতিশ্রুতি ছিল। জয়ের পরে টুইটে গোতাবায়া বলেন, ‘আজ থেকে শ্রীলঙ্কার নতুন যাত্রা শুরু হলো। সেই অংশী সবাই। চলুন মর্যাদা ও শৃঙ্খলার স্বার্থে শান্তিপূর্ণভাবে আমরা এই বিজয় উদ্যাপিত করি’।

সাধারণত কথা ও কাজের মধ্যে মিল থাকে না শাসক বা শাসকদলের। বাস্তবে শাসকদল যদি হয় অনুদার, তাহলে তারা প্রতিপক্ষকে দমন করে ছলে-বলে-কলে। দীর্ঘকাল ধরে শ্রীলঙ্কায় গণতন্ত্রের চর্চা হওয়ার কারণে আমরা আশা করতে পারি ক্রমশ যুদ্ধ ও সহিংসতা অতিক্রম করে নতুন সরকার নতুন উদ্দীপনা নিয়ে জাতি গঠনে এগিয়ে যাবে। সকল দল ও মতের প্রতিনিধিত্বশীল একটি সুষম সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কার নতুন নেতৃত্ব এগিয়ে যাবে, এটাই বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা।

n লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়